মাদরাসায় ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার পক্ষে কলকাতা হাইকোর্টের সাফাই

Printed Edition

হিন্দুস্তান টাইমস

পশ্চিমবঙ্গের মাদরাসাগুলোতে ভারতের জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন বাধ্যবাধকতা করে রাজ্য প্রশাসনের তরফ থেকে জারিকৃত আদেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দায়েরকৃত এক জনস্বার্থ পিটিশন শুনানিকালে কলকাতা হাইকোর্ট মন্তব্য করেছে যে, শিক্ষালয়ে এটি পাঠ করলে কোনো অনভিপ্রেত অঘটন ঘটবে না। প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা যায়, রাজ্য সরকারের ওই নির্দেশনায় মাদরাসাগুলোতে ‘বন্দে মাতরম’ আবৃত্তির কথা উল্লেখ ছিল। ওই সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা মামলার শুনানি পরিচালনা করেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ। পিটিশনকারীদের পক্ষে আইনি যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য। ওই স্তোত্র পাঠের ফলে ধর্মীয় সত্তা বা বিশ্বাস ক্ষুণœ হওয়ার ভয় প্রকাশ করা হলে আদালতের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, অন্য কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের কয়েক ছত্র পঙ্ক্তি উচ্চারণ করলেই কি একজন ব্যক্তির স্বকীয় ধর্মীয় পরিচয়ে কোনো আঁচ পড়বে?

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ ব্যক্ত করে বলে, এতে এমন কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। আজ যদি অন্য কোনো ধর্মের উদ্ধৃতি অনুকরণ বা উচ্চারণ করতে বলা হয়, তবে কি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি ভেঙে পড়বে? মিশনারি বা খ্রিষ্টান পরিচালিত বিদ্যাপীঠগুলোর দৃষ্টান্ত টেনে বিচারপীঠ আরো উল্লেখ করে, বহু খ্রিষ্টান প্রতিষ্ঠানে অমুসলিম বা ভিন্নধর্মী শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের প্রার্থনায় যোগ দিতে হয়। সে ক্ষেত্রেও কি একই প্রশ্ন তোলা যুক্তিযুক্ত হবে যে কেন ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর এই চর্চা চাপানো হচ্ছে? রিটকারীদের পক্ষে আইনি পরামর্শক আদালতে দাবি জানান, ‘বন্দে মাতরম’ ভারতের রাষ্ট্রীয় সঙ্গীত নয়, বরং এটি কেবল জাতীয় গান। অতএব, মাদরাসার পড়ুয়াদের ওপর এটি আবশ্যিক করার এখতিয়ার নেই। রাষ্ট্রীয় সঙ্গীতের সাংবিধানিক অবস্থান ও মানদণ্ড জাতীয় গানের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অপর দিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ধীরজ কুমার ত্রিবেদী এজলাসে উপস্থিত ছিলেন। বিচারপ্রক্রিয়ার একপর্যায়ে আদালত রাজ্যের আইনজীবীর কাছে জানতে চায়, ওই বিজ্ঞপ্তি পালনে ব্যর্থতার জন্য অদ্যাবধি কারো বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কি না। আদালত সরাসরি জানতে চায়, নির্দেশ পালনে অবহেলার কারণে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি? উত্তরে রিট আবেদনকারীর কৌঁসুলি জানান, কর্তৃপক্ষ এখনো ওই আদেশ কঠোরভাবে প্রয়োগ করার সাহস দেখায়নি। আদালত আবার প্রশ্ন করে, এতে করে আদতে কি এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে? রাজ্যের কৌঁসুলি লিখিত জবাব ও লিখিত হলফনামা পেশের জন্য অতিরিক্ত সময় প্রার্থনা করে বলেন, কেবল কাল্পনিক বা অমূলক আশঙ্কার ওপর ভর করে সরকারি নির্দেশিকায় স্থগিতাদেশ জারি করা অনুচিত। পরবর্তীতে রাজ্য প্রশাসনের জবাব দাখিল না হওয়া পর্যন্ত মামলার যাবতীয় শুনানি স্থগিত ঘোষণা করে বিচারপীঠ। উল্লেখ্য, সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভায় ‘প্রিভেনশন অব ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ শীর্ষক আইন অনুমোদিত হয়েছে। ‘বন্দে মাতরম বিল’ নামে পরিচিত এই নতুন বিধানের দ্বারা জাতীয় গানকেও এখন জাতীয় সঙ্গীতের মতো সমমানের আইনি অধিকার ও মর্যাদা দেয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আগে কেবল জাতীয় কেতন, শাসনতন্ত্র এবং জাতীয় সঙ্গীত অবমাননার ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষার বিধান থাকলে জাতীয় গান ওই আইনি কাঠামোর আওতাভুক্ত ছিল না। নবপ্রণীত আইনে জাতীয় গানের পরিবেশনায় বিঘœ ঘটালে কিংবা অবমাননা করা হলে তাকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাবাস ও আর্থিক জরিমানার ধারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।