১৪ বছরে নিহত ১ হাজার ১৪৯, আট মাসে হত্যার শিকার ১১ জন
ভারতের সীমান্ত হত্যার নেপথ্যে ভূরাজনৈতিক সম্পৃক্ততা
Printed Edition
এস এম মিন্টু
সীমান্ত হত্যার নেপথ্যে ভূ-রাজনৈতিক বিষয় জড়িত বলের মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের হিসাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত তার আশপাশের দেশগুলোর ওপর কর্তৃত্ববাদী মনোভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এটার অংশ হিসেবে গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীর মদদে বিএসএফ গুলি করে শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ, কৃষক-শ্রমিক থেকে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে হত্যা করেছে। পৃথিবীর কোনো সীমান্তে এমন নির্বিচারে মানুষ হত্যার উদাহরণ নেই। তারা বলেন, সীমান্ত হত্যা না কমলে প্রতিবাদে আমাদেরও সীমান্ত হত্যা করতে হবে।
প্রতি মাসে চোরাকারবারি বা অনুপ্রবেশের নামে নৃশংসভাবে গুলি করে নিরীহ মানুষকে হত্যার অভিযোগ উঠছে বিএসএফের বিরুদ্ধে। সরকারি একটি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ২০১১ সালে ফেলানী হত্যাকাণ্ডের পর ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৪ বছরে এক হাজার ১৪৯ জন বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত বিএসএফের গুলিতে ৯ জন নিহত হয়েছেন। আর চলতি মাসে গতকাল পর্যন্ত আরো দুইজন গুলিতে নিহত হয়েছেন। গত আট মাসে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে তিনটি। গুলিতে আহত হয়েছেন ১১ জন। আটকের পর অপহরণ করা হয়েছে তিনজনকে।
গতকাল গুম কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন নয়া দিগন্তকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে অগ্রগতি হয়নি। তার মতে, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে; প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম, এমনকি জাতিসঙ্ঘের দ্বারস্থ হতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, বহু ঘটনারই এখনো বিচার হয়নি, যা দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে। ভারতের সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের সাথে ভূ-রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় সভার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে; কিন্তু সীমান্ত হত্যা বন্ধ হচ্ছে না। রাজনীতির চেয়েও বড় যে বিষয়টা কাজ করে সেটি হচ্ছে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের যুদ্ধ অবস্থা বিরাজ করে; কিন্তু সেখানে এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আমরা দেখি না; কিন্তু বাংলাদেশ সীমান্তে প্রায়ই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে বিএসএফ দ্বারা। কখনো বলা হয় চোরাকারবারি; কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা দেখিনি যে চোরাচালানিদের সাথে তাদের সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়। সেই কারণে তারা গুলি করে; বরং দেখা যায় যে ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পনামাফিক বাংলাদেশের নাগরিকদের ওপরে গুলি চালিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। এটার কারণে আমাদের উচিত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ বিষয়টা নিয়ে যাওয়া। দুঃখের বিষয় হলো সীমান্ত হত্যা যদি না-ই কমে প্রতিবাদে আমাদেরও সীমান্ত হত্যার জবাব দিবে হবে।
নূর খান লিটন বলেন, আগে ছিল ফ্যাসিস্ট সরকার তাদের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক ছিল। রাজনৈতিকভাবে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, তারা নিজেরাই করত; কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে তো সম্মানজনক একটা অবস্থানে আসা উচিত; কিন্তু দুই বছরেও দেখছি যে, সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না; বরং প্রতিনিয়ত সেটি চলছে সংখ্যাটি কম বা বেশি।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সরকার কখনো পদলেহী হতে পারে না। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বিনা ভোটের নির্বাচনে বারবার জয়ী হয়ে এসেছে। সেই নির্বাচনে ভারত সমর্থন দিলেও এটিকে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে প্রচার করেছে। ভারতের এই আগ্রাসী মনোভাবের জবাব মানুষ গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দিয়েছে। কিন্তু ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী এটিকে সহজভাবে নেয়নি। তারা এখানে একটি পুতুল সরকার বসিয়ে তাদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন চালিয়ে যেতে চেয়েছিল।
বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা (অধিকার)-এর পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলান বলেন, সীমান্ত হত্যার সাথে ভূ-রাজনৈতিক বিষয় জড়িত। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত তার আশপাশের দেশগুলোর ওপর কর্তৃত্ববাদী মনোভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এটার অংশ হিসেবে ভারত বাংলাদেশে একটি অগণতান্ত্রিক এবং তাদের পদলেহী সরকার আশা করে আসছে। গণতান্ত্রিক সরকার কখনো পদলেহী হতে পারে না। শেখ হাসিনা বিনা ভোটের নির্বাচনে বারবার জয়ী হয়ে এসেছে। সেই নির্বাচনে ভারত সমর্থন দিলেও এটিকে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে প্রচার করেছে। ভারতের এই আগ্রাসী মনোভাবের জবাব মানুষ গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী এটিকে সহজভাবে নেয়নি। তারা এখানে একটি পুতুল সরকার বসিয়ে তাদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন চালিয়ে যেতে চেয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিমকে মদদ দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রেখেছিল। গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই ভাষা কিন্তু পাল্টে গেছে। শেখ হাসিনা এখন ভারতে পালিয়ে থেকে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। এ রকম পরিস্থিতিতে বিএসএফ প্রতিনিয়ত ভারতীয় জনগণকে উত্তেজিত করে সীমান্তে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করছে। আমরা যখন বেড়া তৈরি করতে যাচ্ছি বাধা দিচ্ছে, আমাদের সীমানায় স্থাপনা নির্মাণেও বাধা দিচ্ছে। একধরনের উসকানির মধ্যে তারা যাচ্ছে। হত্যাকাণ্ডও অব্যাহত রেখেছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্র্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের হাতে অন্তত ১৩৪ জন বাংলাদেশী প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে এককভাবে ২০২৫ সালেই নিহত হয়েছেন ৩৪ জন, যাদের মধ্যে ২৪ জন সরাসরি গুলিতে এবং ১০ জন শারীরিক নির্যাতনে মারা যান। এর আগের বছরগুলোতে যথাক্রমে ২০২৪ সালে ৩০ জন, ২০২৩ সালে ৩১ জন, ২০২২ সালে ২৩ জন এবং ২০২১ সালে ১৮ জন বাংলাদেশী সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এই প্রাণঘাতী ধারা অব্যাহত রেখে গড়ে প্রতি মাসে অন্তত একজন করে বাংলাদেশী নাগরিক ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন, যা স্বাধীন দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকারের ওপর বড় ধরনের আঘাত। সীমান্তে বাংলাদেশীদের ওপর এই অব্যাহত গুলিবর্ষণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব:) আশরাফুজ্জামান খান নয়া দিগন্তকে বলেন, বিশ্বের অন্যান্য উত্তেজনাপূর্ণ সীমান্তেও এ ধরনের ধারাবাহিক প্রাণহানি দেখা যায় না। তার মতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক কূটনৈতিক দৃঢ়তা এবং জাতীয় স্বার্থে কঠোর অবস্থান নেয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, নীতিগত পরিবর্তন ও জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে হত্যাকাণ্ড কমতে পারে। একই সাথে সীমান্ত এলাকায় বিকল্প অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি, যাতে চোরাচালাননির্ভরতা কমে।