গাজায় অঙ্গহানির সঙ্কট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
গাজা উপত্যকায় যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাবে অঙ্গহানির সংখ্যা ইতোমধ্যেই রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে। মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা অব্যাহত থাকায় এই সঙ্কট আরো তীব্র হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা হিউম্যানিটি অ্যান্ড ইনক্লুশন যুক্তরাজ্য।
সংস্থাটির বরাতে আলজাজিরা জানায়, চলমান সঙ্ঘাতে গাজায় অঙ্গচ্ছেদের ঘটনা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ, দক্ষ জনবল এবং রোগীদের চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আক্রান্তের সংখ্যা ও জটিলতা আরো বাড়বে। সঙ্ঘাতের তীব্র সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ জন শিশুর এক বা উভয় পা কেটে ফেলতে হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত গাজায় প্রায় পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার মানুষ অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন। দুই বছরব্যাপী যুদ্ধে প্রায় ৪২ হাজার ফিলিস্তিনি গুরুতর অথবা জীবন-পরিবর্তনকারী আঘাত পেয়েছেন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। মানবিক সহায়তা প্রবেশ এখনো অনিশ্চিত এবং অধিকাংশ সরঞ্জাম ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি এই সংস্থাটি (হিউম্যানিটি অ্যান্ড ইনক্লুশন যুক্তরাজ্য) নিজেও ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে কৃত্রিম অঙ্গসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ গাজায় পাঠাতে পারেনি। বর্তমানে পুরো গাজায় মাত্র ৯ জন কৃত্রিম অঙ্গ প্রস্তুতকারক কাজ করছেন, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের প্রবেশে বাধা থাকায় স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ দেয়াও সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও সহিংসতা থামেনি। জাতিসঙ্ঘের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৭০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং প্রায় দুই হাজার জন আহত হয়েছেন।
জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেছেন, গাজায় সাধারণ মানুষের জন্য চলাফেরা এখন জীবন-ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ মানুষ হাঁটা, গাড়ি চালানো বা ঘরের বাইরে দাঁড়ালেই প্রায় প্রতিদিন হামলার শিকার হচ্ছে।
ইসরাইলি হামলা অব্যাহত
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনীর ধারাবাহিক হামলায় আবারো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া এলাকায় একটি মসজিদের কাছে জড়ো হওয়া বেসামরিক মানুষের ওপর বিমান ও ড্রোন হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজন শিশুও রয়েছে। নিহতদের লাশ গাজা সিটির আশ-শিফা হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। খবর বিবিসির। একই দিনে মধ্য গাজার মাগাজি এলাকায় একটি বেসামরিক গাড়িতে হামলায় আরো তিনজন নিহত হন। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনুসেও পৃথক হামলায় একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে একদিনে বিভিন্ন স্থানে হামলায় অন্তত আট থেকে ৯ জনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও উদ্ধার সংস্থাগুলো।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৭২ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসরাইলি বাহিনীর হামলা পুরোপুরি থামেনি। বরং এ সময়ের মধ্যে শত শত মানুষ নিহত এবং হাজারো মানুষ আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলমান হামলার কারণে গাজা শহরের মানবিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। খাদ্য, চিকিৎসা ও জরুরি সেবার তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, নারী ও শিশুদের ওপর এই সঙ্ঘাতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে এবং পরিস্থিতি দিন দিন আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে হামলা
গাজা উপত্যকার উত্তরাঞ্চলের বেইত লাহিয়া এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে ইসরাইলি হামলায় এক কিশোরী গুরুতর আহত হয়েছে। তার নাম মেসা আল-আওয়াদিয়া, যিনি মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আনাদোলু।
আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং তার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। এই হামলা এমন একটি এলাকায় হয়েছে, যেখানে বহু মানুষ নিরাপত্তার জন্য আশ্রয় নিয়েছিল।
