এলডিসি উত্তরণে দেশের ওষুধ শিল্পে দেখা দেবে বিশাল সঙ্কট
Printed Edition
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প পড়বে নানা ধরনের সঙ্কটে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় আগামী বছর (২০২৬) স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ করতে যাচ্ছে দেশ। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন হলেও স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের সাথে সাথে কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দেশে। এই সমস্যা সৃষ্টি হবে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত ওষুধ শিল্পে। বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করে এবং ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রফতানি করে। ওষুধ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলডিসি স্ট্যাটাস হারানোর পর এই শিল্পকে বেশ বড় কিছু সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ওষুধ সমিতির মহাসচিব ড. মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, এলডিসি উত্তরণে আমাদের ওষুধ শিল্পে যে সঙ্কট দেখা দেবে সেটা মোকাবেলায় সরকারকে এগিয়ে না এলে কয়েক হাজার কোটি টাকার এ শিল্পের অস্তিত্ব সঙ্কট দেখা দেবে। বিশেষ করে আরঅ্যান্ডডিতে সরকারকে এগিয়ে এসে এ শিল্প রক্ষা করতে হবে।
ওষুধ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমস্যাগুলোর অন্যতম হলো বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সংক্রান্ত সমস্যা। এ কারণে আরোপিত হতে পারে কয়েক প্রকার বিধিনিষেধ। এখনো এলডিসিভুক্ত বলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বুদ্ধিবৃত্তিক চুক্তির (ট্রিপস) আওতায় ওষুধের পেটেন্ট আইন থেকে অব্যাহতি পাচ্ছে। এর সুবিধায় দেশীয় কোম্পানিগুলো পেটেন্টের অধীন ওষুধও উৎপাদন করতে পারে। এলডিসি উত্তরণের পর এই ছাড় আর পাওয়া যাবে না। এতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
প্যাটেন্ট সুবিধা বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশে উৎপাদন খরচ বেড়ে যেতে পারে এবং একই সাথে বাড়বে আমদানি ব্যয়। প্যাটেন্ট রয়েছে এমন ওষুধ আমাদের ওষুধ শিল্প উৎপাদন করতে না পারলে জীবন রক্ষাকারী ওই ওষুধগুলো আমদানি করে আনতে হবে। এমনকি বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এদেশে এজেন্টের মাধ্যমে বেশি দামে তাদের ওষুধ বাজারজাত করতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো পেটেন্টেড ওষুধ উৎপাদন করে বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আনছে, তখন ওই সুবিধাটাও থাকবে না, ফলে বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি আয়ও কমে যেতে পারে।
এ ছাড়া এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের বাজারে ওষুধের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার (জিএসপি) পাচ্ছে। কিন্তু এলডিসি উত্তরণের পর এই জিএসপি সুবিধাও সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
এলডিসিভুক্ত দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশ ওষুধ রফতানিতে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেয়ে আসছে। তখন বাংলাদেশকে চীন, ভারতের মতো দেশের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে, সেটা হবে খুবই কঠিন। কারণ চীন ও ভারত নিজেরা ওষুধের কাঁচামাল তৈরি করে থাকে। বাংলাদেশকে ওষুধের কাঁচামাল আনতে হবে এই দুই দেশ থেকে। এই দুই দেশ নিজেদের বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য কাঁচামালের দাম বাড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে অসম প্রতিযোগিতা ঠেলে দিতে পারে।
এ ছাড়া ওষুধ শিল্পে পেটেন্ট মেনে চলে নিজেদেরকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে হলে নিজেদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প এখনো গবেষণার দিক থেকে একেবারেই দুর্বল। টিকে থাকতে হলে দেশকে গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) বড় বিনিয়োগ করতে হবে। একটি নতুন ওষুধ তৈরি করার পেছনে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে থাকে, বাংলাদেশের হয়তো বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন নেই কিন্তু শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করার ক্ষমতাও বাংলাদেশের কোনো কোম্পানির নেই যদি না সরকার সহায়তা করে। ওষুধ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে উদ্ভাবনী ক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশে আবারো বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির আধিপত্য বিস্তৃত হতে পারে। বৃদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের বাধ্যবাধকতার ফেরে ফেলে বাংলাদেশের কোম্পানি পেটেন্টেড ওষুধ তৈরি করতে না পারলেও বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সেই ওষুধই আমাদের বাজারে নিয়ে আসতে পারে। এতে স্থানীয় কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে ওঠবে, দেশীয় ওষুধের বাজার বিদেশী নির্ভর হয়ে যেতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ ঘটলে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে ওঠতে পারে।
ওষুধ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনো বাংলাদেশের ওষুধ খাতের নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছায়নি। এলডিসি উত্তরণের পর ট্রিপস অনুযায়ী বাংলাদেশের আইনি কাঠামো হালনাগাদ করতে হবে। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে আরো স্বয়ংসম্পূর্ণ ও দক্ষ করতে হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উৎপাদন ও পরীক্ষার পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। এখনি বাংলাদেশের অধিকাংশ ওষুধ কোম্পানি তা করে থাকে। এর বাইরে বাংলাদেশের বড় বেশ কয়েকটি ওষুধ কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রাজিলের মতো কঠিন শর্তযুক্ত দেশের সার্টিফিকেট পেয়েছে। এর ফলে এই দেশগুলোতে বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি করা যায়।
এই সঙ্কট মোকাবেলায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে সরকারের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি।
এর বাইরে বাংলাদেশ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা থেকে কিছু সময়ের জন্য (ট্রানজিশন পিরিয়ড) জন্য ছাড় দাবি করতে পারে। ট্রিপস বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নে সময় চেয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারে বাংলাদেশ। এ ছাড়া যৌথ উদ্যোগে গবেষণা ও পেটেন্টযুক্ত ওষুধ উৎপাদনের পথ খোলা রাখতে পারে বাংলাদেশ। ওষুধ রফতানি করতে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার অন্যান্য দেশে বাজার খোঁজে রফতানি বাড়ানো যায় এবং টিকে থাকতে হলে সেই কাজটিই করতে হবে।