রামপালে অর্ধেক উৎপাদন কমল

এক ইউনিট বন্ধে ৬০০ মেগাওয়াটের নিচে নেমেছে উৎপাদন; ৩ দিন পর আদানি গোড্ডার দ্বিতীয় ইউনিট চালু

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

দেশে তীব্র লোডশেডিংয়ের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় দুই উৎসে একই দিনে বিপরীত চিত্র দেখা দিয়েছে। বাগেরহাটের এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেন্দ্রটির উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে। অন্য দিকে তিন দিন বন্ধ থাকার পর ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের ৮০০ মেগাওয়াটের দ্বিতীয় ইউনিট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ আবার এক হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কয়লা সরবরাহে বিঘœ, কারিগরি ত্রুটি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আকস্মিক উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থার ঝুঁকি আরো স্পষ্ট করে তুলছে। একদিকে বড় কয়েকটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্ভরশীল, অন্য দিকে এসব কেন্দ্রের জ্বালানি ও যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরতার কারণে সামান্য বিঘেœও জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।

গতকাল রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে কেন্দ্রটি এক হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল। ইউনিটটি বন্ধ হওয়ার পর উৎপাদন ৬০০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

রামপালের উৎপাদন কমার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অবশ্য আদানির গোড্ডা কেন্দ্র থেকে সরবরাহ বাড়তে শুরু করে। দুপুর ১২টা ৪ মিনিটে গোড্ডা কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটটি বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডের সাথে আবার সমন্বিত (সিঙ্ক্রেনাইজ) হয়। ইউনিটটি গত বুধবার গভীর রাতে কারিগরি সমস্যায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সকাল ৯টায় বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল প্রায় ৭৫৮ মেগাওয়াট। বেলা ১টার দিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪৬ মেগাওয়াটে। এরপর বেলা ২টায় আদানি পাওয়ারের সরবরাহ এক হাজার ৪৬ মেগাওয়াটে পৌঁছে। এর মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে ৭৫৬ দশমিক ৬৬ মেগাওয়াট এবং দ্বিতীয় ইউনিট থেকে প্রায় ২৯০ মেগাওয়াট সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছিল। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দ্বিতীয় ইউনিটটি চালু হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় যাওয়ার কথা।

আদানি পাওয়ারের গোড্ডা কেন্দ্রে দু’টি ইউনিটের প্রতিটির স্থাপিত সক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ মোট স্থাপিত সক্ষমতা এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিপিডিবি ২০১৭ সালে আদানি পাওয়ারের সাথে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) করে। চাহিদার ওপর নির্ভর করে কেন্দ্রটি এর আগে বাংলাদেশে এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে গোড্ডা কেন্দ্রও নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন দিতে পারেনি। ভারতের রেলপথে তীব্র যানজট ও ঝড়ের কারণে কয়লা পরিবহনে বিঘœ ঘটায় কেন্দ্রটির উৎপাদন প্রায় এক মাস কম ছিল। আদানি পাওয়ার জানিয়েছিল, কয়লা পরিবহন ও লোডিংয়ে বিধিনিষেধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছিল। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়কে অগ্রাধিকার দিয়ে উৎপাদন সমন্বয় করেছিল।

আগস্টের শেষ দিকে গোড্ডার উৎপাদন বাড়তে শুরু করে। দিনের বেলায় প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সর্বোচ্চ প্রায় এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছিল। বুধবার রাতে সরবরাহ এক হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ছাড়ালেও কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় ইউনিটে ত্রুটি দেখা দেয়। এতে সরবরাহ ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়।

দ্বিতীয় ইউনিটের ত্রুটির মূল কারণ ছিল বয়লার ফিড পাম্পে সমস্যা। এটি বয়লারে উচ্চচাপে পানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র। এতে ত্রুটি দেখা দিলে নিরাপত্তার স্বার্থে ইউনিট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তিন দিন মেরামতের পর শনিবার ইউনিটটি ফের গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।

অন্য দিকে রামপাল কেন্দ্রও এর আগে কয়লার ঘাটতির কারণে উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কয়লা সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির পর কেন্দ্রটির উৎপাদন সম্প্রতি এক হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি উঠেছিল। সেই সময়েই একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আবারো উৎপাদন বড় ধাক্কা খেলো।

একই দিনে দুই বিপরীত চিত্র

বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সঙ্কটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এ ঘটনাতেই ফুটে উঠেছে। রামপালের উৎপাদন কমে যাওয়ার সময় আদানির সরবরাহ বাড়লেও দু’টো কেন্দ্রই মূলত কয়লা ও ভারী যন্ত্রপাতিনির্ভর বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফলে জ্বালানি সরবরাহ বা কারিগরি ব্যবস্থাপনায় বিঘœ ঘটলে জাতীয় গ্রিডে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।

রামপাল ও গোড্ডা- দুই কেন্দ্রের উৎপাদন ওঠানামার ঘটনাও দেখাচ্ছে, শুধু স্থাপিত সক্ষমতা বাড়ালেই বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। কেন্দ্রের নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, যন্ত্রপাতির নির্ভরযোগ্যতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিকল্প উৎপাদন সক্ষমতা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে যখন তীব্র লোডশেডিং চলছে, তখন বড় কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাবও দ্রুত গ্রিডে পড়ে। বিপরীতে কোনো বড় কেন্দ্রের বন্ধ ইউনিট চালু হলে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়। ফলে বিদ্যুৎব্যবস্থায় ‘নামমাত্র সক্ষমতা’ নয়, বরং নির্ভরযোগ্য ও ধারাবাহিক উৎপাদন সক্ষমতাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

রামপালের বিদ্যুৎ কতটা দামি

রামপালের এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগের। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার কেন্দ্রটির বিদ্যুতের দাম পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী রামপালের বিদ্যুতের ট্যারিফ ছিল প্রতি ইউনিট ১৩.৫৭ টাকা। একই সময় মাতারবাড়ির জন্য উল্লেখিত মূল্য ছিল ৮.৪৫ টাকা এবং পায়রার ১২ টাকা। সরকার রামপাল ও পায়রার ট্যারিফ কমাতে মাতারবাড়ির মূল্যকে একটি বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচনা করেছিল। অর্থাৎ রামপালের বিদ্যুৎ মাতারবাড়ির তুলনায় ইউনিটপ্রতি প্রায় ৫.১২ টাকা বেশি। এক কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনলে এই পার্থক্য দাঁড়ায় প্রায় ৫.১২ কোটি টাকা। বছরে কয়েক বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে সামান্য ইউনিটমূল্যের পার্থক্যও রাষ্ট্রীয় অর্থে বিপুল হয়ে ওঠে।

ক্যাপাসিটি চার্জ : বিদ্যুৎ না নিলেও টাকা

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যয়ের একটি হলো ক্যাপাসিটি চার্জ। কোনো কেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদন না করলেও চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সক্ষমতা প্রস্তুত রাখার জন্য ইচউই-কে অর্থ দিতে হয়।

রামপালকে ঘিরে প্রকাশিত আর্থিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কেন্দ্রটির আয়ের একটি বড় অংশই এসেছে ক্যাপাসিটি চার্জ থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণে রামপালের মোট আয় ও উৎপাদন ব্যয়ের কাঠামোয় ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বড় ভূমিকা উঠে এসেছে। এখানে বিপদের জায়গাটি হলো- বিদ্যুৎ উৎপাদন কমলেও ক্যাপাসিটি-সংক্রান্ত দায় একই অনুপাতে কমে না।

অর্থাৎ আজ রামপালের একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় যদি উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নামে, গ্রিডে বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে; কিন্তু কেন্দ্র নির্মাণের মূলধনী ব্যয়, ঋণের সুদ, সক্ষমতা ধরে রাখার ব্যয় এবং চুক্তিভিত্তিক অন্যান্য দায় পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায় না।

