সাবেক ডিসি ফয়জুলকে বাঁচাতে মরিয়া জনপ্রশাসনে শায়লা-সিন্ডিকেট
প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরেও তাকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টায় ব্যস্ত শায়লা সিন্ডিকেটের বহাল কর্মকর্তারা।
Printed Edition
অন্যের স্ত্রীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগের প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পেয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল এ এন এম ফয়জুল হককে। সরকারের দুইটি গোয়েন্দা সংস্থা অভিযোগের প্রমাণ পেলেও পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়নি। উপরন্তু বর্তমানে বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া এবং তৎকালীন জনপ্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব শায়লা ফারজানার আর্শীবাদপুষ্ট হওয়ায় যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতিও পেয়েছেন তিনি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরেও সাবেক ডিসি ফয়জুলকে বাঁচাতে মরিয়া হয়েছে জনপ্রশাসনের সেই শায়লা সিন্ডিকেট। ফলে প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরেও তাকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টায় ব্যস্ত সেই সিন্ডিকেটের বহাল কর্মকর্তারা।
ভুক্তভোগী অভিযোগকারী জানান, তৎকালীন বাগেরহাট জেলা প্রশাসক আ ন ম ফয়জুল হক তার স্ত্রীকে প্রলোভন দিয়ে পরকীয়ায় লিপ্ত হন এবং সংসার ভেঙে দেন। এমনকি একপর্যায়ে অভিযোগকারীকে খুন করার হুমকি দেয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে ২০২১ সালের ১১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর তিনি লিখিত অভিযোগ করেন।
তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের মৌখিক নির্দেশে অভিযোগটি জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসআই) ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতর (ডিজিএফআই) যৌথভাবে তদন্ত চালিয়ে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণ করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ফয়জুল হককে ডিসি পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এই বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ সচিব নিজেও ১০ জুন ২০২১ তারিখে ডিসিদের পরিচিতি সভায় উল্লেখ করে বলেন, বাগেরহাটের সাবেক জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় মামলা করেনি।
আ ন ম ফয়জুল হক স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার শাসনামলে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের একান্ত সচিব হিসেবে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন। এরপরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় সিটি করপোরেশন-১ শাখায় চার বছর চাকরি করেছেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ও শায়লা সিন্ডিকেটের সদস্য হওয়ায় সেই অভিযোগের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেই সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক ছিল বহুল আলোচিত ৫ আগস্টের পরে পালিয়ে যাওয়া পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মনিরুল ইসলামের স্ত্রী ও অতিরিক্ত সচিব শায়লা ফারজানা। এই কর্মকর্তা এ এন এম ফয়জুল হকের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় সেই সময়ে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
৫ আগস্টে পটপরিবর্তনের পর ভুক্তভোগী আবারো প্রতিকার চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। কিন্তু এখনো জনপ্রশাসনে শায়লার সিন্ডিকেটে বহাল থাকায় ন্যায় বিচার বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
জনপ্রশাসনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীর অভিযোগের তদন্ত করতে গত ৬ ফেব্রুয়ারি সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব শাহীন আরা বেগমকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসনের শৃঙ্খলা-১ অধিশাখা।
তদন্ত কর্মকর্তা শাহীন আরা বেগমের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই কর্মকর্তা স্বৈরাচারের শাসনামলের ২০২১ সালের ১ মার্চ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আছেন। শায়লা ফারজানার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় দাপটের সাথে তিন বছর ধরে চাকরি করেছেন। শেখ হাসিনার পতন হলেও এই কর্মকর্তা এখনো বহাল রয়েছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ছাড়াও স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার শাসনামলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শায়লা ফারজানার সময়ে শৃঙ্খলা-১ শাখার উপসচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন ২২তম প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ডা: মো: নুরুল হক। উপসচিব বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তার বিষয়ে শৃঙ্খলাজনিত অভিযোগ ও বিভাগীয় মামলা এই শাখার অধীনে। শায়লা ফারজানার নির্দেশে এই কর্মকর্তা এ এন এম ফয়জুল হকের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ ফাইলবন্দী করে রাখেন।
এই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই কর্মকর্তা স্বৈরাচারের শাসনামলের ২০২০ সালের ৫ জুলাই থেকে অদ্যাবধি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আছেন। শায়লা ফারজানার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় দাপটের সাথে পাঁচ বছর চাকরি করেছেন। শেখ হাসিনার পতন হলেও এই কর্মকর্তা এখনো বহাল রয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ছাড়াও স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার শাসনামলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কাজ করেছেন।
এই দুই কর্মকর্তা ছাড়াও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে শায়লা ফারজানার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন এ টি এম শরিফুল আলম। এই কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের অ্যাসিল্যান্ড, ২০১৪ সালের বিতর্কিত ভোটের সময় যশোরের শর্শার ইউএনও হিসেবে কাজ করেছেন। পট পরিবর্তনের পরেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বহাল থেকে এখন ডিসি পদায়নের জন্য তদবির করছেন এই কর্মকর্তা।
২০তম ব্যাচের মোহাম্মদ শামীম সোহেল চট্টগ্রাম ওয়াসার সচিব, চাঁদপুরের এডিসি, নোয়াখালীর সেনবাগের ইউএনও হিসেবে কাজ করেছেন। ঊর্ধ্বতন নিয়োগ-৩ শাখার উপসচিব তৌহিদ বিন হাসান শেখ হাসিনার শাসনামলে নিয়োগ পাওয়ার পর কাজ করেছেন নারায়ণগঞ্জের বন্দর ও ঢাকার লালবাগ সার্কেলের অ্যাসিল্যান্ড হিসেবে। ১৮ এর নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন নবীগঞ্জ উপজেলায়। ঊর্ধ্বতন নিয়োগ-৪ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সারোয়ার, অভ্যন্তরীণ নিয়োগ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ বারিউল করিম খান, প্রেষণ-২ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব জেতী প্রু।
অভিযোগকারীর দাবি, প্রশাসনের ভেতরে একটি গোষ্ঠী তাকে রক্ষায় আগেও তৎপর ছিল, এখনো আছে। এর মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন একজন অতিরিক্ত সচিব, একাধিক যুগ্মসচিব , সিনিয়র উপসচিব এবং ফয়জুলের কয়েকজন ব্যাচমেট।