নদীভাঙন ও জলবায়ু ঝুঁকি : ঠিকানাহীন মানুষের আর্তনাদ ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

বাংলাদেশ একটি ব-দ্বীপ রাষ্ট্র, যার মানচিত্র প্রতিনিয়ত আঁকিবুঁকি কাটছে অসংখ্য নদ-নদী। কিন্তু এই নদীই যখন কাল হয়ে দাঁড়ায়, তখন পাল্টে যায় জনপদের দৃশ্যপট। বর্তমানে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীভাঙন কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি একটি স্থায়ী মানবিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ তাদের আজীবনের সঞ্চয়, ভিটেমাটি এবং পরিচয় হারিয়ে নিজ দেশে ‘উদ্বাস্তু’ হিসেবে পরিচিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হতে পারে।

যমুনা, পদ্মা বা মেঘনার প্রবল স্রোতে যখন রাতারাতি ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি বিলীন হয়ে যায়, তখন মানুষের হাতে কিছুই করার থাকে না। সিরাজগঞ্জ বা কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে দেখা যায়, ঘুমানোর সময় যে ভিটা ছিল, সকালে উঠে সেখানে কেবল অথৈ জলরাশি। এই মানুষগুলো তাৎক্ষণিকভাবে রাস্তার পাশে বা বেড়িবাঁধে পলিথিন টাঙিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় কৃষিজমিতে নোনা পানি ঢুকে পড়ছে। সাতক্ষীরা বা খুলনার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ধান চাষ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জীবিকা হারিয়ে এবং সুপেয় পানির অভাবে মানুষ ধীরে ধীরে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

একই এলাকায় বারবার বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় (যেমন: সিডর, আইলা, আম্পান) হওয়ার ফলে মানুষের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। বারবার ঘর মেরামত করতে গিয়ে তারা সর্বস্বান্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত কাজের খোঁজে স্থায়ীভাবে ঢাকা বা চট্টগ্রামের বস্তিতে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা : ঝুঁকিতে থাকা জনপদ

সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা (ঈঊএওঝ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড) অনুযায়ী, বাংলাদেশের তিনটি ভৌগোলিক অঞ্চল সবচেয়ে বেশি নদীভাঙন ও জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা অববাহিকা : উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রামের চিলমারী, গাইবান্ধার ফুলছড়ি এবং সিরাজগঞ্জের চৌহালী ও কাজিপুর উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। যমুনার করাল গ্রাসে প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর জমি মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে।

পদ্মা অববাহিকা : পদ্মা নদীর ভাঙনে শরীয়তপুরের নড়িয়া এবং মাদারীপুরের শিবচর এলাকাগুলো তীব্র সঙ্কটে রয়েছে। নড়িয়াতে গত কয়েক বছরে পাকা দালান, হাসপাতাল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ কয়েক হাজার স্থাপনা বিলীন হয়েছে।

উপকূলীয় অঞ্চল : সাতক্ষীরার শ্যামনগর, খুলনার কয়রা এবং ভোলা দ্বীপের মনপুরা ও তজুমদ্দিন এলাকা। এখানে নদীভাঙনের পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। ভোলার মানুষ প্রতি বছর মেঘনার ভাঙনে পিছিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু তাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই।

বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি ও অর্থনৈতিক প্রভাব

জার্মানওয়াচ (এবৎসধহধিঃপয)-এর ‘গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৫’ অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা) ক্ষতি হয়।

অন্য দিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (অউই)-এর তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর গড়ে তার জিডিপির প্রায় ০.৭% থেকে ২% হারাচ্ছে। ২০৫০ সাল নাগাদ এই ক্ষতির পরিমাণ ৯% পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালের তাপপ্রবাহের কারণে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার।

উপকূলীয় অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলো দুর্যোগ থেকে বাঁচতে প্রতি বছর প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা) নিজেদের পকেট থেকে ব্যয় করে, যা সরকারের মোট জলবায়ু বাজেটের প্রায় কাছাকাছি। একেই গবেষকরা ‘নীরব অর্থায়ন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

