রমজানের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা জিম্মি সাধারণ মানুষ

Printed Edition

শাহ আলম নূর

পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে এখনো এক মাসের বেশি বাকি থাকলেও দেশের চিনির বাজারে অস্বাভাবিক অস্থিরতা সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। কয়েক মাস ধরে টানা দরপতনের পর হঠাৎ করেই চিনির দাম যেভাবে বাড়ছে, তা শুধু বাজার পরিস্থিতি নয়; বরং সরবরাহ ব্যবস্থায় কৃত্রিম সঙ্কট ও সিন্ডিকেটের সক্রিয়তার দিকেই ইঙ্গিত করছে বলে মনে করছেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন ও বাজারসংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে এক সপ্তাহের ব্যবধানে চিনির দাম ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

খাতুনগঞ্জের বাজারের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যেখানে প্রতি মণ চিনির দাম ছিল চার হাজার ৪৪০ টাকা, সেখানে ধাপে ধাপে কমে গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে তা নেমে আসে তিন হাজার ২১০ টাকায়। দীর্ঘ সময় ধরে

এই দরপতন চলার পর চলতি জানুয়ারির শুরুতেই হঠাৎ করে দাম বাড়তে শুরু করে। গতকাল মিল গেটে প্রতি মণ চিনির দাম ছিল তিন হাজার ৩৮০ টাকা। পাইকারি বাজারে প্রতি মণ চিনিরি দাম ছিল তিন হাজার ৪৭০ টাকা। এক সপ্তাহ আগে খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ চিনি বিক্রি হয়েছে তিন হাজার ৪১০ টাকায়। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত স্বল্প সময়ে এ ধরনের বড় দরবৃদ্ধির পেছনে স্বাভাবিক কোনো কারণ নেই।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাইকারি বাজারে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ধীরে ধীরে খুচরা বাজারে পড়তে শুরু করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের মুদি দোকান ও কাঁচাবাজারে এখন প্রতি কেজি খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ১০৫ থেকে ১১০ টাকায়, যা গত সপ্তাহেও ছিল ৯৫ থেকে ১০০ টাকা। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে চিনির দাম বেড়েছে অন্তত ৫ শতাংশ। অথচ বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দামে বড় ধরনের কোনো উল্লম্ফন হয়নি; বরং কিছু ক্ষেত্রে দামের নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ। রাজধানীর আগারগাঁও এলাকার গৃহিণী রোকেয়া বেগম বলেন, রমজান আসতে এখনো অনেক বাকি; কিন্তু এখনই চিনির দাম বাড়ছে। রোজা শুরু হলে কী হবে, সেটিই ভয়। মিরপুরের রিকশাচালক মিজানুর রহমানের ভাষায়, ‘চা ছাড়া দিন চলে না। চিনির দাম বাড়লে আমাদের মতো মানুষের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে যায়।’

ব্যবসায়ীদের অনেকেই বলছেন, সরকার সাদা চিনি আমদানির অনুমতি বন্ধ করে দেয়ায় বাজারে সরবরাহ চাপের মুখে পড়েছে। খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো: আমিনুর রহমান জানান, সাদা চিনি আমদানির সুযোগ থাকায় গত বছর বাজারে বিকল্প সরবরাহ ছিল এবং দাম নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেই সুযোগ বন্ধ হওয়ায় মিলারদের সরবরাহের ওপর বাজার পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো এই ব্যাখ্যাকে অজুহাত হিসেবে দেখছে। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, দেশে চিনির প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই আগের বছরের তুলনায় প্রায় চার লাখ টন বেশি চিনি আমদানি হয়েছে। এত বেশি আমদানির পরও বাজারে সঙ্কট তৈরি হওয়া কৃত্রিম বলেই মনে করেন তিনি।

পরিসংখ্যান বিশ্লষণে দেখা যায়, দেশে বছরে গড়ে ২০ থেকে ২২ লাখ টন চিনির চাহিদা থাকলেও রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলো থেকে আসে মাত্র ৩০ হাজার টনের মতো। বাকি প্রায় ৯৮ শতাংশ চিনি আমদানিনির্ভর এবং এই আমদানির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র কয়েকটি শিল্প গ্রুপ। সিটি, মেঘনা, এস আলম, আবদুল মোনেম ও দেশবন্ধু গ্রুপ মিলে বাজারের প্রায় পুরো অংশ তাদের দখলে। এই সীমিতসংখ্যক গ্রুপের হাতে বাজার কেন্দ্রীভূত থাকায় দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

খাতুনগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, মিল থেকে এখন চিনি তুলতে গেলে আট থেকে ১১ দিন পর্যন্ত সিরিয়াল দিতে হচ্ছে, যেখানে আগে দুই-তিন দিনের মধ্যেই সরবরাহ পাওয়া যেত। ইমাম শরীফ ব্রাদার্সের পরিচালক ছৈয়দুল হক বলেন, এই দীর্ঘ অপেক্ষা স্বাভাবিক নয় এবং এতে বোঝা যায় সরবরাহ ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত রাখা হচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, প্রতি বছর রমজান সামনে এলে একই কৌশল অনুসরণ করা হয়। প্রথমে পাইকারি বাজারে দাম বাড়ানো হয়, পরে ধীরে ধীরে তার প্রভাব খুচরা বাজারে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে থাকায় প্রশাসন নির্বাচনী কার্যক্রমে ব্যস্ত, ফলে বাজার তদারকিতে দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। এই সুযোগই নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ী ও মিলার সিন্ডিকেট।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর বলছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন পর্যবেক্ষণ আর আশ্বাসের বাইরে কি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হবে? রমজান শুরু হওয়ার আগেই যদি চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের ভোগান্তি আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ মানুষের চোখ এখন সরকারের দিকে। রমজানের আগে কি সিন্ডিকেট ভাঙার উদ্যোগ নেয়া হবে, নাকি প্রতি বছরের মতোই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার আবারো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে?