মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানে নামবে সরকার। এই অভিযান পরিচালনার জন্য সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির প্রধান থাকবেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব:)। সেনা-বিমান-নৌ বাহীনিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সব বাহিনীর অংশগ্রহণ থাকবে এই অভিযানে। অভিযানের করণীয় নির্ধারণ করতে মাদকের অন্যতম প্রবেশপথ কক্সবাজারে আগামী ১২ মে এক বৈঠকের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

গতকাল বুধবার (২৭ এপ্রিল) বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ও আইন-শৃঙ্খলা সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির প্রথম সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব:)।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিটির এই বৈঠকে অংশ নেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই আজম, বীর প্রতীক, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ, প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) আব্দুল হাফিজ, প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব মো: সিরাজ উদ্দিন মিয়া, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনি, পররাষ্ট্র সচিব মো: জসীম উদ্দিন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মোস্তাফিজুর রহমান। এ ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, পুলিশ মহাপরিদর্শক, মহাপরিচালক, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কোষ্ট গার্ড, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই), সামরিক গোয়েন্দা মহাপরিদফতর (ডিজিএফআই), এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রক অধিদফতর, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কক্সবাজার, উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক সূত্র জানায়, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এই বৈঠকে কক্সবাজার এবং এর আশপাশের জেলাগুলোতে সংঘটিত অপরাধ কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ। এই অপরাধ কর্মকাণ্ডের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসে মাদকব্যবসা এবং চোরা চালান। এটি বন্ধ করতে পারলে সংঘটিত অপরাধ কর্মকাণ্ড কমে আসবে বলে বৈঠকে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরা একমত পোষণ করেন। এরপর মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানে নামার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় চলছে জমজমাট মাদক ব্যবসা। গত সাত মাসে ৩১টি মাদক মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে ৩৫ জনকে। উদ্ধার করা হয়েছে আইস-ক্রিস্টাল মেথ, ইয়াবাসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য। এর মধ্যে ইয়াবার সংখ্যাই ৭০ হাজার পিস। বাংলাদেশী দুষ্টচক্র ও চোরাচালানিদের সাথে সংযোগের মাধ্যমে এসব অপরাধকাণ্ড ঘটাচ্ছে রোহিঙ্গা অপরাধীরা।

কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় অবস্থিত ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গত ৪ বছরের বিভিন্ন সময়ে আটটি গ্রুপের মধ্যে সংঘটিত এসব ঘটনায় অন্তত ২০২ জন খুন হয়েছেন। আহত হয়েছেন অসংখ্য।

সবশেষ ৮ মার্চ উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন নিহত হন। ওই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে উখিয়া উপজেলার বালুখালী ৮-ইস্ট নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র সংগঠন আরসা ও আরএসও সদস্যরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে ওই রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ রফিক (৩৩) গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

স্থানীয় প্রশাসন সূত্র জানায়, রোহিঙ্গাদের একটি অংশ বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে গেছে। ইয়াবা চোরাচালান এবং অবৈধ অস্ত্রই রোহিঙ্গাদের অন্তর্দ্বন্দ্বের মূল কারণ। যেহেতু ক্যাম্প থেকে পাঁচ কিলোমিটার ওপারেই যুদ্ধ হচ্ছে, তাই সহজেই অনুমেয় অস্ত্র কোথা থেকে আসছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকেই অস্ত্র সংগ্রহ করছে। মহেশখালীসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানেও আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশী দুষ্টচক্র ও চোরাচালানিদের সাথে রোহিঙ্গা অপরাধীদের একটি সংযোগ আছে।