দল নিবন্ধনে আইন নয়, চলেছে খেয়ালখুশি ইসির সিদ্ধান্তে প্রশ্নবিদ্ধ গণতন্ত্র

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের প্রক্রিয়া কাগজে-কলমে আইনসম্মত হলেও বাস্তবে তা দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত। জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনে সে সময়কার নির্বাচন কমিশন বারবার আইন ও বিধিমালা উপেক্ষা করে উদ্দেশ্যমূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোথাও শর্ত পূরণ না করেও দল নিবন্ধন পেয়েছে, আবার কোথাও একই শর্তে দল বাদ পড়েছে। এতে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ও অনিয়মের শুরু : ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়। ওই সময় থেকে নির্বাচন কমিশন নিয়মিত বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নতুন দল নিবন্ধন করে আসছে। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত মোট নিবন্ধিত দলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯টিতে, যার মধ্যে কমিশন পরে তিনটি দলের নিবন্ধন বাতিল করে।

তদন্ত কমিশনের মতে, দল নিবন্ধনের মূল আইনি কাঠামো রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮-এ একটি বড় ফাঁক রয়েছে। বিধিমালায় ‘কার্যকর দফতর’ থাকার শর্ত থাকলেও ‘কার্যকারিতা’ কী, তার কোনো সংজ্ঞা বা মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়নি। এই অস্পষ্টতাই কমিশনের জন্য ইচ্ছামতো ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করেছে।

২০১৩-১৪: নিয়ম ভেঙে নিবন্ধনের নজির

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ৪৩টি দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করে। যাচাই-বাছাই শেষে মাত্র দু’টি দল বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) নিবন্ধন পায়। তদন্ত কমিশনের পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই দুই দলের ক্ষেত্রেই নিবন্ধনের শর্ত পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও কমিশন বিশেষ সুবিধা দিয়েছে।

বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট কেন্দ্রীয় দফতরসহ এক-তৃতীয়াংশ জেলা ও ১০০ উপজেলা/মেট্রোপলিটন থানায় কার্যকর দফতরের শর্ত পূরণ করতে পারেনি। তবু কমিশন বিধিমালার ৭(৫) ধারা ব্যবহার করে দলটিকে ১৫ দিনের সুযোগ দেয় এবং পুনর্যাচাইয়ের নামে আগের ঘাটতিগুলো কার্যকর হিসেবে দেখিয়ে নিবন্ধন দেয়। অথচ প্রশ্ন থেকে যায় যে দফতরগুলোকে প্রথমে ‘কার্যকারিতা নেই’ বলা হয়েছিল, সেগুলো মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে কীভাবে কার্যকর হয়ে গেল?

বিএনএফের ক্ষেত্রে অনিয়ম আরো স্পষ্ট। প্রাথমিক যাচাইয়ে দলটি স্পষ্টভাবেই নিবন্ধনের যোগ্য ছিল না। তবু কমিশন প্রথমে দ্বিতীয় এবং পরে তৃতীয় দফা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় যার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। শেষ দফায় জেলা প্রশাসন ও তথ্য কর্মকর্তাদের যুক্ত করে পুনর্যাচাই করে দলটিকে নিবন্ধনের যোগ্য ঘোষণা করা হয়। তদন্ত কমিশনের মতে, বিএনএফকে নিবন্ধন দেয়ার সিদ্ধান্ত আগেই নেয়া ছিল এবং এতে তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ চাপ কাজ করেছে।

২০১৪ : নির্বাচন ও ‘একতরফা জয়’ : বিএনএফ ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়া ১২টি দলের একটি। দলটি শেষ পর্যন্ত ২২টি আসনে প্রার্থী দেয় এবং ঢাকা-১৭ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পায়। ওই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আবেদন করলেও কমিশন তা গ্রহণ করেনি, তবে তিনি প্রচারণা বন্ধ করে দেন। ফলে বিএনএফ প্রার্থী এস এম আবুল কালাম আজাদ সহজেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এই ঘটনাও দলটির নিবন্ধন নিয়ে বিতর্ক আরো গভীর করে।

২০১৭-১৮ : সব আবেদন বাতিল

২০১৭ সালে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে নতুন দল নিবন্ধনের বিজ্ঞপ্তি দিলে ৭৫টি দল আবেদন করে। শর্ত পূরণ না করায় কোনো দলই নিবন্ধন পায়নি। তবে তদন্ত কমিশনের মতে, এই ধাপে কোনো দলকে নিবন্ধন না দেয়ায় কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে আর অনুসন্ধান করা হয়নি।

২০২২-২৩ : নতুন কৌশল, পুরনো প্রশ্ন : ২০২২ সালে নতুন করে দল নিবন্ধনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলে ৯৩টি দল আবেদন করে। যাচাই-বাছাই শেষে ১২টি দলের তথ্য মাঠপর্যায়ে যাচাই করা হয়। এর মধ্য থেকে শেষ পর্যন্ত মাত্র দু’টি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) নিবন্ধন পায়।

এই পর্যায়ে কমিশন প্রথমবারের মতো ‘১০ শতাংশ নমুনা যাচাই’ নামে এক অভিনব পদ্ধতি চালু করে। আইনে বা বিধিমালায় এ ধরনের যাচাইয়ের কোনো বিধান নেই। তবুও কমিশন এই পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ভুল পাওয়া তথ্যকে পুনর্যাচাইয়ে ‘সঠিক’ হিসেবে দেখিয়ে দুই দলকে নিবন্ধন দেয়।

বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির ক্ষেত্রে তদন্তে দেখা যায়, বহু জেলা ও উপজেলা দফতরের অস্তিত্ব বা কার্যকারিতা ছিল না। কোথাও বৈধ ভাড়াচুক্তি নেই, কোথাও কমিটির তালিকা অসম্পূর্ণ, কোথাও নিয়মিত সভার কোনো প্রমাণ নেই। এমনকি কিছু দফতর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় দেখানো হয়েছে। এসব গুরুতর ঘাটতি সত্ত্বেও কমিশন দলটিকে নিবন্ধন দেয়।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। হঠাৎ করে গঠিত এ দলটির জন্য নিবন্ধন আবেদনের সময়সীমা দুই মাস বাড়ানো হয়, যার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। প্রাথমিক যাচাইয়ে বেশির ভাগ জেলা ও উপজেলার তথ্য ভুল পাওয়া গেলেও পুনর্যাচাইয়ের নামে সব তথ্য সঠিক দেখিয়ে দলটিকে নিবন্ধন দেয়া হয়।

ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ ও তৃণমূল বিএনপির মতো দলগুলো নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করতে না পারলেও আদালতের নির্দেশে নিবন্ধন পায়। তদন্ত কমিশনের জরিপে অংশগ্রহণকারীরা মত দিয়েছেন, এসব ক্ষেত্রে বিচারিক প্রক্রিয়াতেও সরকারের অনুচিত প্রভাব ছিল।

তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ

তদন্ত কমিশনের মতে, রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮-এ ‘কার্যকারিতা’র সংজ্ঞা না থাকায় এবং কোনো নীতিমালা প্রণয়ন না করে নির্বাচন কমিশন ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দল নিবন্ধন দিয়েছে। কোথাও তৃতীয় দফা যাচাই, কোথাও ১০ শতাংশ নমুনা, আবার কোথাও বেআইনিভাবে সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অনিয়ম শুধু দল নিবন্ধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত করেছে। নির্বাচন কমিশন যদি আইন ও বিধিমালার ঊর্ধ্বে উঠে এমন সিদ্ধান্ত নিতে থাকে, তবে ভবিষ্যতের নির্বাচন ও গণতন্ত্র উভয়ই গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বে।