ইসলামী রাজনীতির সঙ্কট : তুলনামূলক পাঠ
Printed Edition
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইসলামী রাষ্ট্রনীতি তৈরি করে না; ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, জনগণের আস্থা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, শূরা, জবাবদিহি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক চুক্তিই ইসলামী রাজনীতিকে জনক্ষমতায় রূপ দিতে পারে। ইসলাম মানুষের হৃদয়ে শক্তিশালী; কিন্তু ইসলামী রাজনীতি তখনই শক্তিশালী হবে, যখন তা মানুষের পেট, অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে পারবে।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইসলামী রাজনীতিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতায় আনে না। আবার রাষ্ট্রে ইসলামের উপস্থিতি থাকলেই জনগণ ন্যায়, শূরা, জবাবদিহি ও মর্যাদার ইসলামী চেতনায় ক্ষমতায়িত হয়- এমনো নয়। পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের অভিজ্ঞতা এই সত্যটি স্পষ্ট করে- ইসলামের নামে রাষ্ট্রীয় বৈধতা নির্মাণ করা সহজ; কিন্তু ইসলামের নৈতিকতা দিয়ে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র ও ক্ষমতায়িত জনগণ গড়া কঠিন কাজ।
উল্লিখিত চারটি দেশের মধ্যে ইসলাম অনুপস্থিত নয়; বরং প্রবলভাবে উপস্থিত। কিন্তু সেই উপস্থিতির ধরন ভিন্ন ভিন্ন। পাকিস্তানে ইসলাম সাংবিধানিক পরিচয়। তুরস্কে ইসলামী রাজনীতি দীর্ঘদিন শাসনক্ষমতার কেন্দ্রে। মিসরে রাষ্ট্রীয় ইসলাম আছে; কিন্তু স্বাধীন রাজনৈতিক ইসলাম দমনকৃত। সৌদি আরবে ইসলাম রাজতন্ত্রের বৈধতার কেন্দ্রে; কিন্তু স্বাধীন দলভিত্তিক ইসলামী রাজনীতি নেই। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ইসলাম, দলীয় ইসলাম, রাজনৈতিক ইসলাম এবং জনক্ষমতায়িত ইসলাম এক নয়।
পাকিস্তানে এখন ক্ষমতার প্রধান চরিত্র প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। আসিম মুনিরের সামরিক ক্ষমতা সম্প্রসারিত হয়ে চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস পদেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য বোঝতে গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও প্রেসিডেন্ট জারদারি পাকিস্তানের প্রথম চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস হিসেবে অনুমোদন করেন আসিম মুনিরকে। তিনি একই সাথে সেনাপ্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
ইসলামী বা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক চরিত্রের মধ্যে মাওলানা ফজলুর রহমানের জেইউআই-এফ/জেইউআই-পি, হাফিজ নাঈমুর রহমানের নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান এবং নিষিদ্ধ বা রাষ্ট্রীয় চাপে থাকা টিএলপি উল্লেখযোগ্য। তবে সামগ্রিক বিরোধী রাজনীতির ক্ষেত্রে ইমরান খানের পিটিআইকে আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়।
পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়, কোনো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক পরিচয় ইসলামী হলেই ইসলামী দলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতায় আসে না। কারণ পাকিস্তানে ক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে সামরিক প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, গোয়েন্দা কাঠামো, বড় রাজনৈতিক পরিবার এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সমীকরণে। ইসলামী দলগুলো ধর্মীয় ইস্যু, মাদরাসা, ব্লাসফেমি, ফিলিস্তিন বা সাংবিধানিক প্রশ্নে চাপ তৈরি করতে পারে; কিন্তু তারা সাধারণত রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ণ অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা-নীতির সক্ষমতা জনগণ ও ক্ষমতাকাঠামোর কাছে বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রমাণ করতে