দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন

ভারত সফরে আগ্রহী তারেক রহমান আগে চূড়ান্ত করতে চান এজেন্ডা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যত দ্রুত সম্ভব ভারত সফরে যেতে আগ্রহী। তবে দিল্লি সফরের আগে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার একটি সুনির্দিষ্ট ও ফলপ্রসূ এজেন্ডা চূড়ান্ত করতে চান তিনি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু এক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মনে করে, প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর শেষে দেশে ফিরে জনগণের সামনে তুলে ধরার মতো ‘দৃশ্যমান অর্জন’ থাকা প্রয়োজন। সে কারণেই সফরের তারিখ নির্ধারণের আগে আলোচনার বিষয়গুলো চূড়ান্ত করার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের একটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে দ্য হিন্দু জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতের প থেকে বহুপীয় ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি তাতে অংশ নেয়া এড়িয়ে গেছেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ঢাকা ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও নিকটতম প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ককে উপো করতে চায়।

কূটনৈতিক সূত্রটি বলেছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ও ত্যাগ বাংলাদেশ সবসময় স্বীকার করে। একই সাথে বর্তমান বাস্তবতায় দুই দেশের সম্পর্ককে আরো কার্যকর, ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক পর্যায়ে নেয়াই ঢাকার ল্য।

নভেম্বর-ডিসেম্বরে দিল্লি সফরের সম্ভাবনা

কূটনৈতিক সূত্রটির ভাষ্য, আগামী নভেম্বর অথবা ডিসেম্বরের শুরুতে দ্বিপীয় সফরে দিল্লি যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি। ১৯৯৬ সালে স্বারিত ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশ মনে করে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চুক্তিটি নবায়নের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। কারণ, দীর্ঘ তিন দশক ধরে কার্যকর থাকা গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তিকে ঢাকা দ্বিপীয় কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচনা করে।

বাংলাদেশের ওই কর্মকর্তা দ্য হিন্দুকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে নিবিড় আলোচনা করে এজেন্ডা চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু এখনো সেই পর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়নি।

তার মতে, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেবল সৌজন্য বা রাজনৈতিক যোগাযোগের সফর হিসেবে না দেখে ফলাফলভিত্তিক দ্বিপীয় উদ্যোগ হিসেবে পরিকল্পনা করা উচিত।

গঙ্গা চুক্তি নবায়নই একমাত্র ল্য নয়

ঢাকার দৃষ্টিতে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই সফরের একমাত্র এজেন্ডা হওয়া উচিত নয়। দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত বা বাধাগ্রস্ত থাকা দ্বিপীয় সম্পর্কের বিভিন্ন েেত্রও দৃশ্যমান অগ্রগতি চায় বাংলাদেশ।

এর মধ্যে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ ভিসা-কার্যক্রম আবার চালু করা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরোপিত বিভিন্ন বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, স্থলবন্দরগুলোর মাধ্যমে স্বাভাবিক বাণিজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে নেয়া।

কূটনৈতিক সূত্রটি বলেছে, এসব েেত্র সুনির্দিষ্ট ল্য অর্জনের সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। দেশে চলমান জ্বালানি সঙ্কটের প্রোপটে ভারত যদি সহযোগিতার হাত বাড়ায়, সেটিকে ঢাকা ইতিবাচকভাবে দেখবে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।

তার মতে, জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় ভারতের সহযোগিতা দুই দেশের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনের েেত্র ‘বড় ধরনের পদপে’ হিসেবে কাজ করতে পারে।

কঠিন রাজনৈতিক প্রশ্ন আলাদা রাখতে চায় ঢাকা

দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের মতো ‘কঠিন রাজনৈতিক প্রশ্ন’কে বাণিজ্য ও কনস্যুলার সম্পর্কের বিষয়গুলো থেকে আলাদা রাখতে আগ্রহী বাংলাদেশ।

ঢাকার অবস্থান হলোÑ রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা সংবেদনশীল ইস্যু থাকলেও জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাণিজ্য, ভিসা, যোগাযোগ ও কনস্যুলার সেবা যেন স্বাভাবিক রাখা হয়।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে স্বারিত গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তিকে বাংলাদেশের ওই কর্মকর্তা দ্বিপীয় কূটনীতির একটি বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময়ও চুক্তিটি কার্যকর ছিল। অর্থাৎ দলীয় সরকারের পরিবর্তন হলেও এটি দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে টিকে আছে।

