গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু, আলোচনায় নিরস্ত্রীকরণ ও ইসরাইলি সৈন্য প্রত্যাহার

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর কথা জানালেন ট্রাম্পের দূত
  • যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় নতুন ইসরাইলি হামলা
  • গাজা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো দাভোস সম্মেলনে ঘোষণা করা হবে

গাজার যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে আলোচনায় অংশ নিতে হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সংগঠনের নেতারা বর্তমানে মিসরের রাজধানী কায়রোতে অবস্থান করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এই যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা এগোচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন ইসরাইল বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। পরবর্তী ধাপে গাজার স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোর নিরস্ত্রীকরণ, পুনর্গঠন এবং দৈনন্দিন প্রশাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে বলে জানিয়েছে আলজাজিরা।

হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর এক উপদেষ্টা আলজাজিরাকে জানান, আলোচনায় মূলত রাফাহ সীমান্ত খুলে দেয়া, মিসরের পাশে আটকে থাকা ত্রাণ প্রবেশ নিশ্চিত করা এবং ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তাহের আল-নুনু বলেন, হামাসকে মধ্যস্থতাকারী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করতে হবে যাতে গাজায় শান্তি ও স্বাভাবিকতা ফিরে আসে। তিনি আরো অভিযোগ করেন, ইসরাইল যুদ্ধবিরতি ভাঙার চেষ্টা করছে এবং হামাস মধ্যস্থতাকারীদের সাথে কাজ করছে সীমান্ত খুলে দেয়া, ত্রাণ প্রবেশ করানো ও দখলদার বাহিনী প্রত্যাহারের জন্য।

ইসরাইলি সম্প্রচার সংস্থা কান জানিয়েছে, ইসরাইল পূর্ব গাজার তথাকথিত হলুদ রেখা বা বাফার জোনকে কৌশলগত এলাকা হিসেবে ধরে রাখতে চায়। বর্তমানে ইসরাইল গাজার অর্ধেকেরও বেশি এলাকা দখল করে রেখেছে। ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতারা বুলগেরীয় কূটনীতিক নিকোলাই মøাদেনভের সাথেও বৈঠক করবেন, যিনি যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত শান্তি বোর্ডের নেতৃত্ব দিতে পারেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শিগগিরই প্রায় ১৫ জন বিশ্বনেতার নাম ঘোষণা করবেন, যারা এই অন্তর্বর্তী কমিটির সদস্য হবেন। ফিলিস্তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন আল-শেখ বলেন, গাজার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পশ্চিমতীরের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাথে যুক্ত করতে হবে, যাতে এক ব্যবস্থা, এক আইন ও এক বৈধ অস্ত্রের নীতি বজায় থাকে।

মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসর, তুরস্ক ও কাতার এক যৌথ বিবৃতিতে এই ঘোষণা স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলেছে, এটি গাজায় স্থিতিশীলতা জোরদার ও মানবিক পরিস্থিতি উন্নত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তারা আরো জানিয়েছে, গাজা পরিচালনার জন্য একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক কমিটি গঠন করা হবে, যার নেতৃত্ব দেবেন সাবেক উপমন্ত্রী আলি শাআথ। এই কমিটি গাজার দুই মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জন্য জনসেবা নিশ্চিত করবে। তবে অর্থায়ন ও কার্যক্রম নিয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জাতিসঙ্ঘ অনুমান করেছে, পুনর্গঠনে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি লাগবে এবং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক বছর সময় লাগবে। শাআথ স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, জাতীয় প্রশাসনিক কমিটি (এনসিএজি) ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাথে সম্পূর্ণভাবে একীভূত হবে এবং কোনো বিদেশী সদস্য থাকবে না। ইসরাইলি সেনারা প্রত্যাহার করলে এই কমিটি পুরো গাজা পরিচালনা করবে। তিনি আরো বলেন, কমিটির সদস্যদের সাথে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর যোগাযোগ থাকবে না। পুনর্গঠন কার্যক্রম বিশ্বব্যাংকের একটি বিশেষ তহবিল থেকে অর্থায়ন হবে। ধ্বংসস্তূপ ব্যবহার করে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি বা রাস্তা নির্মাণে পুনর্ব্যবহার করা হবে। সম্পূর্ণ ধ্বংসাবশেষ সরাতে প্রায় তিন বছর সময় লাগবে। তিনি জানান, প্রথম ছয় মাসের মধ্যে বাস্তুচ্যুতদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হবে, পানীয় জলের জন্য লবণাক্ততা দূরীকরণ প্ল্যান্ট মেরামত এবং স্কুলসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র বুধবার গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, এটি গাজায় একটি অন্তর্বর্তী টেকনোক্র্যাটিক প্রশাসন গঠন করবে এবং পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ ও পুনর্গঠনের সূচনা করবে।

প্রথম ধাপে ইসরাইলি বিমান হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছে, শেষ ইসরাইলি বন্দির লাশ উদ্ধার ব্যর্থ হয়েছে এবং সীমান্ত খুলতে বিলম্ব হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। উইটকফ বলেন, লক্ষ্য হলো হামাসের বিকল্প একটি শান্তিপ্রিয় প্রশাসন তৈরি করা এবং তাদের ক্ষমতায়ন করা। তিনি আরো জানান, এখন এই নতুন প্রশাসনের সাথে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও ইসরাইলের সাথে সম্ভাব্য ক্ষমা কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। তবে তার বিবৃতিতে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার বা মানবিক ত্রাণ প্রবেশের বিষয়ে কোনো উল্লেখ ছিল না। গাজায় এখনো ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছে এবং ভোরে কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটেছে।