পারেনি। উপরন্তু, দেওবন্দি, বেরলভি, জামায়াতপন্থী, সালাফি ও অন্যান্য ধারার বিভাজন ইসলামী ভোটকে একক রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে দেয় না। ফলে পাকিস্তানের শিক্ষা হলো- রাষ্ট্র ইসলামী হতে পারে; কিন্তু ক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ধর্মভিত্তিক দলগুলোর হাতে না-ও থাকতে পারে; বরং সামরিক প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা ও মূলধারার জোট রাজনীতির হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকতে পারে। সোজাসাপটা বললে- পাকিস্তানে ইসলাম রাষ্ট্রের পরিচয়; কিন্তু ইসলামী দলগুলো রাষ্ট্রক্ষমতার চালিকাশক্তি নয়।
তুরস্ক পাকিস্তানের বিপরীত পাঠ দেয়। তুরস্কের রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ; কিন্তু প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান ও একে পার্টি দীর্ঘদিন ইসলামী রাজনীতিকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে। তুরস্কের সংবিধানের ২ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সামাজিক আইনরাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এমএইচপি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়তাবাদী অংশীদার; ছোট ইসলামী দল হুদা পার সহযোগী শক্তি। বিরোধী রাজনীতিতে সিএইচপি ও একরেম ইমামোগলু প্রধান চরিত্র; কিন্তু ইসলামীবিরোধী শক্তি নয়; মূলধারার ধর্মনিরপেক্ষ/জাতীয়তাবাদী বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্র। অন্য দিকে ইয়েনিদেন রেফাহ ও সাদাত পার্টি ইসলামী ধারার ছোট; কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী। তুরস্কের পার্লামেন্টে একে পার্টি, সিএইচপি, এমএইচপি, হুদা পার, ইয়েনিদেন রেফাহ ও সাদাতের মতো শক্তির উপস্থিতি এই বহুমাত্রিক বাস্তবতা দেখায়।
তুরস্কে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি এখনো শক্তিশালী থাকার কারণ- ধর্মনিরপেক্ষতা সেখানে শুধু রাজনৈতিক সেøাগান নয়; এটি কামাল পাশা- প্রতিষ্ঠিত প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রদর্শন, শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারিক সংস্কৃতি, সামরিক-আমলাতান্ত্রিক ঐতিহ্য এবং শহুরে মধ্যবিত্ত পরিচয়ের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। ইস্তান্বুল, আঙ্কারা, ইজমিরের মতো বড় শহরে ধর্মনিরপেক্ষ/প্রজাতান্ত্রিক ভোটাররা জীবনধারা, নারী স্বাধীনতা, নাগরিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক দক্ষতা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ভারসাম্য খোঁজে। ২০২৪ সালের স্থানীয় নির্বাচনে সিএইচপি ইস্তান্বুল ও আঙ্কারা ধরে রাখে। এ ছাড়া আরো বহু শহরে জয় পায়; রয়টার্স এটিকে এরদোগান ও একে পার্টির জন্য দুই দশকের বড় নির্বাচনী ধাক্কা হিসেবে বর্ণনা করেছে। সুতরাং তুরস্কের শিক্ষা হলো- ইসলামী ধারার রাজনীতি ক্ষমতায় যেতে পারে; কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতান্ত্রিক ঐতিহ্য, নগর মধ্যবিত্ত, নারী ও যুবসমাজের জীবনধারা, অর্থনৈতিক অসন্তোষ এবং জবাবদিহির দাবি একত্র হলে মুসলিম ভোটাররাও বিকল্প খোঁজে। তুরস্ক দেখায়- মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজেও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি দুর্বল হয় না, যদি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা, নাগরিক স্বাধীনতা, নগর সেবা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের ভাষা ধরে রাখতে পারে।
