বাংলাদেশে সত্যিকার বিপ্লবের জন্য গভীর কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন

ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ঘটনাগুলো একটি বিদ্রোহ হিসেবে শুরু হয়েছিল, একটি নির্দিষ্ট অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আকস্মিক, বিস্ফোরক চাপের মাধ্যমে।

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
Diplomat

হাসিনার পতন ছিল অনিবার্য। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বিপন্ন করতে পারে। ২০২৪ সালের বিক্ষোভকে ‘বিপ্লব’ হিসেবে চিহ্নিত করা ১৭৮৯ সালে ফ্রান্স বা ১৯৭৯ সালে ইরানের চিত্র তুলে ধরে, যখন সমগ্র সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ঘটনাগুলো একটি বিদ্রোহ হিসেবে শুরু হয়েছিল, একটি নির্দিষ্ট অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আকস্মিক, বিস্ফোরক চাপের মাধ্যমে। হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার যখন নৃশংস পদক্ষেপ নেয় এবং এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন গোষ্ঠী যোগ দেয়, তখন এটি একটি আন্দোলনে পরিণত হয়- জবাবদিহিতা এবং সংস্কারের জন্য একটি বৃহত্তর চাপ। তবে, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে একটি সত্যিকারের বিপ্লবের জন্য গভীর কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলা, প্রতিষ্ঠান সংস্কার করা এবং সামাজিক চুক্তি পুনর্নির্মাণ করার ওপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক কাঠামো মূলত এখনো একই। কেবল জনগণই পরিবর্তিত হয়েছে। ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের বিদ্রোহের শক্তিকে অর্থবহ গণতান্ত্রিক সংস্কারে রূপান্তরিত করার জন্য দেশটির কাছে একটি বিরল সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কেবল সেøাগান দিয়ে প্রতিষ্ঠান তৈরি করা সম্ভব নয়। বিরোধী দলগুলোকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের খুঁজে বের করা বা আকর্ষণীয় লেবেল দিয়ে ইতিহাস পুনর্লিখনের পরিবর্তে বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করা, অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং মৌলিক অধিকার রক্ষার দিকে মনোনিবেশ করা উচিত। মিছিলের নেতৃত্বদানকারী নারীরা প্রকৃত সমতা এবং স্বাধীনতার আশা করেছিলেন, কিন্তু এই স্বপ্নগুলো প্রতিশোধ এবং শোষণের নতুন ঢেউয়ের নিচে চাপা পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

হাসিনার আওয়ামী লীগের পতন কেবল প্রতিশোধ নয়, পুনর্গঠনের জন্য একটি স্ফুলিঙ্গ হওয়া উচিত। বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে স্থিতিস্থাপকতা এবং ভঙ্গুরতার মধ্যে দৌড়েছে এবং আজ ব্যবহৃত শব্দগুলো এটিকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে কিনা তা গঠনে অবদান রাখবে। সত্যের প্রতি যতœবান মনোযোগ না দিলে, বিদ্রোহের গণতান্ত্রিক হৃদয় হারিয়ে যেতে পারে, তিক্ততা এবং ভগ্ন প্রতিশ্রুতির আরেকটি চক্র রেখে যেতে পারে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার গণ-বিক্ষোভের ভারে ভেঙে পড়ে। ছাত্রদের একটি অন্যায্য চাকরি কোটা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, কিন্তু দ্রুত তার শাসনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিদ্রোহে পরিণত হয়। শ্রমিক, পেশাদার এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো একত্রিত হয়েছিল, তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে সরকার গুলি ও লাঠি দিয়ে দাবি ও সমালোচনার জবাব দিয়েছিল।

১৫ বছরের অদম্য শাসনের পর, হাসিনার পতন রাস্তায় উদযাপনের সাথে সাথে ইতিহাস গঠনের জন্য একটি তীব্র প্রচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী (জেআই), উদীয়মান জাতীয় নাগরিক দল এবং বামপন্থী ও অতি-ডানপন্থী জোটের মিশ্রণসহ বিরোধী শক্তিগুলো। আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং অনেকেই ক্ষমতাচ্যুত দলটিকে ‘ইসলামের শত্রু’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন, একই সাথে আন্দোলনকে ‘বিপ্লব’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং নৃশংস দমনপীড়ন ও হত্যাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

হাসিনার আওয়ামী লীগ কিছু ‘প্রোটো-ফ্যাসিস্ট’ বৈশিষ্ট্য দেখিয়েছে (যা ফ্যাসিবাদের দিকে সম্ভাব্য পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়), যার মধ্যে রয়েছে হাসিনা এবং তার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে একটি শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের পূজা, সমালোচকদের দমন করার জন্য ব্যবহৃত উত্থিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং সহিংস দমন। তবে, এতে জাতিগত বা বর্ণগত আধিপত্য এবং গণ-আধাসামরিক আন্দোলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের অভাব ছিল। আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ এবং মধ্য-বামপন্থী ছিল এবং এর দমনপীড়ন একটি নির্দিষ্ট জাতিগত শত্রুর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করার পরিবর্তে সমস্ত বিরোধী দলকে লক্ষ্য করে হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর মতো জঘন্য আইনের মাধ্যমে ভিন্নমতের ওপর কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে নির্বাচনকে কারসাজি করেছে, জালিয়াতি এবং ভোটার দমনে লিপ্ত হয়েছে এবং মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করেছে, যার ফলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ফ্রিডম হাউজ স্কোর ৪০/১০০ হয়েছে, যা কর্তৃত্ববাদের স্পষ্ট পতনের ইঙ্গিত দেয়।

আওয়ামী লীগ বিরোধীদের চুপ করানোর জন্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং তার ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছিল- হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশে কমপক্ষে ৬০০টি জোরপূর্বক গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে এবং ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতা গভীর ক্ষত রেখে গেছে। সমাজকে বিভক্ত করতে এবং ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামকে দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। গত ১৫ বছরে, ইসলামপন্থী শক্তিগুলো গ্রামীণ এবং রক্ষণশীল ভোটারদের একত্রিত করার জন্য এই নামটি ব্যবহার করেছে, সংগ্রামকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার লড়াইয়ের পরিবর্তে একটি ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এই আখ্যানটি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে যা যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনকে টিকিয়ে রাখতে পারে।

নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচনী ও সাংবিধানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত, বাস্তব পদ্ধতিগত পরিবর্তনের পরিবর্তে এগুলো মূলত প্রতীকী ইঙ্গিত হিসেবে রয়ে গেছে।

একইভাবে, অনেকেই ২০২৪ সালের অভিযানকে ‘গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন। যদিও এটি নিঃসন্দেহে একটি গণহত্যা এবং একটি গুরুতর মানবাধিকার অপরাধ ছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, বিক্ষোভকারীদের তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার অফিসের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ২০২৪ সালের সহিংসতাকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গণহত্যা হিসেবে নিন্দা করেছে।

হাসিনার যুগ নিঃসন্দেহে গভীর ক্ষত রেখে গেছে, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে : ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের দমনপীড়ন, পদ্ধতিগত দুর্নীতি, জোরপূর্বক গুম এবং বারবার নির্বাচনী কারসাজির সময় কমপক্ষে ১ হাজার ৪০০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এখন চ্যালেঞ্জ হলো সত্যকে স্পষ্টভাবে এবং সততার সাথে লিপিবদ্ধ করা, সে্লাগান এবং প্রচারণার পরিবর্তে যাচাইকৃত তথ্য, মানবাধিকার প্রতিবেদন এবং বাস্তব অর্থনৈতিক রেকর্ডের ভিত্তিতে ইতিহাস বলা।