সরকারি বাজেট ও বরাদ্দ : সক্ষমতার চ্যালেঞ্জ

২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সরকার প্রায় ৪২ হাজার ২০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এটি দেশের মোট বাজেটের প্রায় ১০.০৯ শতাংশ। সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (ইঈঈঞঋ)’ গঠন করেছে, যেখানে এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ হলো বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রতি বছর জিডিপির ২.৫ শতাংশ বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হচ্ছে মাত্র ১ শতাংশের কম। বাকি অর্থের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের ওপর নির্ভরশীল।

সিরাজগঞ্জের কৃষক কাসেম মিয়ার ভাষ্যমতে, ‘বাপ-দাদার চৌদ্দ পুরুষ এইখানে আছিল। গাঙ (নদী) এক রাতেই সব কাইড়া নিছে। এই নিয়া সাতবার ঘর ভাঙলাম। অহন আর যাওয়ার জায়গা নাই।’

সাতক্ষীরার গাবুরা ইউনিয়নের রহিমা বেগম বলেন, ‘ঘরের খুঁটি পইচ্যা যায় নোনা পানিতে, থালাবাসন সব কালো হয়া যায়। আমরা যারা আছি, একটু মিষ্টি পানির লাইগ্যা মাইলের পর মাইল হাঁটি।’

ঢাকার কড়াইল বস্তিতে আশ্রয় নেয়া কুড়িগ্রামের সোলায়মান বলেন, ‘নিজের দেশে থাইকাও আমরা নিজের দেশে আজ মেহমান। ভিটা-মাটি নাই যগো, তগো কোনো ঠিকানা নাই।’

নদীভাঙন ও জলবায়ু উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানে বিশেষজ্ঞরা পাঁচটি প্রধান স্তম্ভের ওপর জোর দিচ্ছেন।

জলবায়ু সহনশীল ‘স্মার্ট শহর’ (ঈষরসধঃব গরমৎধহঃ-ঋৎরবহফষু ঞড়হিং): আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ড. সলিমুল হকের মতে, সব মানুষকে ঢাকা না পাঠিয়ে মোংলা বা সাতক্ষীরার মতো ছোট শহরগুলোকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন সেখানে উদ্বাস্তু মানুষগুলো কর্মসংস্থান ও শিক্ষা পায়।

আধুনিক নদী শাসন ও ড্রেজিং : পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত মনে করেন, নদীকে তার জায়গা দিতে হবে। কেবল বাঁধ দিয়ে নদীকে আটকে রাখা যাবে না, ড্রেজিং করে নদীর গভীরতা ও নাব্যতা বাড়াতে হবে।

নেচার-বেজড সলিউশন : যান্ত্রিক বাঁধের চেয়ে উপকূলীয় এলাকায় ‘সবুজ বেষ্টনী’ বা ম্যানগ্রোভ বনায়ন অনেক বেশি কার্যকর। সুন্দরবন সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চলের মানুষের জন্য অন্তত ৩ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রদান করে।

কৃষি ও জীবিকার রূপান্তর : লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধান (যেমন: ব্রি ধান-৪৭) চাষ এবং ভাসমান সবজি চাষের (ঐুফৎড়ঢ়ড়হরপং) মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে।

জলবায়ু বীমা (ঈষরসধঃব ওহংঁৎধহপব): অর্থনীতিবিদ ড. বিনায়ক সেনের মতে, একটি ‘ন্যাশনাল ক্লাইমেট ইন্স্যুরেন্স’ চালু করা উচিত, যাতে কোনো কৃষক দুর্যোগে সম্পদ হারালে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পায় এবং তাকে উদ্বাস্তু হয়ে শহরে পাড়ি দিতে না হয়।

নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ২০৭০ সাল নাগাদ যদি কার্বন নিঃসরণ বর্তমান হারে চলতে থাকে, তবে বাংলাদেশ তার জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩৩%) হারাতে পারে। ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর সঠিক বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ ফান্ড আদায়ের জন্য জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতাই পারে এই উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধান করতে। নদী যেন মানুষের ঠিকানা কেড়ে না নেয়, বরং নদীকে ঘিরেই যেন গড়ে ওঠে নতুন আগামীর সম্ভাবনা এটাই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।