দুর্যোগ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব
Printed Edition
প্রকৃতি কখনো প্রতিশোধ নেয় না; কেবল তার নিজস্ব নিয়মে প্রতিক্রিয়া জানায়। কিন্তু সেই প্রতিক্রিয়ার সবচেয়ে বড় মূল্য চুকায় মানুষ। বিশেষ করে দরিদ্র, প্রান্তিক ও দুর্বল জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের কোনো একটি উপকূলীয় গ্রামের ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত পরিবার, উত্তরাঞ্চলের নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো কৃষক কিংবা পাহাড়ি অঞ্চলের ভূমিধসে স্বজন হারানো মানুষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা কেবল ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। দূরদর্শী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে তাদের।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি, বিস্তৃত নদীনির্ভর জনপদ এবং দীর্ঘ উপকূলরেখা আমাদের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা এবং লবণাক্ততার বিস্তার মানুষের জীবন ও জীবিকাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনে দুর্যোগের প্রকৃতি যেমন বদলাচ্ছে, তেমনি এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাতও জটিল হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুবার প্রশংসিত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাস ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জনগণের অংশগ্রহণ বহু প্রাণ রক্ষা করেছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনে বর্তমান বাস্তবতা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, যা মোকাবেলায় প্রয়োজন দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি, জলবায়ু অভিযোজন এবং টেকসই উন্নয়নের সমন্বিত কৌশল। রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রথম দায়িত্ব হলো জলবায়ু পরিবর্তনকে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন হিসেবে দেখা। কারণ জলবায়ুজনিত দুর্যোগ অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বাড়ায়, শিক্ষা ব্যাহত করে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়, সামাজিক বৈষম্য তীব্র করে।
আবহাওয়া পূর্বাভাস, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা, পানি নিষ্কাশন, বন সংরক্ষণ, কৃষি গবেষণা এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন করতে হবে। বাংলাদেশের শহরগুলোও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে মুক্ত নয়। অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতে শহরে জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাধার দখল, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিবেশবিধি অমান্য করে নির্মাণ কার্যক্রম এই সঙ্কট তীব্র করছে।
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, লবণাক্ততার বিস্তার এবং নতুন রোগবালাই কৃষিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। কৃষিবান্ধব গবেষণা, জলবায়ু সহনশীল ফসল, আধুনিক সেচব্যবস্থা এবং কৃষকদের প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব থেকে প্রাপ্ত অর্থ যেন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকারিতার সাথে ব্যবহার হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি, অপচয় বা সমন্বয়হীনতা শুধু উন্নয়নকে ব্যাহত করে না; মানুষের আস্থাকেও ক্ষুণœ করে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর স্বার্থরক্ষায় বৈশ্বিক ফোরামে সক্রিয় অবস্থান, ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় সহযোগিতা আদায়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের দায় সীমিত হলেও এর প্রভাব বহন করতে হচ্ছে তুলনামূলকভাবে বেশি।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের আরেকটি দায়িত্ব হলো- পরিবেশ সংরক্ষণকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা। বন উজাড়, নদী দখল, পাহাড় কাটা, জলাভূমি ভরাট এবং বায়ুদূষণ শুধু পরিবেশের ক্ষতি করে না; এগুলো দুর্যোগের ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে হবে। বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করা, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরো প্রস্তুত করে তুলতে পারে।
দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের পাশাপাশি দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক