দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষকে রক্ষায় তদন্ত ভণ্ডুলের অভিযোগ
সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে টঙ্গী পাইলটে ‘পছন্দের সভাপতি’ বহাল
Printed Edition
গাজীপুর মহানগর সংবাদদাতা
সরকারি নির্দেশনায় সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি বাতিল করে জেলা প্রশাসকদের সরাসরি দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলেও গাজীপুরের টঙ্গী পাইলট স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক সংগঠনের নেতা অধ্যক্ষ মো: আলাউদ্দিন মিয়াকে রক্ষা করতেই সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে বিতর্কিত সাবেক সভাপতি শাহ নাওয়াজ দিলরুবা খানকে আবার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে- এমন অভিযোগে শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সরকারি সার্কুলারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক অথবা জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। এই নির্দেশনার আলোকে জেলার প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও টঙ্গী পাইলট স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজে আগের বিতর্কিত সভাপতিকে পুনর্বহাল করা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
‘অধ্যক্ষের ইচ্ছাতেই সভাপতি পুনর্বহাল’: এলাকাবাসীর অভিযোগ, আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক সংগঠন স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের (স্বাশিপ) গাজীপুর মহানগরের সভাপতি অধ্যক্ষ মো: আলাউদ্দিন মিয়া এবং সাবেক সভাপতি শাহ নাওয়াজ দিলরুবা খানের প্রত্যক্ষ ইচ্ছা ও সুপারিশেই এই ব্যতিক্রম সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তারা আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক-কর্মচারীদের পুনর্বাসনকার্যক্রম শুরু করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ এর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগপন্থী যেসব শিক্ষক-কর্মচারী আত্মগোপনে ছিলেন বা দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন, তাদের উপস্থিত দেখিয়ে প্রায় ১৫ মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ একই সভাপতি পূর্বে অনুপস্থিতির অজুহাতে তাদের বেতন বন্ধ রেখেছিলেন। মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অধ্যক্ষকে রক্ষার অভিযোগে শাহ নাওয়াজ দিলরুবা খান আগেও আলোচনায় আসেন।
কারাভোগ করা শিক্ষককে ফুল দিয়ে বরণ: আরো অভিযোগ রয়েছে, বৈষম্যবিরোধী মামলায় গ্রেফতার হয়ে কয়েক মাস কারাভোগ করা এক শিক্ষক জামিনে মুক্তি পেলেও নিয়মিত বিদ্যালয়ে যোগদান করেননি। তবু সম্প্রতি তাকে ফুল দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করেন অধ্যক্ষ ও আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকরা, যা স্থানীয়ভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
তদন্তের নামে ভয়ভীতি ও চাপ : অধ্যক্ষ মো: আলাউদ্দিন মিয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ১৪ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ ও অনিয়মের অভিযোগে আদালতে দায়ের হওয়া মামলাটি বর্তমানে সিআইডির তদন্তাধীন। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন, যার প্রধান জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ আলম।
তবে অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত অধ্যক্ষের সামনেই সাক্ষীদের ডেকে বক্তব্য নেয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষক-কর্মচারীরা স্বাধীনভাবে সাক্ষ্য দিতে ভয় পাচ্ছেন। অনেককে বাধ্য হয়ে অধ্যক্ষের পক্ষে কথা বলতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি যারা আগে স্বেচ্ছায় অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগে স্বাক্ষর করেছিলেন, তাদের এখন অভিযোগ প্রত্যাহার করে অধ্যক্ষের পক্ষে দরখাস্তে স্বাক্ষর দিতে চাপ দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
নিজস্ব তদন্ত কমিটির ‘বাধ্য সাফাই’: শাহ নাওয়াজ দিলরুবা খানের নেতৃত্বে পূর্বে গঠিত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তদন্ত কমিটির যেসব শিক্ষক সদস্য নিরপেক্ষ তদন্তে অধ্যক্ষের অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পেয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন, তারাও বর্তমানে চাপের মুখে অধ্যক্ষের পক্ষে কথা বলতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাময়িক বরখাস্তের দাবি : এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ভয়মুক্ত তদন্ত নিশ্চিত করতে অধ্যক্ষ মো: আলাউদ্দিন মিয়াকে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাময়িক বরখাস্তের দাবি জোরালো হচ্ছে। একইসাথে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী শাহ নাওয়াজ দিলরুবা খানকে অপসারণ করে জেলা প্রশাসককে সরাসরি টঙ্গী পাইলট স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজের দায়িত্ব দেয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও এলাকাবাসী। তাদের প্রশ্ন, ‘যেখানে সরকারি নির্দেশনা সবার জন্য প্রযোজ্য, সেখানে টঙ্গী পাইলট স্কুল কেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে?’
বিশিষ্টজনের প্রতিক্রিয়া : টঙ্গী পাইলট স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজের কলেজ শাখার প্রতিষ্ঠাতা, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ মো: হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, ‘সরকারি স্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করে একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে রক্ষা করার অপচেষ্টা চলছে, যা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ভয়ঙ্কর নজির।’ তিনি আরো বলেন, ‘তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্বে রাখা এবং বিতর্কিত সভাপতিকে পুনর্বহাল করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।’
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য : এ বিষয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো: আলম হোসেন বলেন, ‘অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
সভাপতি নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে যদি কারো আপত্তি থাকে, লিখিত অভিযোগ দিলে তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’