উইটকফ দাবি করেছেন, প্রথম ধাপে ঐতিহাসিক ত্রাণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু আলজাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খুদারি বলেছেন, প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশের কথা থাকলেও তা হয়নি। তিনি জানান, ঝড়ের পর মানুষ তাদের তাঁবু হারাচ্ছে এবং অধিকাংশ মানুষ গৃহহীন। বর্তমানে সীমিত ত্রাণ প্রবেশ করছে, যা যথেষ্ট নয়। উইটকফ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে হামাস শেষ ইসরাইলি বন্দীর লাশ ফেরত দেবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, তা না হলে গুরুতর পরিণতি হবে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, বন্দীর লাশ ফেরত না আসা পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা শুরু হবে না। আলজাজিরার বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা বলেন, এই চুক্তি সাজানো। যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ইসরাইলের মিত্র হওয়ায় শান্তি প্রক্রিয়া পক্ষপাতদুষ্ট। এইভাবে গাজার যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরু হলেও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর কথা জানালেন ট্রাম্পের দূত

গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। এ ধাপে গাজার নিরস্ত্রীকরণ, অন্তর্বর্তী টেকনোক্র্যাটিক প্রশাসন গঠন এবং পুনর্গঠন কার্যক্রমে গুরুত্ব দেয়া হবে। বুধবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি এ তথ্য জানান। আনাদোলু এজেন্সি ও সূত্র মিডল ইস্ট আই জানায়, উইটকফ বলেন, দ্বিতীয় ধাপে গাজায় একটি অন্তর্বর্তী টেকনোক্র্যাটিক ফিলিস্তিনি প্রশাসন গঠন করা হবে, যার নাম হবে ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)। একই সাথে গাজার পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ শুরু হবে, যেখানে অননুমোদিত সব সশস্ত্র সদস্যকে অস্ত্র জমা দিতে হবে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই ধাপ গাজার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি আরো বলেন, ‘চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠন হামাসকে তাদের সব দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করতে হবে, যার মধ্যে রয়েছে- শেষ মৃত জিম্মির তাৎক্ষণিক প্রত্যাবর্তন।’ এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে ‘গুরুতর পরিণতি’ ভোগ করতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। এ সময় গাজা যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুরস্ক, মিসর ও কাতারকে ধন্যবাদ জানান ট্রাম্পের বিশেষ দূত। তিনি বলেন, তাদের অপরিহার্য মধ্যস্থতাই এখন পর্যন্ত সব অগ্রগতিকে সম্ভব করেছে।

যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় নতুন ইসরাইলি হামলা

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ইসরাইলি সেনারা গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ চালিয়েছে। আনাদোলুর খবরে বলা হয়েছে, এটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির আরেকটি লঙ্ঘন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ইসরাইলি বিমান ও কামান গাজা সিটির পূর্বাঞ্চল আল-তুফাহ এলাকায় হামলা চালায়। একই সাথে মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের পূর্বাংশেও গোলাবর্ষণ করা হয়। দক্ষিণ গাজায় খান ইউনুসের পূর্বদিকে ইসরাইলি সামরিক যান থেকে গুলি চালানো হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এই হামলা গাজার সেইসব এলাকায় হয়েছে, যেখানে ইসরাইলি সেনারা এখনও মোতায়েন রয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের সংখ্যা বা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি। ফিলিস্তিনিরা অভিযোগ করেছেন, ইসরাইল বারবার যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করছে। এই যুদ্ধবিরতি ইসরাইলের ভয়াবহ যুদ্ধ থামিয়েছিল, যে যুদ্ধে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজারেরও বেশি মানুষ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরাইলি হামলায় প্রায় ৪৫০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আরো এক হাজার ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২০২৫ সালের নভেম্বরে গাজায় স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধাহীনতা এবং পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করলেও ইসরাইল এখনো সীমান্ত ক্রসিংগুলো খুলতে অস্বীকার করছে।

গাজা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো দাভোস সম্মেলনে ঘোষণা করা হবে

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, গাজা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো দাভোস সম্মেলনে ঘোষণা করা হবে। তারা আরো জানিয়েছে, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গাজা শান্তি পরিষদে অংশ নেয়ার জন্য আমন্ত্রণ পাঠানো হবে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে পরিষদের সদস্য নির্বাচন করবেন। এর আগে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ গাজা সঙ্ঘাত শেষ করতে প্রেসিডেন্টের ২০ দফা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ ঘোষণা করেন। এই ধাপে যুদ্ধবিরতি থেকে নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাটিক প্রশাসন গঠন এবং পুনর্গঠন কার্যক্রমে অগ্রসর হওয়া হবে।

উইটকফ ব্যাখ্যা করেন, দ্বিতীয় ধাপে একটি অন্তর্বর্তী ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক প্রশাসন গঠন করা হবে, যার নাম হবে ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’। এই কমিটি পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়া শুরু করবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে হামাস তাদের সব দায়িত্ব পালন করবে, যার মধ্যে রয়েছে শেষ ইসরাইলি বন্দীর লাশ ফেরত দেয়া। তিনি সতর্ক করে বলেন, তা না হলে গুরুতর পরিণতি হবে।