দুর্যোগের ক্ষতি ও করণীয়

সুশাসন

Printed Edition
upso-2
ইকতেদার আহমেদ

দুর্যোগ এমন এক আকস্মিক বিপর্যয় যা মানবজীবনসহ সমাজ, পরিবেশ ও অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি করে। দুর্যোগ মূলত দুই ধরনের, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট। প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম বা প্রতিক্রিয়ায় ঘটে, যেমন- ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও ভূমিকম্প। মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মানুষের অসচেতনতা, ভুল কর্মকাণ্ড বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ঘটে, যেমন- যুদ্ধ-বিগ্রহ, শিল্পকারখানার দুর্ঘটনা, দাবানল ও পরিবেশ দূষণ।

দুর্যোগে অনেক সময় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত সমাজের নিজস্ব সম্পদ দিয়ে সে দুর্যোগের মোকাবেলা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

দুর্যোগ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সংস্থা, অভ্যন্তরীণ সংস্থা এবং এনজিওগুলো যৌথভাবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাপী নীতি ও তহবিল সহায়তা দেয়, অভ্যন্তরীণ সংস্থাগুলো জাতীয়ভাবে সমন্বয় ও উদ্ধারকাজ চালায়। এনজিওগুলো তৃণমূলে মানুষের কাছে তাৎক্ষণিক ত্রাণ ও পুনর্বাসন সেবা পৌঁছে দেয়।

উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর দুর্যোগের ক্ষতি মোকাবেলার সক্ষমতা কম। তবে সব দেশ নিজস্ব সম্পদের ব্যবহার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় দুর্যোগ মোকাবেলায় সচেষ্ট থাকে। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়।

দুর্যোগ মোকাবেলা-বিষয়ক কার্যক্রম সমন্বিত, লক্ষ্যভিত্তিক ও শক্তিশালী করা এবং কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কাঠামো গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২ প্রণয়ন করা হয়। এ আইনের মূল উদ্দেশ্য দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কর্মসূচির মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষতিকর প্রভাব লাঘব করা, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন কর্মসূচি অধিকতর দক্ষতার সাথে পরিচালনা করা, দুর্দশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে জরুরি মানবিক সহায়তা দেয়া। সেই সাথে দুর্যোগ মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি কার্যক্রম সমন্বিত, লক্ষ্যভিত্তিক ও শক্তিশালী করাসহ কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা। আইনে দুর্যোগের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, দুর্যোগ অর্থ প্রকৃতি বা মনুষ্য সৃষ্ট অথবা জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট যেকোনো ঘটনা, যার ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা আক্রান্ত এলাকার গবাদিপশু, পাখি ও মৎস্যসহ জনগোষ্ঠীর জীবন, জীবিকা, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, সম্পদ, সম্পত্তি ও পরিবেশের এরূপ ক্ষতিসাধন করে, অথবা এরূপ মাত্রায় ভোগান্তির সৃষ্টি করে, যা মোকাবেলায় ওই জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সম্পদ, সামর্থ্য ও সক্ষমতা যথেষ্ট নয়; যা মোকাবেলায় ত্রাণ এবং বাইরের সহায়তা প্রয়োজন হয়। যথা- (অ) ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী, টর্নেডো, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, অস্বাভাবিক জোয়ার, ভূমিকম্প, সুনামি, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, নদীভাঙন, উপকূল ভাঙন, খরা, মাত্রাতিরিক্তি লবণাক্ততা, মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক দূষণ, ভবনধস, ভূমিধস, পাহাড়ধস, পাহাড়ি ঢল, শিলাবৃষ্টি, তাপদাহ, শৈত্যপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ইত্যাদি; (আ) বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড, জলযান ডুবি, বড় ধরনের ট্রেন ও সড়ক দুর্ঘটনা, রাসায়নিক ও পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা, জ্বালানি তেল বা গ্যাস নিঃসরণ অথবা বিধ্বংসী কোনো ঘটনা; (ই) মহামারী সৃষ্টিকারী ব্যাধি, যেমন- প্যান্ডেমিক ইন্ফ্লুয়েঞ্জা, বার্ডফ্লু, অ্যানথ্রাক্স, ডায়রিয়া, কলেরা ইত্যাদি; (ঈ) ক্ষতির অনুজীব, বিষাক্ত পদার্থ এবং প্রাণসক্রিয় বস্তুর সংক্রমণসহ জৈব উদ্ভূত বা জৈবিক সংক্রামক দ্বারা সংক্রমণ; (উ) অত্যাবশ্যকীয় সেবা বা দুর্যোগ প্রতিরোধ অবকাঠামোর অকার্যকারিতা বা ক্ষতিসাধন এবং (ঊ) ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির সৃষ্টিকারী কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা এবং দৈব দুর্বিপাক।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৪১ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। কাউন্সিল যেসব দায়িত্ব পালন করবে তার মধ্যে আছে, (ক) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নীতিমালা ও পরিকল্পনা-সংক্রান্ত কৌশলগত দিকনির্দেশনা দান; (খ) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক আইন, নীতিমালা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দান; (গ) বিদ্যমান দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জরুরি সাড়াদান কার্যক্রম পদ্ধতি পর্যালোচনা এবং মূল্যায়ন করে এর সংশোধন, পরিমার্জন বা পরিবর্তনে কৌশলগত দিকনির্দেশনা দান; (ঘ) দুর্যোগ প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম মূল্যায়ন এবং এতদবিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, কমিটি ও ব্যক্তিবর্গকে কৌশলগত পরামর্শ দান; (ঙ) দুর্যোগ-পরবর্তী সাড়াদান ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম এবং এর পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া উন্নয়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, কমিটি ও ব্যক্তিবর্গকে কৌশলগত নির্দেশনা দান; (চ) দুর্যোগ মোকাবেলা বা পুনর্বাসন বিষয়ে গৃহীত সরকারি প্রকল্প বা কর্মসূচির বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা; (ছ) দুর্যোগ-সংক্রান্ত সব বিষয়, কার্যাদি, নির্দেশনা, কর্মসূচি, আইন, বিধি, নীতিমালা, ইত্যাদি সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সেমিনার, কর্মশালা, ইত্যাদি আয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ব্যক্তিবর্গকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা বা পরার্শ প্রদান এবং (জ) এ আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে আনুষঙ্গিক অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ।

আইনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর এবং জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল ও জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল নামে দু’টি পৃথক তহবিল গঠনের কথা বলা আছে।

আইনটিতে দায়িত্ব পালনে বাধা প্রদান বা বাধা প্রদানের প্রচেষ্টা; নির্দেশনাবলি অমান্য করা বা পালনে ব্যর্থতা; মিথ্যা, অসত্য বা ভিত্তিহীন দাবি উত্থাপন; সম্পদের অপব্যবহার বা নিজস্বার্থে ব্যবহার; দুর্গত এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি; লবণাক্ততা বা প্লাবন সৃষ্টি বা চলমান পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি বা বাঁধের পরিসাধন; গণমাধ্যম বা সম্প্রচার কেন্দ্র কর্তৃক আদেশ অমান্য; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত জরুরি নির্দেশাবলি অমান্য এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, ইত্যাদি বিষয়কে অপরাধ গণ্যে এক থেকে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার থেকে এক লাখ অবধি অর্থদণ্ডের বিধান আছে।

অপরাধ বিচারার্থে গ্রহণ বিষয়ে আইনটিতে বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসক বা তার পক্ষে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি কর্তৃক লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো আদালত এই আইনের অধীন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো মামলা বিচারার্থে আমলে গ্রহণ করবেন। এই আইনের অধীন সব অপরাধ অআমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং অআপসযোগ্য হবে।

দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত, দুর্যোগকালীন সতর্কতা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার- তিনটি বিষয় খুব জরুরি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে বাড়ি বা এলাকাভিত্তিক জরুরি পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রয়োজন। প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখা দরকার। এ ছাড়া নিরাপদ আশ্রয় স্থান ও উঁচু স্থান নির্বাচন করে রাখা প্রয়োজন। আশা করা যায়, যেকোনো দুর্যোগের ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনায় উপরোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণে সচেষ্ট হলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সহজতর হবে।

লেখক : সাবেক জজ। সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক