স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও বিনিয়োগমুখী প্রবৃদ্ধির রূপরেখা

নতুন গভর্নরের প্রথম কর্মদিবস

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর মো: মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য একটি স্পষ্ট কর্মপন্থা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছেন। তার মূল বার্তা ছিল ‘কথা কম, কাজ বেশি’। সকালে একটি সাধারণ গাড়িতে করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এসে তিনি সরাসরি কাজে মনোযোগ দেন এবং সংবাদমাধ্যমের সাথে দীর্ঘ আলাপে না গিয়ে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার এই সংযত উপস্থিতি এবং কাজকেন্দ্রিক মনোভাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে নতুন ধরনের প্রশাসনিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

দায়িত্ব নেয়ার পরপরই তিনি ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালকদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠকে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন এবং কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, কোনো বাহ্যিক চাপ বা প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করা হবে না। কেউ যদি এমন চাপের মুখে পড়েন, তা সরাসরি তাকে জানাতে নির্দেশ দেন তিনি। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা বজায় রাখার দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।

গভর্নর তার বক্তব্যে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে বলেন, একটি নাজুক পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতি নিম্নস্তরের ভারসাম্যে ফিরেছে, যা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এখন ল্য হবে এই স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, যাতে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, এমন উন্নয়ন প্রয়োজন যা সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করবে।

বন্ধ হয়ে থাকা শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করার বিষয়টিকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠান চালু হলে উৎপাদন বাড়বে, বাজারে আস্থা ফিরবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে। একই সাথে উচ্চ সুদের হারকে বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে উল্লেখ করে বিষয়টি পর্যালোচনার কথা জানান তিনি।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখাকে তিনি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে অর্জিত স্থিতিশীলতা টেকসই হবে না। তাই মুদ্রানীতিতে কার্যকর পদপে নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নিয়মভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দেন তিনি। নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মতার বিকেন্দ্রীকরণ বা ডেলিগেশন অব অথরিটি বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করেন। পাশাপাশি সরকারের অন্যান্য সংস্থার সাথে সমন্বয় রেখে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাবমর্যাদা পুনরুদ্ধারকে তিনি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরেন। তার মতে, জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসই আর্থিক খাতের মূল শক্তি। তাই ব্যাংকের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে পেশাদারিত্ব, জবাবদিহিতা ও নৈতিকতা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রথম কর্মদিবসে সংবাদমাধ্যমের সাথে আলোচনা না করলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গভর্নরের দেয়া সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাগুলো সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।

মুখপাত্র জানান, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সুদের হার কমানো এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে।

নির্ধারিত অগ্রাধিকারগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছে। স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমতা জোরদারের এই ল্যগুলো দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

সার্বিকভাবে, নতুন গভর্নরের প্রথম দিনের বার্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো নীতিনিষ্ঠ, স্বাধীন ও ফলাফলভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রত্যাশা তৈরি করেছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে।