নির্বাচন আইন পরিবর্তন : গণতন্ত্র থেকে নিয়ন্ত্রণের পথে রাষ্ট্রীয় রূপান্তর
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ব্যবস্থায় গত এক দশকে যেসব আইনগত ও সাংবিধানিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, সেগুলো শুধু নির্বাচন পরিচালনার নিয়ম বদলায়নি রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো ও গণতান্ত্রিক চর্চার চরিত্রকেও আমূল রূপান্তর করেছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নির্বাচন আইন ও সংবিধানে যেসব সংশোধন আনা হয়, তদন্ত কমিশনের মতে সেগুলোর প্রধান লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সঙ্কুচিত করা এবং নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা সীমিত করা।
১. ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে : তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অবসান
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত পরিবর্তন ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি। ৩০ জুন ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ২ক পরিচ্ছেদ বাতিল করা হয়। এর ফলে ভবিষ্যতের সব জাতীয় নির্বাচন ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই আয়োজন করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়।
এই সিদ্ধান্তের বিচারিক প্রক্রিয়া ছিল গভীরভাবে বিতর্কিত। ২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগের বেঞ্চ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে, খোলা আদালতে পর্যবেক্ষণ দেয়, ১০ম ও ১১তম জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীন আয়োজন করা যেতে পারে। কিন্তু ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই পর্যবেক্ষণ বাদ দেয়া হয় এবং বলা হয়, শুধু নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই সরকার গঠন করতে পারবেন। ফলে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
বেঞ্চের ভেতরেই মতবিরোধ ছিল। কয়েকজন বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক বললেও অন্যরা তা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিয়া পরবর্তীতে মন্তব্য করেন, ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ রায় আদালতে দেয়া ‘শর্ট অর্ডার’-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তদন্ত কমিশনের কাছে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকও স্বীকার করেন, তার রায়ের নির্দেশনা পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি, বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলুপ্তির প্রক্রিয়াগত দিকটি।
এই সাংবিধানিক পরিবর্তনের পাশাপাশি নির্বাচন আইনেও গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনা হয়। জচঙ-এর ১২(জ) অনুচ্ছেদে থাকা তিন বছর দলীয় সদস্য থাকার বাধ্যবাধকতা ২০১৩ সালে বাতিল করা হয়। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়ন প্রদানে আরো স্বাধীনতা পায়, কিন্তু একই সাথে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় আদর্শিক ধারাবাহিকতা ও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।
আরো একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ছিল “না” ভোট ব্যবস্থা বাতিল। ২০০৮ সালে ভোটারদের সব প্রার্থী প্রত্যাখ্যানের যে গণতান্ত্রিক সুযোগ দেয়া হয়েছিল, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সেটি প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে ভোটারদের অসন্তোষ প্রকাশের একটি সাংবিধানিক পথ বন্ধ হয়ে যায়।
২. ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে : প্রযুক্তির নামে আস্থাহীনতা
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন আইন সংস্কারের নামে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের মাধ্যমে। ২০১৭ সালে গঠিত আইন ও বিধিমালা সংস্কার কমিটি জচঙ-তে একাধিক সংশোধনের প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে ধারা ২৬ সংশোধন করে ইভিএম ব্যবহারের বৈধতা দেয়া হয়, যা ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আইনে পরিণত হয়।
নতুন আইনে নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতা দেয়া হয়, কোন কোন আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে, তা নির্ধারণের। সরকার ও কমিশন একে আধুনিকায়নের পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরলেও বিশেষজ্ঞ ও বিরোধী দলগুলো প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা, প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। তদন্ত কমিশনের মতে, জনআস্থাহীন অবস্থায় ইভিএম চালু করা নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের সন্দেহ আরো বাড়িয়ে দেয়।
৩. ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে : কমিশনের ক্ষমতা সংকোচন
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন আইন ও কাঠামোতে দু’টি মৌলিক পরিবর্তন আসে। প্রথমটি ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২। এই আইনে কমিশনার নিয়োগের নিয়ম-কানুন নির্ধারিত হলেও সমালোচকদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি।
দ্বিতীয় ও আরো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে ২০২৩ সালে জচঙ সংশোধনের মাধ্যমে। ধারা ৯১-এ “বষবপঃরড়হ” শব্দের পরিবর্তে “ঢ়ড়ষষ” শব্দ ব্যবহার করা হয়। এর ফলে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা কার্যত ভোটের দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। নতুন ধারা ৯১ক কমিশনকে নির্দিষ্ট কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে পুনঃভোটের ক্ষমতা দিলেও পুরো আসনের নির্বাচন বাতিল করার ক্ষমতা বাতিল করা হয়, যা আগে কমিশনের একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক অস্ত্র ছিল।
একই সাথে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়ার জন্য নতুন শাস্তিযোগ্য অপরাধ যুক্ত করা হলেও তদন্ত কমিশনের মতে, এই বিধান প্রয়োগে নির্বাচন কমিশনের কার্যকর স্বাধীনতা ছিল না।
তদন্ত কমিশনের সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ
তদন্ত কমিশনের মূল্যায়নে দেখা যায়- ২০১৪ সালের আগে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে একদলীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হয়েছে। ২০১৮ সালে বিরোধী দল ও জনমত উপেক্ষা করে ইভিএম চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের আগে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা খর্ব করে তাকে কার্যত ভোটগ্রহণকারী সংস্থায় পরিণত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরিবর্তনের সমষ্টিগত প্রভাব হলো, নির্বাচন ব্যবস্থা আর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যম নয়, বরং ক্ষমতা সংরক্ষণের একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে। গণতন্ত্রের নামে নির্বাচন টিকে থাকলেও তার মৌলিক প্রতিযোগিতামূলক চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।