ফটিকছড়িতে কেঁচো সার উৎপাদনে স্বাবলম্বী নারীরা
Printed Edition
মুহাম্মদ ফজল করিম ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
সবুজ পাহাড় আর অরণ্যঘেরা ফটিকছড়ি উপজেলার হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের হাজারীখিল গ্রামটি পরিচিত পেয়েছে ‘ভার্মি গ্রাম’ নামে। গ্রামের রামটি বদলে দিয়েছেন ওই গ্রামের নারীরা। গ্রামটিতে এখন উৎপাদন হচ্ছে কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট সার। এক সময় যে নারীদের দিন কাটত বন থেকে সংগ্রহ করা কাঠ বিক্রি করা সামান্য আয়ে। সেই নারীরাই উৎপাদন করছেন এ সার। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর সীমিত সামর্থ্য নিয়ে উষা বালা নামে এক নারী গ্রামে প্রথম এ সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত করেন।
জানা যায়, ২০১৬ সালে উষা বালা প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করেন। শুরুতে বিষয়টি স্থানীয়দের কাছে কৌতূহল ও বিস্ময়ের উদ্রেক করলেও উষা বালার অভাবনীয় সাফল্য অল্প দিনেই গ্রামের অন্য নারীদের অনুপ্রাণিত করে। বর্তমানে এই গ্রামের প্রায় ৪০ জন নারী সরাসরি কেঁচো সার উৎপাদনের সাথে যুক্ত। যা তাদের পরিবারে এনেছে সচ্ছলতা।
সরেজমিন দেখা যায়, ২০ ফুট দীর্ঘ ও ৮ ফুট প্রস্থের বিশাল হাউজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন উষা বালা। তিনি জানান, গোবর সংগ্রহ থেকে শুরু করে সার উৎপাদন পর্যন্ত দুই থেকে আড়াই মাস সময় লাগে। তার খামারে প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার কেজি কেঁচো সার উৎপাদিত হয়। যা থেকে অনায়াসেই ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় সম্ভব হচ্ছে।
ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ এখন হাজারীখিলের নারীদের ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রাখছে। গ্রামের সাধারণ গৃহিণীরা এখন সফল উদ্যোক্তা। এই আয় দিয়ে তারা সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাচ্ছেন এবং সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়েছেন। উষা বালা এখন নিম্ন আয়ের নারীদের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। তার এই অসামান্য অবদানের জন্য উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কৃত ও স্বীকৃতি দিয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, রাসায়নিক সারের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হওয়া এবং পিএইচ-এর ভারসাম্যহীনতার ফলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে ভার্মি কম্পোস্ট এক আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় ১৭-১৮টি পুষ্টি উপাদানের মধ্যে ১৩-১৪টিই পাওয়া যায় কেঁচো সারে।
ফটিকছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুসারে, পুরো উপজেলায় বর্তমানে ১২৫ জনের বেশি উদ্যোক্তা বছরে ৫০০ থেকে ৬০০ মেট্রিক টন কেঁচো সার উৎপাদন করছেন। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি পাহাড়ের ফলের বাগান, হর্টিকালচার সেন্টার এবং শহরের ছাদবাগানেও এই সারের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। যেখানে রাসায়নিক সারের কেজি প্রতি দাম প্রায় ২৭ টাকা, সেখানে এই উন্নতমানের জৈব সার পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৫ টাকায়। সাশ্রয়ী দাম ও কার্যকারিতার ফলে এই খাত থেকে বছরে প্রায় কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের দাবি, সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদিত সার বিক্রির জন্য একটি সুসংগঠিত বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এই খাতটি দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি আয়েও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
হারুয়ালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, উষা বালার মতো উদ্যোক্তাদের কারণেই হাজারীখিল গ্রাম আজ স্বনির্ভরতার প্রতীক। আমরা নারীদের এ কাজে আরো উৎসাহিত করছি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক বলেন, ভার্মি কম্পোস্ট একটি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ জৈব সার যা মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে। আমরা নারীদের কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, যাতে এই খাত আরো বিস্তৃত হয়।