ময়মনসিংহে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে শিক্ষার্থী, কিন্তু বাস্তবে নেই কার্যক্রম—এমন গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় জেলার চারটি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
এর মধ্যে ফুলবাড়িয়ার শহীদ স্মৃতি গার্লস হাইস্কুলে পাঁচজন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন সাতজন। অথচ ওই পাঁচজনের একজনও এসএসসিতে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
আর মুক্তাগাছা মহাবিদ্যালয়ের মাধ্যমিক শাখায় ২০২২ সাল থেকেই ভর্তি ও কার্যক্রম বন্ধ। এরপরও চলতি বছর ওই প্রতিষ্ঠানের নামে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন চার শিক্ষার্থী।
অভিযোগ রয়েছে, একটি অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিজেদের প্রতিষ্ঠানের নামে পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ দিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। চারজনই এবার অকৃতকার্য হয়েছেন।
ফুলবাড়িয়ার শহীদ স্মৃতি গার্লস হাইস্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে। দীর্ঘদিনেও প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হয়নি। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ৯৮ জন। শিক্ষক আছেন সাতজন। তবে গণিতের শিক্ষক প্রবাসে থাকায় পদটি বর্তমানে শূন্য।
চলতি এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে অংশ নেয় মাত্র পাঁচজন। সাতজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করেও তাদের কেউই পাস করতে পারেনি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিনের দাবি, শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি, অভিভাবকদের অসহযোগিতা এবং মোবাইল ফোনে আসক্তির কারণে ফলাফলে বিপর্যয় ঘটেছে। তবে তিনি শিক্ষকদের দায়ও অস্বীকার করেননি।
প্রধান শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসত না। অভিভাবক সমাবেশ করেও প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মোবাইল আসক্তিও ফলাফল খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ।
তবে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিয়েও রয়েছে সঙ্কট। প্রধান শিক্ষক জানান, শিক্ষকদের বেতন দিতে না পারায় তাদের ওপর প্রয়োজনীয় চাপ প্রয়োগ করাও সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ভুঞা বলেন, শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানগুলোর তেমন কার্যক্রম নেই। ‘কাগজে শিক্ষার্থী দেখিয়ে পরীক্ষা দেয়ানো হয়েছে কি না’—বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
মাধ্যমিক শাখা বন্ধ, তবুও চার পরীক্ষার্থী
মুক্তাগাছা মহাবিদ্যালয়ের ঘটনাটি আরো গুরুতর। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমিক শাখায় ২০২২ সাল থেকেই কার্যক্রম ও শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রয়েছে। অথচ চলতি বছর এই প্রতিষ্ঠানের নামে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন চারজন। ফলাফলে চারজনই ফেল করেছেন।
জানা গেছে, এমএন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে একটি অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মুক্তাগাছা মহাবিদ্যালয়ের নামে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়। এ কারণে ওই প্রতিষ্ঠানের চার শিক্ষার্থী মুক্তাগাছা মহাবিদ্যালয়ের নামে পরীক্ষায় অংশ নেন।
কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বজরং আগারওয়ালা দাবি করেন, মানবিক কারণে আগের অধ্যক্ষ শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। তবে চলতি বছর চার শিক্ষার্থী কলেজের নামে পরীক্ষা দিয়েছে—এ বিষয়টি তার জানা ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
তবে বিষয়টিকে সরাসরি অনিয়ম হিসেবে দেখছে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড। বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো: শাহাদত উল্লাহ বলেন, বোর্ডের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ফরম পূরণ করায় ঘটনার পুরো দায়ভার কলেজ কর্তৃপক্ষের।
তিনি বলেন, নিজস্ব শিক্ষার্থী না থাকা সত্ত্বেও অন্য একটি অস্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দিয়ে পরীক্ষা দেয়ানো স্পষ্ট অনিয়ম এবং তথ্য গোপনের শামিল। প্রতিষ্ঠানটিকে অনতিবিলম্বে তলব করা হবে। সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানটির স্বীকৃতি বাতিলের সুপারিশ করা হবে।
প্রশ্ন উঠেছে নজরদারি নিয়ে
একদিকে পাঁচ পরীক্ষার্থীর বিপরীতে সাত শিক্ষক, অন্যদিকে মাধ্যমিক শাখার কার্যক্রম বন্ধ থাকার পরও চার শিক্ষার্থীর এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ—দুটি ঘটনাই জেলার মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার তদারকি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষ করে কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী না থাকার পরও কিভাবে বোর্ডের অনুমোদন, আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ফরম পূরণ হলো, কারা এর অনুমোদন দিল এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে গেল—এসব প্রশ্নের জবাব এখনো স্পষ্ট নয়।
শিক্ষাবিদদের মতে, পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী পাস না করার বিষয়টি শুধু ফলাফলের বিপর্যয় নয়; এর পেছনে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, শিক্ষক উপস্থিতি, শিক্ষার্থী ভর্তি, একাডেমিক কার্যক্রম ও প্রশাসনিক তদারকির বাস্তব চিত্র খতিয়ে দেখা জরুরি।
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের তদন্তে এসব অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে কি না—এখন সেটিই দেখার বিষয়।