আদানির ক্ষেত্রে হিসাব আরো কঠিন

আদানির গোড্ডা কেন্দ্র বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে আলোচিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলোর একটি। এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের এই কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ ২৫ বছরের চুক্তিতে বিদ্যুৎ কিনছে। কেন্দ্রটির দু’টি ইউনিটের প্রতিটির সক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট। কিন্তু দামই এই চুক্তির সবচেয়ে বড় বিতর্ক।

রয়টার্সের হাতে থাকা ইচউই-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদানির বিদ্যুতের দাম ছিল প্রতি ইউনিট ১৪.৮৭ টাকা, যেখানে অন্যান্য ভারতীয় উৎস থেকে বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল ৯.৫৭ টাকা। অর্থাৎ আদানির বিদ্যুৎ গড়ে প্রায় ৫৫ শতাংশ বেশি দামে পড়েছে।

ক্যাপাসিটি চার্জেও আদানি ব্যতিক্রম

আদানির গোড্ডা চুক্তিতে ক্যাপাসিটি চার্জও রয়েছে। প্রকাশিত চুক্তি-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, আদানির ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল প্রায় ৩.২৬ টাকা প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা, যা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিগুলোর মধ্যে উচ্চতর বলে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত। এই চার্জের অর্থনৈতিক তাৎপর্য বোঝার জন্য একটি সহজ হিসাব যথেষ্ট। ১,৬০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় এক ঘণ্টা চালালে ১৬ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়। এ কারণে শুধু ‘প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম’ দিয়ে আদানি চুক্তির প্রকৃত অর্থনৈতিক বোঝা বিচার করা যথেষ্ট নয়। এনার্জি চার্জ + ক্যাপাসিটি চার্জ + জ্বালানি মূল্য সমন্বয় + ডলার বিনিময় ঝুঁকি + অন্যান্য চুক্তিভিত্তিক ব্যয়- সব মিলিয়েই প্রকৃত ব্যয়।

আজকের রামপাল-আদানি সঙ্কেত

আজ রামপালের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়া এবং একই সময়ে আদানির দ্বিতীয় ইউনিট চালু হওয়া সাময়িকভাবে জাতীয় গ্রিডকে স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান নয়।

কারণ একটি কেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি অন্য কেন্দ্রের অতিরিক্ত উৎপাদন দিয়ে সাময়িকভাবে সামাল দেয়া যায়; কিন্তু উচ্চমূল্যের চুক্তি, অতিরিক্ত সক্ষমতা, ক্যাপাসিটি চার্জ, আমদানিকৃত কয়লার মূল্য এবং ডলার ব্যয়ের কাঠামোগত বোঝা এভাবে সামাল দেয়া যায় না।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই এখন বিদ্যুৎ আছে কি না-শুধু সেটি নয়।

প্রশ্ন হলো, কত দামে বিদ্যুৎটি পাওয়া যাচ্ছে, কত টাকা উৎপাদন না করেও দিতে হচ্ছে, কয়লা আনতে কত ডলার যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের কতটা ভর্তুকি হিসেবে জনগণের ঘাড়ে চাপছে।

রামপাল ও গোড্ডার আজকের ঘটনা সেই হিসাবটি নতুন করে সামনে এনেছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের পরবর্তী সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত তাই শুধু নতুন কেন্দ্র নির্মাণ নয়; বরং পুরনো চচঅ পুনর্মূল্যায়ন, ক্যাপাসিটি চার্জের যৌক্তিকীকরণ, জ্বালানি ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতামূলক দরে বিদ্যুৎ ক্রয়।

নইলে উৎপাদন বাড়লেও বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সঙ্কট কমবে না- বরং বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রতিটি অতিরিক্ত মেগাওয়াট রাষ্ট্রের জন্য নতুন আর্থিক দায়ে পরিণত হতে পারে।