শেষ ইসরাইলি বন্দীর লাশ উদ্ধার সত্ত্বেও গাজার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের অনুমতি দেবে না ইসরাইল
- ফিলিস্তিনি কর্মীদের তথ্য দিতে ইসরাইলের দাবি অক্সফামের প্রত্যাখ্যান
- যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরাইলি হামলা, ভঙ্গুর শান্তি নিয়ে উদ্বেগ
গাজায় থাকা শেষ ইসরাইলি বন্দী রান গিভলির লাশ উদ্ধার ও ইসরাইলে ফেরত নেয়ার মধ্য দিয়ে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেষ হলো। গত ২৬ জানুয়ারি লাশটি উদ্ধার করা হয়। এর ফলে ফিলিস্তিনি পক্ষ চুক্তির প্রথম ধাপের শর্ত প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু ইসরাইল সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি।
চুক্তির প্রথম ধাপে যুদ্ধবিরতি, বন্দিবিনিময়, ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত দখলকৃত এলাকা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, রাফাহ সীমান্ত খুলে দেয়া এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশের কথা ছিল। তবে বাস্তবে ইসরাইল এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি। প্রতিদিনের সামরিক লঙ্ঘনে প্রাণহানি অব্যাহত থাকায় গাজায় মানবিক সঙ্কট আরো গভীর হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দেন। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাব দ্বারা সমর্থিত এই ধাপে হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণ, গাজা থেকে আরো বিস্তৃত ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। তবে নিরস্ত্রীকরণকে কেন্দ্র করে নতুন উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছেন, গাজার নিরস্ত্রীকরণই দ্বিতীয় ধাপের মূল লক্ষ্য, পুনর্গঠন নয়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হামাস বলেছে, নিরস্ত্রীকরণ কোনো একক গোষ্ঠীর বিষয় নয়, এটি ফিলিস্তিনি জনগণের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত। বিশ্লেষকদের মতে, বন্দী ইস্যু শেষ হলেও গাজায় প্রকৃত শান্তির পথে বড় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের অনুমতি দেবে না ইসরাইল : ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের অনুমতি ইসরাইল দেবে না। জাতীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘গাজায় ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তা বাস্তব হয়নি এবং হবেও না।’ খবর তাস নিউজের।
নেতানিয়াহু বলেন, গাজা নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে কোনো পুনর্গঠন কার্যক্রম অনুমোদন করা হবে না। একই সাথে গাজায় তুরস্ক ও কাতারের কোনো সামরিক উপস্থিতিও মেনে নেয়া হবে না বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, জর্দান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পুরো এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ইসরাইলের হাতেই থাকবে, যার মধ্যে গাজাও অন্তর্ভুক্ত। তিনি আরো বলেন, হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং গাজাকে সামরিকভাবে নিষ্ক্রিয় করাই ইসরাইলের মূল লক্ষ্য। সর্বশেষ বন্দীর লাশ ফেরত পাওয়ার পরও এই লক্ষ্য থেকে ইসরাইল সরে আসবে না বলে জানান তিনি। নেতানিয়াহুর বক্তব্য গাজার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
ফিলিস্তিনি কর্মীদের তথ্য দিতে ইসরাইলের দাবি অক্সফামের প্রত্যাখ্যান : গাজায় কর্মরত ফিলিস্তিনি কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য ইসরাইলকে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম। সংস্থাটি বলেছে, এমন তথ্য হস্তান্তর মানবিক নীতি, কর্মীদের নিরাপত্তা এবং তথ্য সুরক্ষা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। খবর আলজাজিরার। অক্সফামের এক মুখপাত্র আলজাজিরাকে জানান, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় ৫০০-এর বেশি মানবিক সহায়তা কর্মী নিহত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে কোনো সঙ্ঘাতপক্ষের কাছে কর্মীদের সংবেদনশীল তথ্য দেয়া তাদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
গত বছর ইসরাইল গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমে কাজ করা এনজিওগুলোর ওপর নতুন ‘নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা মানদণ্ড’ আরোপ করে। এর আওতায় পাসপোর্ট কপি, জীবনবৃত্তান্ত এবং কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের নাম পর্যন্ত জমা দিতে বলা হয়। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি অক্সফামসহ ৩৭টি সংস্থার নিবন্ধন বাতিল করে ইসরাইল। ফিলিস্তিনি এনজিও নেটওয়ার্ক (পিএনজিইউ) এ সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে, এতে স্থানীয় কর্মীদের জীবন সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে। অন্যদিকে, ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ) সীমিত তথ্য দিতে প্রস্তুতির কথা বললেও এই সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, তথ্য দিলে ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা আরো বিপন্ন হতে পারে।