নেপাল শ্রীলঙ্কার চেয়েও বাংলাদেশী কর্মীদের পাঠাতে খরচ কেন বেশি?
Printed Edition
- দূতাবাসের তৎপরতা বাড়ানোর পরামর্শ অভিবাসন বিশ্লেষকদের
মনির হোসেন
নেপাল এবং শ্রীলঙ্কার চেয়েও কেনো বাংলাদেশী কর্মীকে বিদেশে যেতে সরকার নির্ধারিত কয়েকগুণ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে, তা নিয়ে খোদ অভিবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যেই রয়েছে নানা ধরনের মত। তবে বেশির ভাগ ব্যবসায়ীর দাবি, একজন কর্মীকে উড়োজাহাজে ওঠার আগেই গ্রামের দালালদের কয়েক হাত ঘুরেই এজেন্সির কাছে আসার কারণে মূলত অভিবাসন ব্যয় সরকার নির্ধারিত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, নেপাল, শ্রীলঙ্কা সরকারের কঠোর মনিটরিং থাকায় মালয়েশিয়ায় একজন কর্মীকে পাঠাতে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকার এক টাকাও বেশি নেয়া হয় না। আবার যাওয়ার পর তাদের দেশের কর্মীদের ফেরত আসার সংখ্যাও অনেক কম। কিন্তু এর বিপরীতে একই দেশে বাংলাদেশী কর্মীদের যেতে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা লাগছে, আবার কখনো সাত লাখ টাকাও লাগছে। এর জন্য তারা মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে থাকা এজেন্টদের মাধ্যমে এজেন্সিগুলোর ভিসা ট্রেডিংকে (ভিসা কেনাবেচা) দায়ী করছেন। তাদের মতে, ভিসা ট্রেডিং ও দালালদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বিদেশগামীদের খরচ সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার কাকরাইলের ফেয়ার ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মো: আনিছুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, নেপাল অথবা শ্রীলঙ্কা থেকে একজন শ্রমিক মালয়েশিয়াতে যাচ্ছে সর্বোচ্চ এক লাখ ৪০ থেকে ৫০ হাজারের মধ্যেই। আর এটি সম্ভব হচ্ছে তাদের দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো ভিসা কিনতে কোথাও প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় না। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধরেন মালয়েশিয়া সরকার নেপাল সরকারের নামে এক লাখ চাহিদাপত্র ইস্যু করেছে। এই চাহিদাপত্র ওদের গভর্মেন্টের সংশ্লিøষ্ট দফতর হয়ে এজেন্সিগুলোর কাছে পৌঁছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো কর্মীদের নিয়োগ করার লক্ষ্যে আবেদন করে। কোনো ভিসা ট্রেডিং করার সুযোগ নেই। টাকা দিয়ে ভিসা কিনে না। তবে কখনো কখনো তারা কর্মীদের শুধু বিমানের টিকিট দিয়ে থাকে। তারপরও তাদের কর্মী যাওয়ার খরচ অনেক কম হয়। তিনি বলেন, যাওয়ার পর কর্মীরা সার্ভিস সেক্টরসহ ভালো ভালো সেক্টরে কাজ পায়। এসব শ্রমিক দেশটিতে গিয়ে চাকরি, বেতন ঠিক মতো পাচ্ছে কি না তাও দূতাবাসের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত মনিটরিং হয়। কোনো সমস্যা পেলেই সেগুলো সমাধান করে ফেলে। অপর দিকে আমাদের বাংলাদেশী কর্মীদের ক্ষেত্রে হচ্ছে তার সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ায় গিয়ে দালাল ধরে চড়া দামে ভিসা কিনে। যেটা নেপালে নেই। এরপর এগুলো ঢাকার এক এজেন্সির মালিক আরেক এজেন্সির কাছে প্রকাশ্যে চড়া দামে বিক্রি করে। যারা কিনছেন তারা তাদের মধ্যস্বত্বভোগীদের (দালাল) নানাভাবে খবর দেয়। গ্রামের এক দালালের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করে আরেক দালালের হাতে দেয়া হয়। সেই দালাল আবার বিক্রি করে আরেক দালালের কাছে। সেখান থেকে আবার বিক্রি হয়ে হয়ে তারপর ঢাকার অফিসে আসে। তিন দালালের হাত ঘোরার কারণে দালালরাই একজন কর্মীর বিপরীতে ৫০ হাজার টাকা করে তিনজন দালাল দেড় লাখ টাকা কেটে রাখে। এখন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক একটি ভিসার রেট সাড়ে তিন লাখ টাকা নির্ধারণ করলে তখন ভিসার দাম পড়ে যায় পাঁচ লাখ টাকা। এর সাথে মেডিক্যাল, সরকারি খরচ বিএমইটি, মন্ত্রণালয়, দূতাবাসের সরকারী সত্যয়ন ফিসহ নানা খাত মিলিয়ে খরচ পাঁচ লাখ টাকা থেকে ছয় লাখে চলে যায়। কখনো সার্ভিস সেক্টরের ভালো ভিসা হলে তো সেটি সাত লাখ টাকা পর্যন্ত দাম উঠে যায়। তাও আবার লেবার শ্রেণীর মতো (অদক্ষ) লোক যায়, যা নেপাল ও শ্রীলঙ্কাাসহ সোর্স কান্ট্রিভুক্ত দেশগুলোতে চিন্তাই করা যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এক প্রশ্নের উত্তরে আনিছুর রহমান বলেন, মালয়েশিয়ায় ভিসা কিনতে গিয়ে আমাদের রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকরা প্রতিযোগিতা করার সময় যে কর্মীর মাসিক বেতন এক হাজার ৭০০ রিংগিত হওয়ার কথা সেটি এজেন্টদের মাধ্যমে বলা হয়, তুই আমাকে মাসিক এক হাজার ৪০০ টাকা বেতনই দিস। এরপর সেটি কখনো ছয় হাজার থেকে আট হাজার রিংগিত পর্যন্ত ওঠে। তিনি বলেন, নেপালের এজেন্সিগুলো কখনোই ভিসা ট্রেডিং করে না, মানে ভিসা কিনে আনে না।
শুধু মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে এমনটি হচ্ছে তা কিন্তু নয়, মধ্যেপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, লেবানন, রাশিয়া, জর্দানসহ শ্রমবান্ধব দেশগুলোতে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশীরা ভিসা ট্রেডিং করছেন। যার কারণে অভিবাসন ব্যয় কোনোভাবে কমানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে বায়রার একজন সদস্য নিজের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের দেশের ক্ষেত্রে বিদেশের যেসব দেশ ভিসা কেনাবেচা করে তারা জানে একমাত্র বাংলাদেশেই ভিসা বিক্রি করে অতিরিক্ত টাকা কামাই করা সম্ভব। তাই তারা বাংলাদেশকেই টার্গেট করে ভিসা ট্্েরডিং ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এখন এটি কমানোর কোনো উপায় নেই দাবি করে তিনি বলেন, তারপরও সরকার চেষ্টা করে দেখতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমাদের অভিবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের নিয়ে অবশ্যই দফায় দফায় বসতে হবে। দিতে হবে দিকনির্দেশনা। কিন্তু সরকার এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে এমনটা দেখিনি। তার মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা আমাদের দূতাবাসের তৎপরতা আরো বাড়ানো দরকার এবং তাদেরকেই এটা নিয়ন্ত্রণে বেশি উদ্যোগ নিতে হবে।
গতকাল প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়ার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়; কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। যার ফলে মন্ত্রণালয়ের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, শুধু মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে বাংলাদেশী দুষ্ট চক্র (সিন্ডিকেট) অভিবাসন ব্যয় বাবদ কর্মীপ্রতি অতিরিক্ত এক লাখ ৫২ হাজার টাকা আদায় করেছে। আর এই চক্রের প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত দাতো শ্রী আমিন নুর। তিনি এ খাত থেকে কৌশলে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে ওঠা অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বিভিন্ন সংস্থার অনুসন্ধানে। যদিও দাতো আমিনের পক্ষ থেকে এসব তার সিন্ডিকেটের এ দেশীয় এজেন্ট স্বপনসহ অন্যরা অস্বীকার করছেন বরাবরই। অপর দিকে নেপাল থেকে যাওয়া একজন কর্মীও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যায়নি। তারা সিন্ডিকেটকে প্রত্যাখ্যান করে মালয়েশিয়া সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে, প্রয়োজনে দেশটিতে তারা কর্মীই পাঠাবে না।