ইরানে ক্রু উদ্ধার অভিযানকালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪ বিমান ও হেলিকপ্টার ভূপাতিত
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- ইরানের পাল্টা হামলা চলছেই, কুয়েতে বিদ্যুৎ-পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত
- হরমুজ প্রণালী চালু করা নিয়ে ইরান-ওমান আলোচনা
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ ইস্পাহানে যুক্তরাষ্ট্রের দু’টি সি-১৩০ সামরিক বিমান এবং দু’টি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ধ্বংস করেছে। অন্য দিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানি ভূখণ্ডে বিধ্বস্ত হওয়া একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ পাইলটকে এক দুঃসাহসিক অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অবশ্য স্বীকার করা হয়েছে, উদ্ধার অভিযানে দু’টি পরিবহন বিমান যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উড্ডয়ন করতে পারেনি। ইরানিদের হাতে যাতে না যায়, সে জন্য সে দু’টি শক্তিশালী বিস্ফোরক দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’ জয়েন্ট হেডকোয়ার্টার্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ভূপাতিত মার্কিন পাইলটদের উদ্ধারে শত্রুপক্ষ মরিয়া হয়ে দক্ষিণ ইস্পাহানে আগ্রাসন চালালে ইরানি বাহিনী কঠোর জবাব দেয়। আইআরজিসির মুখপাত্রের মতে, এ অভিযানে মার্কিন বাহিনীর দু’টি বিশালাকার সি-১৩০ পরিবহন বিমান এবং দু’টি অত্যাধুনিক ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ বিধ্বস্ত মার্কিন বিমানের ধ্বংসাবশেষের ছবি প্রকাশ করেছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও সি-১৩০ ও ব্ল্যাক হক ভূপাতিত করার ফুটেজ প্রচার করছে। গালিবাফ এ ঘটনাকে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতার প্রমাণ এবং তেহরানের বড় বিজয় হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন। এর আগে ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছিল, ইরানি পুলিশের একটি কমান্ডো ইউনিট মার্কিন সি-১৩০ বিমানটি ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।
পাল্টা দাবিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, ‘আমরা তাকে পেয়েছি।’ তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম এক দুঃসাহসিক তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে ইরানে আটক বা নিখোঁজ থাকা দ্বিতীয় মার্কিন পাইলটকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল বিমানের প্রথম ক্রুকে আগেই উদ্ধার করা হয়েছিল। দ্বিতীয় পাইলটকে উদ্ধারে কয়েক দিন ধরে কয়েক ডজন বিমান ও বিশেষ বাহিনী সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করে। ট্রাম্প এ অভিযানকে সফল বলে ঘোষণা করেছেন।
ইরানি কর্তৃপক্ষ এ ঘটনাকে ওয়াশিংটনের গোয়েন্দা ও সামরিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে। মার্কিন পক্ষ যেখানে দাবি করে আসছে যে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল, সেখানে তেহরান দাবি করছে যে তারা সফলভাবে আধুনিক মার্কিন যুদ্ধযানগুলো ধ্বংস করেছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরানের পক্ষ থেকে এ দাবিগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার একটি প্রচেষ্টা। বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালানো হতে পারে। অন্য দিকে, গালিবাফসহ ইরানের শীর্ষ নেতারা ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
ইরানের পাল্টা হামলা চলছেই, কুয়েতে বিদ্যুৎ-পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত : কুয়েত বলেছে, ইরানি ড্রোন হামলায় তাদের দু’টি বিদ্যুৎ ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একটি তেল স্থাপনায় আগুন ধরে গেছে। এসব হামলায় কেউ হতাহত হয়নি বলেও দাবি করেছে তারা।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পাল্টায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে তেহরান যে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে তাতে উপসাগরের দেশগুলোকেও ব্যাপক ভুগতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। কুয়েতের বিদ্যুৎ, পানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ফাতিমা আব্বাস জোহার হায়াত রোববার বলেন, রাতে ‘অপরাধমূলক আগ্রাসনের’ ফলে দু’টি কেন্দ্রের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং দু’টি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যে কুয়েতের বেসামরিক অবকাঠামোতে এটাই সর্বশেষ হামলার ঘটনা। রাতে আরো ড্রোন হামলায় শুয়াইখ তেল স্থাপনায় আগুন ধরে গেছে এবং একটি সরকারি কার্যালয় প্রাঙ্গণের ‘ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে, বলেছেন তিনি। কুয়েত শহর থেকে খবর পাঠানো আলজাজিরার সাংবাদিক মালিকা ত্রাইনা পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে হামলার ঘটনাকে ‘সর্বনাশা সংবাদ’ আখ্যা দিয়েছেন। ‘কুয়েতে এবং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে পানি লবণমুক্ত করণ বা বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কুয়েতের ৯০ শতাংশের মতো খাবার পানি এসব বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র থেকে আসে,’ বলেছেন তিনি।