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরাইলি হামলা, ভঙ্গুর শান্তি নিয়ে উদ্বেগ : যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গাজায় ইসরাইলি গোলাবর্ষণ ও ড্রোন তৎপরতা অব্যাহত থাকায় শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে গাজা শহরের তুফফাহ এলাকায় ইসরাইলি হামলায় অন্তত চারজন ফিলিস্তিনি নিহত হন বলে চিকিৎসা সূত্রে জানিয়েছে আলজাজিরা। স্থানীয় সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সারা রাত গাজার আকাশে ইসরাইলি ড্রোনের গুঞ্জন শোনা গেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু পরিবার রাত জেগে কাটাতে বাধ্য হয়। ইসরাইলি সেনাবাহিনী সম্প্রতি ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে নিহত এক বন্দীর দেহ উদ্ধারের দাবি করলেও হামলার ধারাবাহিকতা যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। গাজাবাসীরা বলছেন, রাজনৈতিক পর্যায়ে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন তারা দেখছেন না। এদিকে পশ্চিম তীরেও অভিযান জোরদার করেছে ইসরাইল। বিভিন্ন এলাকায় অভিযানে শতাধিক ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি বন্দিবিষয়ক সংগঠনগুলো। অনেক ক্ষেত্রে ঘরবাড়িতে তল্লাশি ও মারধরের অভিযোগও উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির শর্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এবং স্থলভিত্তিক হামলা অব্যাহত থাকলে শান্তি প্রক্রিয়া পুরোপুরি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
তাছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ গাজা উপত্যকায় বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। স্থানীয় সূত্রের বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানায়, গাজার উত্তরের জাবালিয়া এলাকায় ইসরাইলি সেনাদের দখলে থাকা অঞ্চলে অন্তত দু’টি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি আর্টিলারি ইউনিট গোলাবর্ষণ করে এবং সেখানে অবস্থানরত সামরিক যান থেকে মেশিনগানের গুলিও ছোড়া হয়। একই সময়ে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ’র পূর্বে ইসরাইলি যুদ্ধবিমান তিনটি পরিত্যক্ত বাড়িতে বিমান হামলা চালায়। দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলেও ইসরাইলি বিমান হামলার খবরও পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এসব হামলার সাথে একই সময়ে আর্টিলারি শেলিং, সামরিক যান ও হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়। অন্যদিকে, পূর্ব জেরুসালেমের হিজমা শহর টানা দুই দিন ধরে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর অবরোধের মধ্যে রয়েছে। গাজার পাশাপাশি জেরুসালেম ও পশ্চিম তীরেও সামরিক তৎপরতা বাড়ানোয় যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
পশ্চিম তীরে ব্যাপক গ্রেফতার ও হামলা : অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ইসরাইলি সেনাদের অভিযান ও গণগ্রেফতার নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন শহর ও গ্রামে রাতভর অভিযান চালিয়ে বহু ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র ও সংবাদ সংস্থা ওয়াফা। বেথলেহেম এলাকায় অন্তত তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। কালকিলিয়া জেলার আমাতিন গ্রামে ২ ঘণ্টার অভিযানে ১০ জনকে আটক করা হয় এবং ঘরবাড়িতে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়, যা বাসিন্দাদের সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি করেছে। নাবলুসের মাদমা ও বুরিন গ্রামে ইসরাইলি সেনারা অভিযান চালিয়ে বহু মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। পরিস্থিতির কারণে দক্ষিণ নাবলুস অঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় সাময়িকভাবে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। হেবরন গভর্নরেটে চালানো অভিযানে দুই নারীসহ ১২ জনকে আটক করা হয়। এ ছাড়া তুলকারেমে এক যুবককে গুলি করে আহত করার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়।
গাজার শিশুদের মানবিক সঙ্কট সবচেয়ে ভয়াবহ : জাতিসঙ্ঘ : গাজায় চলমান মানবিক সঙ্কটে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসঙ্ঘ। খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসা সঙ্কটের কারণে লাখো শিশু চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। নিউ ইয়র্কে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক বলেন, সীমিত আকারে সহায়তা প্রবেশ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। শীত ও বৃষ্টির মধ্যে অন্তত ১০ লাখ মানুষ এখনো জরুরি আশ্রয় সহায়তার অপেক্ষায়। ইউনিসেফ জানিয়েছে, ইসরাইলি হামলায় গাজার প্রায় সব স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ফলে প্রায় ৬০ শতাংশ শিশু সরাসরি শিক্ষার বাইরে রয়েছে। সংস্থাটির মতে, এই ধ্বংস একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ইতোমধ্যে অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র চালু ও টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন ছাড়া শিশুদের এই ক্ষতি পূরণ সম্ভব নয়। এ অবস্থায় জাতিসঙ্ঘ মানবিক সহায়তা জোরদারের পাশাপাশি গাজায় অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, রাজনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে মানবিক বিপর্যয় আরো গভীর হবে।