রাষ্ট্রপতির সংসদে বক্তব্য দেয়ার অধিকার নেই- ডা: তাহের
জুলাই সনদের আলোকে ডেপুটি স্পিকার চায় জামায়াত : বিরোধীদলীয় নেতা
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকারের পদ গ্রহণে জামায়াতের ইতিবাচক সাড়া রয়েছে। তবে দলটি চায় সরকার আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করুক। এদিকে জাতীয় সংসদে বর্তমান রাষ্ট্রপতির বক্তব্য দেয়ার অধিকার নেই বলে মনে করে জামায়াত। এজন্য সংসদে রাষ্ট্রপতি বক্তব্য দেয়ার সময় জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের এমপিরা ওয়াকআউট করতে পারে বলে জানা গেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আজ প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। এ অধিবেশনেই সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। উদ্বোধনী অধিবেশনে আওয়ামী লীগের সময় নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন বক্তব্য দেবেন। এর আগে গতকাল সরকারি ও বিরোধীদলের সংসদীয় দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় সভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ১১ দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে বিরোধীদলীয় নেতা সংসদ ভবনের এলডি হলে সাংবাদিকদের সামনে কথা বলেন। এ সময় তিনি বলেন, আমরা চাই জাতীয় সংসদ দেশ ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর ও অর্থবহ ভূমিকা পালন করুক। ইতোমধ্যেই আমরা ঘোষণা করেছি-বিরোধীদল হিসেবে আমরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে চাই। আমরা সকল বিষয়ে বিরোধিতা করব না, আবার না বুঝে কোনো সহযোগিতাও করব না। দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকার যে সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, সে সব ক্ষেত্রে আমাদের সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। তবে দেশ ও জাতির ক্ষতি হয়- এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নেয়া হলে আমরা আমাদের দায়িত্ব অনুযায়ী ভূমিকা পালন করব।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, প্রথমে আমরা ভুল ধরিয়ে দেব, সংশোধনের সুযোগ দেব এবং পরামর্শ দেব। যদি দেখি পরামর্শে কাজ হচ্ছে না, তাহলে আমরা প্রতিবাদ করব। প্রতিবাদেও যদি কাজ না হয়, তাহলে জনগণের অধিকারের পক্ষে আমরা দৃঢ়ভাবে দাঁড়াব। আমরা চাই প্রথম ধাপেই সমস্যার সমাধান হোক। তিনি আরো বলেন, এটি সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। যেহেতু তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অনেক কিছু করা সম্ভব। কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সেটিই জাতির জন্য উত্তম হবে।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, এই সংসদ হঠাৎ করে এভাবে গঠিত হয়নি; এটি একটি বিশেষ প্রোপটে হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ বহুবার তার পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারেনি। স্বাধীনতার পর প্রথমবার ১৯৯১ সালে গঠিত সংসদ পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করে। এরপর ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদ পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। কিন্তু অন্য অনেক সংসদ জনগণের গ্রহণযোগ্যতা পায়নি এবং তাদের নৈতিক বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
তিনি বলেন, এই নির্বাচন ২০২৬ সালে হওয়ার কথা ছিল না। সংবিধান অনুযায়ী এটি ২০২৯ সালে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ঘটনার প্রোপটে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জামায়াত আমির বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলন সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা, অসংখ্য শহীদ, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়েছে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের সংগ্রাম, নির্যাতন, গুম-খুন, কারাবরণ, আয়নাঘর এবং দেশান্তরের মতো বহু কষ্টের বিনিময়ে এ পরিবর্তন এসেছে। আমরা যেমন ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১ এবং ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক বাঁকবদলগুলোকে ধারণ করি, তেমনি ২০২৪ সালের ঘটনাকেও আমরা গভীরভাবে ধারণ করি।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরও এ দেশের মানুষ প্রকৃত স্বাধীন নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার ভোগ করতে পারেনি। বারবার স্বৈরশাসন জাতির ঘাড়ে চেপেছে, দুঃশাসন ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হয়েছে এবং মানুষের অধিকার খর্ব হয়েছে। তাই জুলাই আন্দোলন বলেছিল, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ।’ আমরা সকল ক্ষেত্রে সুবিচার চাই এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে চাই। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এবারের জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে-একটি সংসদ নির্বাচন এবং অন্যটি সংস্কার নির্বাচন। যে অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেই একই অর্ডিন্যান্সের আওতায় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সংস্কার পরিষদ গঠনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ফলাফল আপনারা দেখেছেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা সেই ফলাফল মেনে নিয়েছি। এই দু’টি নির্বাচন একে অপরের পরিপূরক। প্রথমে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু হবে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে তারাই আবার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ কারণেই একই অর্ডিন্যান্সের প্রতি সম্মান রেখে আমরা প্রথম দিন দু’টি শপথ গ্রহণ করেছি- প্রথমে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে এবং পরে সংসদ সদস্য হিসেবে। তবে দুঃখজনকভাবে এখন পর্যন্ত সরকারি দলের সদস্যরা প্রথম শপথটি গ্রহণ করেননি। আমরা তাদের প্রতি আহ্বান জানাই- আসুন, জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে সম্মান করি।
তিনি বলেন, জুলাইকে সম্মান করলেই ২০২৪-এর চেতনা বেঁচে থাকবে এবং ২০২৬ অর্থবহ হবে। ২০২৪-এর চেতনাকে অস্বীকার করলে ২০২৬-এর অস্তিত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। মনে রাখতে হবে- বাংলাদেশে যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের প্রায় ৬৯ শতাংশ এ প্রক্রিয়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এটিকে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, গণভোটে যে চারটি বিষয় উত্থাপিত হয়েছিল, আমরা চাই সেগুলো হুবহু গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হোক। এ বিষয়ে আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে।
তিনি আরো বলেন, আমরা আগেই বলেছি- বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করব না। সহযোগিতা করলে তা হবে দেশ ও জনগণের কল্যাণে, আর বিরোধিতা করলে সেটিও হবে দেশ ও জনগণের অধিকারের পক্ষে। প্রয়োজনে সংসদের ভেতরে আমরা লড়াই করব, প্রয়োজন হলে রাজপথেও করব। এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমরা হুটহাট করে আদালতে যাওয়ার পক্ষে নই। একান্ত প্রয়োজন হলে তবেই আদালতের আশ্রয় নেব।
তিনি আরো বলেন, আমরা প্রত্যাশা করি সংসদের স্পিকার নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত ভূমিকা পালন করবেন এবং বিরোধীদলকে যথেষ্ট সুযোগ দেবেন। তাহলে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ফুটে উঠবে এবং গণতন্ত্র টেকসই হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি কার্যকর ও টেকসই গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে। তিনি দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, জনগণ যে রায় দিয়েছেন এবং যে পরিমাণ সমর্থন দিয়েছেন, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।
তিনি বলেন, আমরা দেশের মানুষের কল্যাণে যে দাবিগুলো ইতোমধ্যেই করেছি, সরকার যদি তা বাস্তবায়ন করতে থাকে- তাহলে এভাবেই আমরা তাদেরকে অভিনন্দন জানাতে থাকবো। আমি আশা প্রকাশ করছি, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের করাল গ্রাস থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হবে এবং জুলাইয়ের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে সরকার তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তিনি সবাইকে নিয়ে একটি নিরাপদ, মানবিক, দুর্নীতি ও দুঃশাসনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
ডেপুটি স্পিকার প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারি দল থেকে আমাদের কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তবে আমরা চাই জুলাই সনদের যে প্রস্তাব সেই প্রস্তাব পুরাপুরি বাস্তবায়ন হোক। এর আলোকে বিরোধীদলের যতটুকু পাওনা আমরা অতটুকু চাই, বেশি চাই না। ওই প্রস্তাবেই আছে বিরোধীদল থেকে একজন ডেপুটি স্পিকার। আমরা খণ্ডিতভাবে এটা চাচ্ছি না। আমরা চাই প্যাকেজ। পুরাটাই সেখানে গ্রহণ হোক, বাস্তবায়ন হোক।
রাষ্ট্রপতির বক্তৃতার সময় সংসদ বর্জন করবেন কি না- এমন এক প্রশ্নের জবাবে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, আকাশে যখন সূর্য ওঠে তখন সেটা সবাই দেখে। অধিবেশন শুরু হোক। যখন ঘটবে তখন সেটি জানা যাবে।
এ সময় জামায়াত আমিরের পাশে এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি ও ড. শফিকুল ইসলাম এমপি উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রপতির সংসদে বক্তব্য দেয়ার অধিকার নেই- ডা: তাহের গতকাল বিরোধীদলের সদস্যদের বৈঠক শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এমপি বলেন, আমরা মনে করি বর্তমান রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেয়ার অধিকার নেই। তিনি স্বৈরাচারের দোসর। বিএনপি কেন যে তাকে দিয়ে ভাষণ দেয়াচ্ছে আমরা তা পরিষ্কার নই। এই বিষয়ে আমরা একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেগুলো কাল (আজ) দেখবেন। ডেপুটি স্পিকারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যখন প্রস্তাব আসবে তখন আমরা জানাবো। সংসদে এটি খোলাসা হবে।