পরমাণু চুক্তি ছাড়াই হরমুজ খোলার বিনিময়ে যুদ্ধ থামাতে পারেন ট্রাম্প

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

তেহরান যদি হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেয়, তবে ইরানের সাথে আনুষ্ঠানিক পরমাণু চুক্তির দাবি ছেড়ে দিতে সম্মত হতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটি রিপোর্টে এই তথ্য জানিয়েছে। এতে জানানো হয়, ট্রাম্প গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই সিদ্ধান্তের জন্য ভূমিকা তৈরি করেছেন এবং নিজের জ্যেষ্ঠ সহযোগীদের কাছে গোপনে জানিয়েছেন, ইরানের সাথে নতুন কোনো পরমাণু চুক্তি ছাড়াই তিনি এই সামরিক অভিযান শেষ করতে পারেন। বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে সঙ্ঘাত থামানোর ভিত্তি হতে পারে এই নৌপথ দিয়ে আবার জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ উন্মুক্ত করার বিনিময়ে একাধিক শর্ত দিয়েছে ইরান। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে কোটি কোটি ডলার অর্থ ক্ষতিপূরণ, মার্কিন নৌ অবরোধের সমাপ্তি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং অবরুদ্ধ ইরানি সম্পদ মুক্ত করা।

আরাকচি বলেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ার বিষয়টি আংশিকভাবে নির্ভর করবে ইরানে ব্যাপক হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে ক্ষয়ক্ষতি করেছে, তার জন্য ওয়াশিংটন ক্ষতিপূরণ দেয় কি না তার ওপর। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার সচিব মোহাম্মদ বাকের জোলকাদরও তেহরানের অন্যান্য শর্তের তালিকা দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের হুমকি বন্ধ করা; ইরান এবং লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকে তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বন্ধ করা; উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা; ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা।

গত শুক্রবার এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করতে পারে এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর কাছাকাছি রয়েছে ইরান ও ওমান। তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর পর ইরান বন্ধ করে দিয়েছিল।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, হরমুজ প্রণালী নিয়ে ওমানের সাথে চুক্তিটি এখন ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে।’ শনিবার দেয়া বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে আরাকচি বলেন, তেহরানের নির্ধারিত কিছু শর্ত যুক্তরাষ্ট্র পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান এই জলপথ পুনরায় খুলবে না। ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি আরাকচির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ওই শর্তগুলো পূরণ করার পর হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়া হলে কোন কোন নতুন নৌপথ ব্যবহার করা হবে, চুক্তিতে তা নির্ধারণ করা হবে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনা চলছে না। আরাকচি বলেন, জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী চুক্তি ওয়াশিংটন লঙ্ঘন করছে বলে তেহরান মনে করে এবং যতক্ষণ তা অব্যাহত থাকবে, ততক্ষণ ইরান সরাসরি আলোচনায় বসবে না। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে। এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি ‘সংযত’ভাবে সামলাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের সাথে শুধু আংশিকভাবে আলোচনা করছি। আমরা কেবল ইরানের পরিস্থিতি দেখছি, তাদের ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি এবং তাদের হাতে কোনো অর্থ না থাকার বিষয়টি।’

সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় দেশে পেট্রলের উচ্চমূল্য কমানো এবং ভোটারদের কাছে সামরিক অভিযানের সফলতা দেখানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্প চাপের মুখে রয়েছেন। যদিও ট্রাম্প নৌপথটি খুলে দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন, তবে তা অকালপক্ক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

ওমান উপকূলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণ করিডোরে মার্কিন সমর্থিত বাণিজ্যিক নৌপথে একটি তেলের ট্যাংকার লক্ষ্য করে ইরান একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। গতকাল সোমবার গালফ নিউজের খবরে জানা গেছে, হামলার পর ওমান উপকূলের কাছে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের ‘হরমুজ লেটার’ অ্যাকাউন্ট থেকে প্রথম প্রকাশিত ভিডিও এবং তথ্যে দেখা যায়, সোমবার ভোরে দক্ষিণ ইরানের সিরিক এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিক্ষেপ করা হয়। এক্সের বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয়েছে, অন্তত চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ট্যাংকারটিতে আঘাত হানে এবং একইসাথে দক্ষিণ ইরানের আকাশে মার্কিন একটি এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবিও উঠেছে। তবে শেষ পাওয়া খবর পর্যন্ত এই হামলার বিষয়ে ইউকেএমটিও, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড, ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম বা শীর্ষ আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা থেকে আনুষ্ঠানিক সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। আক্রান্ত জাহাজের নাম, মালিকানা, কাস্টমস, নাবিকদের অবস্থা বা মোট ক্ষয়ক্ষতির কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

পাঁচ মাসেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে বিমান হামলা শুরু করেছিল। ট্রাম্প বলেছেন, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা থেকে বিরত রাখা এবং আঞ্চলিকভাবে হুমকি সৃষ্টির সামর্থ্য দুর্বল করে দেয়া। জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল। তবে জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরে ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর আবারো অবরোধ আরোপ করে। তেহরান বলেছিল, এই পদক্ষেপ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। অবশ্য ততদিনে যুদ্ধবিরতিটি কার্যত ভেঙে পড়েছিল।

রয়টার্সকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কোনো বাধা ছাড়াই পুনরুদ্ধারের চুক্তি ঘোষণা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেবে।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরান তার প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করছে কি না, তার সাথে যুক্ত থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপগুলো।

মার্কিন কর্মকর্তাদের এসব বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, সম্ভাব্য চুক্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও সূক্ষ্মভাবে পদক্ষেপগুলো সাজানো হচ্ছে। রয়টার্সের সাথে কথা বলা সূত্রগুলো এর আগে জানিয়েছিল, সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় উপসাগরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর চলাচলের ওপর তেহরানকে নিয়ন্ত্রণ দেয়ার বিষয়টি থাকতে পারে। তবে জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে, বাস্তবে এমন ব্যবস্থা কার্যকর করা সহজ হবে না।

ইরানে অর্থনৈতিক চাপ জোরদার করার ইঙ্গিত ট্রাম্পের

ইরানের বিরুদ্ধে অবিলম্বে নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ না নিয়ে অর্থনৈতিক চাপ জোরদার করার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম আক্সিওসের সাথে এক সংক্ষিপ্ত ফোনালাপে তিনি জানিয়েছেন, তারা পুরো বিষয়টি নিয়ে আপাতত কিছুটা ধীরে সুস্থে এগোচ্ছেন।