পরিসংখ্যান বলছে, গাজায় চলমান সঙ্ঘাতে শিশুদের হতাহতের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। হাজার হাজার শিশু নিহত ও আহত হওয়ার পাশাপাশি অনেকেই বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবিক সঙ্কটে পড়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় শত শত মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন, যা শান্তিপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
পশ্চিমতীরে হামলা, উত্তেজনা
অধিকৃত পশ্চিমতীরের নাবলুসের কাছে এক ফিলিস্তিনি কৃষককে মারধর করেছে অবৈধ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা। আহত ওই কৃষকের নাম আবদেল ফাত্তাহ আল-সাফাদি, যিনি নিজের জমিতে কাজ করার সময় হামলার শিকার হন। স্থানীয় সূত্রের বরাতে আনাদোলু জানায়, হামলায় তার (কৃষকের) মাথা ও মুখে গুরুতর আঘাত লাগে। একই সময়ে পশ্চিমতীরের বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলি বাহিনী অভিযান চালিয়েছে এবং কিছু স্থানে টহল জোরদার করেছে। এ ছাড়া বেথলেহেম অঞ্চলে নতুন একটি অস্থায়ী বসতি স্থাপন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
পূর্ব জেরুসালেমে উচ্ছেদ আতঙ্ক
অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেমের সিলওয়ান এলাকায় সাতটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়ি খালি করার নির্দেশ দিয়েছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে প্রায় ৫০ জন মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে আনাদোলু জানায়, বাতন আল-হাওয়া এলাকায় অবস্থিত এসব বাড়ি উচ্ছেদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে একটি ইসরাইলি আদালতের রায়ের ভিত্তিতে, যা একটি উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারী সংগঠনের পক্ষে গেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়ি খালি না করলে জোরপূর্বক উচ্ছেদের পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানানো হয়। বিশ্লেষকদের মতে, সিলওয়ান এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে জনসংখ্যার কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন প্রকল্প ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের জমি দখল এবং বসতি সম্প্রসারণের অভিযোগও রয়েছে।
‘ইয়েলো লাইন’ এগিয়ে নিচ্ছে ইসরাইল
গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে নির্ধারিত তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে সরিয়ে ইসরাইলি বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণ এলাকা বাড়াচ্ছে-এমন তথ্য উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণা ও স্থানীয় সূত্রে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে এই সীমারেখা সাময়িক হিসেবে নির্ধারিত হলেও, বাস্তবে তা ক্রমেই স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
গবেষণা সংস্থা ফরেনসিক আর্কিটেকচারের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর নাগাদ ইসরাইল গাজার প্রায় ৫৮ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়, যা চুক্তির প্রাথমিক মানচিত্রে নির্ধারিত ৫৩ শতাংশের চেয়েও বেশি। এরপরও বিভিন্ন স্থানে এই সীমারেখা আরো এগিয়ে নেয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে হলুদ কংক্রিট ব্লক বসিয়ে এই লাইন চিহ্নিত করা হয়, যা রাতারাতি সরিয়ে ফেলার ফলে বহু ফিলিস্তিনি হঠাৎ করেই নিজেদের ‘ফ্রি-ফায়ার জোনে’ আবিষ্কার করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গাজার বিভিন্ন এলাকায় এই লাইন কয়েক দফা অগ্রসর হয়েছে। আল-তুফাহ এলাকার বাসিন্দা ফায়েক আল-সাকানি বলেন, জানুয়ারিতে এই লাইন প্রায় ১০০ মিটার এগিয়ে এসে প্রধান সড়ক সালাহ আদ-দীন সড়কের কাছাকাছি পৌঁছায়। এতে আশপাশে অবস্থানরত বাস্তুচ্যুত মানুষদের ওপর হামলার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ইসরাইলি বাহিনী এই লাইনের পাশে দীর্ঘ মাটির বাঁধ (বার্ম) তৈরি করেছে, যা ট্যাংক ও স্নাইপারদের জন্য কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে ১০ মাইলের বেশি এলাকায় এমন বাঁধ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে সাতটি কংক্রিট দুর্গ নির্মাণ করা হয়েছে, ফলে গাজায় মোট সামরিক স্থাপনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২টিতে।
এই ‘ইয়েলো লাইন’-এর পাশাপাশি আরেকটি অঘোষিত ‘অরেঞ্জ লাইন’ রয়েছে, যা ২০০ থেকে ৫০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এখানে কোনো ফিলিস্তিনি ব্যক্তি বা যানবাহনকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, এই লাইন অগ্রসর হওয়ায় অন্তত ১০টি জাতিসঙ্ঘ স্থাপনাও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পড়ে গেছে।