তবে চুক্তিটি বছরের শেষ হওয়ার আগে নবায়ন করতে ব্যর্থ হলে দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ

চুক্তি নবায়নের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে বিষয়টি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করতে পারে বলেও মনে করছে ঢাকা।

বাংলাদেশী ওই কূটনৈতিক সূত্রের মতে, ভারতের কিছু নেতা ইতোমধ্যে গঙ্গা চুক্তির বিরোধিতা শুরু করেছেন। বিহারের এমপি সঞ্জয় ঝা তাদের অন্যতম। তাদের অভিযোগ, বর্তমান চুক্তি বিহারের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা নিশ্চিত করছে না।

বাংলাদেশের আশঙ্কা, নবায়নপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে এ ধরনের সমালোচনা আরো জোরালো হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত চুক্তি নবায়নের েেত্র রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।

সে কারণে ঢাকা দ্রুত আলোচনা শুরু করে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী।

সর্বোচ্চ পর্যায়ের সংলাপে প্রস্তুত ঢাকা

কূটনৈতিক সূত্রটি জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে ভারতের সাথে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সংলাপে বসতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ইতোমধ্যে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বাংলাদেশের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে কয়েক দফা আলোচনা করেছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দিল্লি সফরের সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা তৈরিতে আমলা পর্যায়ের আলোচনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ঢাকা।

বাংলাদেশী ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য এজেন্ডা তৈরিতে ঢাকা ‘খোলা মন’ নিয়ে এগোচ্ছে। কিছু বিষয়ে বাংলাদেশ তার অবস্থান থেকে ছাড় দিতে পারে; আবার কিছু েেত্র সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি চায়।

তার ভাষায়, সফরটি এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে দুই দেশের সম্পর্কের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। তাহলেই প্রধানমন্ত্রী দিল্লি থেকে দেশে ফেরার সময় উল্লেখযোগ্য অর্জন সাথে নিয়ে ফিরতে পারবেন।

বাংলাদেশের ওই কূটনৈতিক সূত্র আরো জানিয়েছে, শেখ হাসিনা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করেছেন, সেগুলোকে ভারতের একতরফাভাবে গ্রহণ করা উচিত নয় বলে মনে করে ঢাকা। বাংলাদেশের অবস্থান হলো, তারেক রহমান একজন নির্বাচিত নেতাÑ দিল্লির নীতিনির্ধারণের েেত্র এই বাস্তবতাটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

অন্য দিকে, আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে ভারতে একটি সংবাদ সম্মেলনের উদ্যোগ আটকে দেয়ার যে খবর এসেছে, সেটিকে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে দেখছে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, এটি ভারতের প থেকে একটি ‘গঠনমূলক বার্তা’ এবং ঢাকা বিষয়টি ল করেছে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপি নেতাদের ২০১৮ সালের একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। সে সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেয়ার কথা ছিল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনজীবী লর্ড আলেকজান্ডার কার্লাইলের। কিন্তু ভারত তাকে সে সময় দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি।

সব মিলিয়ে, সম্ভাব্য তারেক রহমানের ভারত সফরকে ঢাকা নিছক আনুষ্ঠানিক সফর হিসেবে দেখতে চাইছে না। গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, ভিসা ও বাণিজ্য স্বাভাবিকীকরণ, স্থলবন্দর দিয়ে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং সামগ্রিকভাবে দ্বিপীয় আস্থা পুনর্গঠনের মতো বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত করাই সফরের মূল ল্য হতে পারে।

তবে সেই ল্য অর্জনের প্রথম শর্ত হিসেবে এখন সামনে এসেছে সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা চূড়ান্ত করা এবং সফরের আগে কর্মকর্তা পর্যায়ে কার্যকর দরকষাকষি শুরু করা। ঢাকার কাছে দিল্লি সফরের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে জনগণকে কী ‘দৃশ্যমান অর্জন’ দেখাতে পারেনÑ তার ওপরই।