সাম্প্র্রতিক দিনগুলোতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাশাপাশি কুয়েতও ধারাবাহিক ইরানি হামলার মুখোমুখি হচ্ছে, বলেছেন দোহা থেকে খবর পাঠানো আলজাজিরার সাংবাদিক ভিক্টোরিয়া গাটেনবি। ইরানের ওপর হামলার তীব্রতা বাড়ানো নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাদের হুমকিগুলোকে যদি বাস্তবে রূপ দেন তাহলে ইরানও উপসাগরের বিভিন্ন দেশে একই ধরনের স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালাতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে, বলেছেন তিনি। বাহরাইনও রোববার ইরানি হামলার কবলে পড়েছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি বাপকো এনার্জিস জানিয়েছে, ইরানি এক হামলায় তাদের এক সংরক্ষণাগারে একটি তেলের ট্যাংকে আগুন ধরে যায়, অবশ্য তা খুব দ্রুতই নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি; ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে, বলেছে তারা।
এর আগে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগুন লাগার খবর দিলেও ঠিক কোথায় আগুন লেগেছিল সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেনি তারা। ইরানি আগ্রাসনের ফলে একটি স্থাপনায় সৃষ্ট আগুন বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের ক্রুরা নিভিয়ে ফেলেছে, বলেছিল তারা। আকাশপথে হামলা হতে যাচ্ছে এমন সতর্ক সঙ্কেত বাজার এক ঘণ্টার পর বাইরাইনের সরকার এ কথা জানায়। পার্শ্ববর্তী আবুধাবির কর্তৃপক্ষও গতকাল রোববার জানায়, আকাশপথে হামলা প্রতিহতে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টরের ধ্বংসাবশেষে তাদের বরুজ পেট্রকেমিক্যাল কারখানায় একাধিক স্থানে আগুন লাগার পর জরুরি বিভাগের কর্মীরা ঘটনাস্থলে ছুটে যায়।
ওই কারখানার কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে; ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত সেটি বন্ধ থাকবে, বলা হয়েছে আবুধাবি মিডিয়া কার্যালয়ের বিবৃতিতে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কারো নিহত বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি, বলেছে তারা। রোববার সৌদি আরবও একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে বলে জানিয়েছে রিয়াদ।
হরমুজ প্রণালী চালু করা নিয়ে ইরান-ওমান আলোচনা : মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার উপায় খুঁজতে বৈঠক করেছে ওমান ও ইরান। গতকাল রোববার ওমানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানায়, দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ ও নির্বিঘœ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার সম্ভাব্য বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সূত্র : এএফপি।
সংস্থাটি জানায়, উভয় পক্ষের বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বেশ কিছু প্রস্তাব ও পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান এ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দিচ্ছে, ফলে কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ রুট। সাধারণ সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এ পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
যুদ্ধের প্রভাব এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ ও নৌ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর আগে ইরান জানিয়েছিল, যুদ্ধ শেষ হলে ওমানের সাথে সমন্বয়ে একটি শান্তিকালীন প্রটোকল প্রণয়ন করা হবে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের নিয়মকানুন নির্ধারণ করা হবে। এ দিকে, ইরানের পার্লামেন্টের একটি কমিটি প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজের ওপর টোল আরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে সংশ্লিষ্ট জাহাজ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ আলোচনা হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যদিও যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকায় তাৎক্ষণিক সমাধান এখনো অনিশ্চিত।