মিসরের ক্ষমতার প্রধান চরিত্র প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, নিরাপত্তা-রাষ্ট্রের কাঠামো এবং সরকারপন্থী সংসদ। মুসলিম ব্রাদারহুড একসময় মিসরের সবচেয়ে শক্তিশালী ইসলামী রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল। ২০১২ সালে মোহাম্মদ মুরসির মাধ্যমে ক্ষমতায়ও এসেছিল। কিন্তু ২০১৩ সালের সামরিক হস্তক্ষেপের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ, দমনকৃত এবং রাজনীতি থেকে কার্যত বহিষ্কৃত হয়। রয়টার্সের বর্ণনায়, ব্রাদারহুড একসময় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী আন্দোলন হলেও এখন মিসরের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বাইরে।
মিসরের মূল শিক্ষা হলো- নির্বাচন জেতা আর রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখা এক নয়। ব্রাদারহুড ভোটে জিতেছিল; কিন্তু সেনাবাহিনী, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ শহুরে মধ্যবিত্ত, কপটিক খ্রিষ্টান সম্প্রদায়, নারীসমাজ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। ফলে দলটির নির্বাচনী ম্যান্ডেট স্থায়ী রাষ্ট্রক্ষমতায় রূপ নিতে পারেনি।
বড় দুর্বলতা ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক চুক্তির অভাব। ব্রাদারহুড দ্রুত রাষ্ট্র ও সমাজের সব অংশকে আশ্বস্ত করতে পারেনি; বরং একাংশের কাছে নির্বাচিত সরকার হলেও অন্য অংশের কাছে রাষ্ট্র দখলের ঝুঁকি হিসেবে দেখা দেয়। এই আস্থাহীনতা রাষ্ট্রকে পাল্টা অবস্থান নেয়ার সুযোগ দেয়। আল-নূর পার্টি এখন একটি ছোট, নিয়ন্ত্রিত ও রাষ্ট্র-সহনীয় সালাফি উপস্থিতি ধরে আছে; কিন্তু ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তিশালী নয়।
মিসরের শিক্ষা হলো- ইসলামী রাজনৈতিক শক্তি যদি শুধু ভোটে জেতে কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র, সংখ্যালঘু, নারীসমাজ, নাগরিক সমাজ, আন্তর্জাতিক অংশীদার ও বিরোধী শক্তিকে আস্থায় নিতে না পারে, তাহলে ক্ষমতা টেকসই হয় না।
সৌদি আরবের মডেল একেবারে ভিন্ন। সেখানে ক্ষমতার প্রধান চরিত্র রাজপরিবার। সৌদি রাষ্ট্রের পরিচয় ইসলামী; ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শাসনব্যবস্থার কর্তৃত্ব কুরআন ও সুন্নাহ থেকে আসে। সৌদি মৌলিক আইন রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে কুরআন ও সুন্নাহর সাথে যুক্ত করে। কিন্তু একই সাথে একটি নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র, যেখানে জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচিত সরকার নেই। স্বাধীন দলীয় বিরোধিতা নেই। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়নে সৌদি আরব একটি নিরঙ্কুশ রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে জাতীয় পর্যায়ে জনগণের ভোটে সরকার গঠনের সুযোগ নেই।
সৌদি রাজতন্ত্র জনগণকে ক্ষমতার বাইরে রাখে মূলত উত্তরাধিকারভিত্তিক শাসন, দলীয় রাজনীতির অনুপস্থিতি, নিয়ন্ত্রিত পরামর্শব্যবস্থা, নিরাপত্তা-নিয়ন্ত্রিত জনপরিসর, রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় বৈধতা এবং অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়। ফলে জনগণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা নির্ধারণে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পায় না।
সৌদি আরবের শিক্ষা হলো- ইসলাম রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতার উৎস হতে পারে; কিন্তু তা জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বা স্বাধীন ইসলামী রাজনীতির নিশ্চয়তা দেয় না।
এই চার দেশের তুলনায় একটি বড় বৈপরীত্য দেখা যায় : মুসলিম সমাজ ইসলামকে সম্মান করে; কিন্তু সবসময় ইসলামী দলকে রাষ্ট্রক্ষমতার নিরাপদ বাহক হিসেবে দেখে না। কারণ, জনগণ শুধু ধর্মীয় পরিচয় দেখে না; তারা দেখে মূল্যস্ফীতি, চাকরি, ন্যায়বিচার, দুর্নীতি, নিরাপত্তা, নারী ও যুবসমাজের মর্যাদা, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা পরিবর্তনের নিশ্চয়তা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো- পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরব- চার দেশ কোনো না কোনোভাবে পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক নিরাপত্তা, সামরিক, অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক কাঠামোর সাথে গভীরভাবে যুক্ত। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য; মিসর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা অংশীদার; সৌদি আরব জ্বালানি, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মিত্র; পাকিস্তানও নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতা ও ভূরাজনৈতিক দরকষাকষির মাধ্যমে পশ্চিমা শক্তির সাথে সম্পর্ক ধরে রেখেছে। এ বাস্তবতা দেখায়, পশ্চিমা শক্তিগুলো সাধারণত ইসলামকে ধর্ম হিসেবে নয়; বরং স্বাধীন, জনভিত্তিক ও রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ইসলামকে কৌশলগত ঝুঁঁকি হিসেবে দেখে। তাই মুসলিম শাসকগোষ্ঠীর সাথে তাদের সম্পর্ক টিকে থাকে; কিন্তু স্বাধীন ইসলামী রাজনৈতিক শক্তির প্রতি সন্দেহ, চাপ ও নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বজায় থাকে। তুরস্কের ক্ষেত্রে ন্যাটো-সদস্য পদ এবং নিরাপত্তা-সম্পর্ক এ বাস্তবতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। অর্থাৎ- তারা পশ্চিমা শক্তির সাথে পৃথকভাবে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখে; কিন্তু নিজেদের মধ্যে যৌথ মুসলিম বিশ্বদৃষ্টি, নিরাপত্তা-সমন্বয় কিংবা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে স্থায়ী ও কার্যকর ঐক্য গড়ে তুলতে পারেনি।
অনেক ইসলামী দল ‘ইসলামই সমাধান’ বলে; কিন্তু সমাধানের প্রাতিষ্ঠানিক নকশা দেয় না। জনগণ সেøাগান নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, চাকরি, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, শিক্ষা, চিকিৎসা ও মর্যাদা চায়। ইসলামী রাজনীতি যদি নৈতিক ভাষা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতায় উত্তীর্ণ না হয়, তাহলে তা চাপ সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু টেকসই জনআস্থা অর্জন করতে পারে না।
প্রচলিত ইসলামী রাজনীতির আরেকটি দুর্বলতা হলো বিভাজন। দেওবন্দি, বেরলভি, সালাফি, মুসলিম ব্রাদারহুড, জামায়াত, সুফি বা রাষ্ট্রীয় আলেম- সবাই ইসলাম বলেন; কিন্তু রাজনৈতিক প্রকল্প এক নয়। ফলে ইসলামী ঐক্য সেøাগানে থাকে; নির্বাচনী ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবে ভেঙে যায়।
আজকের মুসলিম যুবক শুধু ধর্মীয় পরিচয় চায় না; মেধার মূল্যায়ন, কাজ, মর্যাদা, প্রযুক্তি, বৈশ্বিক সুযোগ, পরিচ্ছন্ন শাসন ও স্বাধীনতা চায়। ইসলামী রাজনীতি যদি তার ভবিষ্যৎ ভাষা না হয়, সে ধর্মীয়ভাবে মুসলিম থাকবে; কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অন্য বিকল্প খুঁজবে।
সুতরাং এই চার দেশ ইসলামী রাজনীতির চারটি সীমাবদ্ধ মডেল দেখায়। পাকিস্তান দেখায় চাপভিত্তিক ইসলাম- চাপ আছে; কিন্তু শাসনক্ষমতা নেই। তুরস্ক দেখায় দলীয় ইসলাম- ক্ষমতা আছে; কিন্তু কেন্দ্রীকরণ ও অর্থনৈতিক চাপ আছে। মিসর দেখায় রাষ্ট্রীয় ইসলাম- ইসলাম আছে; কিন্তু স্বাধীন ইসলামী রাজনীতি নেই। সৌদি আরব দেখায় রাজতান্ত্রিক ইসলাম- ইসলাম বৈধতার উৎস; কিন্তু জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নেই।
চূড়ান্ত পাঠ হলো- মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইসলামী রাষ্ট্রনীতি তৈরি করে না; ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, জনগণের আস্থা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, শূরা, জবাবদিহি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক চুক্তিই ইসলামী রাজনীতিকে জনক্ষমতায় রূপ দিতে পারে।
ইসলাম মানুষের হৃদয়ে শক্তিশালী; কিন্তু ইসলামী রাজনীতি তখনই শক্তিশালী হবে, যখন তা মানুষের পেট, অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে পারবে।হ
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য