আবার নিপাহ ভাইরাস : সতর্ক হোন

Printed Edition
Niramoy-1
আবার নিপাহ ভাইরাস : সতর্ক হোন

ডা: হুমায়ুন কবীর হিমু

চলতি বছর (২০২৬) ইতোমধ্যে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৫টিতে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাট জেলায় সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানায়, ২০২৪ সালে দেশে নিপাহ ভাইরাসে মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এছাড়া গত বছর (২০২৫) নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায় সর্বপ্রথম নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়। এ সময় ২৫৭ জন আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ১০৫ জন। মালেশিয়ার কেমপুং নিপাহ শহরে এ ভাইরাস প্রথম সংক্রমিত হয় বলে এর নামানুসারে নিপাহ ভাইরাস রাখা হয়।

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের বিষয়টি ধরা পড়ে ২০০১ সালে। এরপর থেকে এ পর্যন্ত মেহেরপুর, নওগাঁ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, ঠাকুরগাঁও, কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জ ও রংপুরে মানব দেহে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। গেল বছর উত্তরাঞ্চলের লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় প্রথম এ ভাইরাস ধরা পড়ে। পরে কুড়িগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও দিনাজপুরেও সংক্রমণের ঘটনা ঘটে। ২৪ জন আক্রান্ত হয়ে ১৭ জন মারা যায়। এর আগে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে ফরিদপুরে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করে জানা গেছে অসতর্কভাবে অন্য রোগীর সেবা করার কারণে সংক্রমণের হার বেড়েছে। এ পর্যন্ত এ ভাইরাসে আক্রান্ত প্রায় আড়াইশ’ জনের মধ্যে দেড়শ’ জনেরই মৃত্যু হয়েছে। এ ভাইরাসে আক্রান্তদের মারা যাওয়ার হার ৭৫ ভাগের বেশি। তবে এটা নিয়ে ভয় পেলে চলবে না। সচেতন হতে হবে।

নিপাহ ভাইরাস হেনিপাহ ভাইরাস গোত্রের। এ গোত্রের আর একটি ভাইরাস হল হেনড্রা ভাইরাস। হেনড্রা ভাইরাস ১৯৯৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন এ শনাক্ত করা হয়। এ সময় এ ভাইরাসের সংক্রমণে ৩০টি ঘোড়া মারা যায়। এ ভাইরাস শুধু ঘোড়াকে সংক্রমিত করলেও মানুষকে সংক্রমিত করার খবর পাওয়া যায়নি। নিপাহ ভাইরাস ছড়ায় মূলত বাদুড়ের মাধ্যমে। বাংলাদেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এই সময়টাতেই খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয়। বাদুড় গাছে বাঁধা হাঁড়ি থেকে রস খাওয়ার চেষ্টা করে বলে ওই রসের সাথে তাদের লালা মিশে যায়। সেই বাদুড় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকলে এবং সেই রস খেলে মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে এ ভাইরাস। আক্রান্ত মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে এ রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির থুথু, লালা, মলমূত্রের মাধ্যমে অন্য ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে। নিপাহ ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ৪ থেকে ৪৫ দিন পর রোগের লক্ষণ প্রকাশিত হয়। এ কারণে গত এক মাসে যারা খেজুরের রস খেয়েছেন, তাদের সবাইকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। যারা রোগীদের সেবা দিয়েছেন এবং মৃতদের সৎকার করেছেন, তাদের দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রথমে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো লক্ষণ যেমন প্রচণ্ড জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, গলায় ক্ষত, বমি হওয়া দেখা দেয়। পরে মাথা ঘোরানো, খিঁচুনি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। এক পর্যায়ে রোগী প্রলাপ বকতে শুরু করে এবং অজ্ঞান হয়ে পড়ে।

এ রোগের সঠিক কোনো ওষুধ বা প্রতিরোধক কোনো ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। আশা করা হচ্ছে আগামী বছর এ ভাইরাসের প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার হবে। তাই এ রোগ প্রতিরোধে সচেতন থাকতে হবে। এ রোগে আক্রান্তদের পরিচর্যা করতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। রোগীর ব্যবহৃত কাপড় ও অন্যান্য সামগ্রী ভালোভাবে পরিষ্কার না করে আবার ব্যবহার করা যাবে না। রোগীর পরিচর্যা করার পর হাত ভালোভাবে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। রোগীর কফ ও থুতু যেখানে সেখানে না ফেলে একটি পাত্রে রেখে পরে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির পরিচর্যার সময় মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।

নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে খেজুরের কাঁচা রস না খাওয়া, বাদুর বা অন্য প্রাণীর খাওয়া ঝুটা আংশিক ফল না খাওয়া, ফলমূল ভালো করে ধুয়ে খাওয়া, আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এলে হাত সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ফেলা। এছাড়া আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার খেজুর গুড় ও রস, আখের রস, পেঁপে, পেয়ারা, বরইয়ের মতো ফল না খাওয়া ভালো।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক

himu33bd@gmail.com