সাক্ষীদের ভয় দেখিয়ে বিচার বাধাগ্রস্ত করা যাবে না : চিফ প্রসিকিউটর
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
কোনো সাক্ষীকে হুমকি বা ভয়ভীতি দেখিয়ে বিচারকাজে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম। গতকাল রোববার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার সাক্ষীদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে আসামিপক্ষ- এমন প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমার কাছে অভিযোগ রয়েছে। এমন সাক্ষীদের নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজননীকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোনো মামলার সাক্ষীকে কেউ হুমকি দিচ্ছে, এমন অভিযোগের প্রমাণ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে হুমকি-ধমকিতে বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত হবে না। কোনো ভয়ভীতি প্রদর্শন বা হুমকি দিয়ে এই ট্রাইব্যুনালের তদন্ত, বিচার বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।
সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে পরিবারের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্ত করছে পিবিআই। আজ একটি লিখিত আবেদন নিয়ে এসেছিলেন মেঘের মামা রোমান। আমাদের কাছে তাদের প্রত্যাশা যেন আমরাও তদন্ত করি। নয়তো কোনো তথ্য পেলে পিবিআইকে সহযোগিতা করা হয়। আবেদনটি আমরা খতিয়ে দেখব। বিষয়টি ওয়াইডস্প্রেড বা সিস্টেমেটিক অফেন্সের আওতায় না এলে তাদের জানিয়ে দেবো। তবে আবেদন করার এখতিয়ার সবারই রয়েছে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, এ মামলায় পিবিআইয়ের তদন্ত চলমান। সাগর-রুনির ঘটনাটি একটি ‘ইন্ডিভিজুয়াল মার্ডার কেস’ বলে আমাদের কাছে মনে হয়। সেটি ওয়াইডস্প্রেড বা সিস্টেমেটিক অফেন্সের মধ্যে আসবে কিনা, বিষয়গুলো আমরা একটু খতিয়ে দেখার চেষ্টা করব। যেহেতু যে কারো আবেদন করার এখতিয়ার রয়েছে, সেভাবেই তারা আবেদন করেছে। সেভাবেই আমরা গ্রহণ করেছি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত করলে হয়তো ফলপ্রসূ কিছু আসতে পারে বলে মনে করছে সাগর-রুনির পরিবার। এরই মধ্যে আমাদের একটি তদন্ত করতে গিয়ে দু’জন ব্যক্তির সূত্র পাওয়া গেছে, সেই প্রত্যাশা থেকে তারা আবেদনটি করেছেন। আমরা পরিষ্কার করে বলেছি যে, এ ঘটনার আগে-পরে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সাথে একজন সামরিক কর্মকর্তার এক ধরনের যোগাযোগ, কথোপকথন, ডিস্ক আনা-নেয়ার কিছু একটা ঘটেছে। ওই সামরিক কর্মকর্তার একজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির মাধ্যমে এগুলো করা হচ্ছিল। সেই জায়গা থেকে একটি সূত্র পাওয়া যায় বলে মনে হয়।
মোজাফফর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ
এ দিকে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় গ্রেফতার আসামি মেজর (অব:) মোজাফফর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। গ্রেফতার এই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যদিয়ে ৪৫ বছর পর আবারও পুনরুজ্জীবিত হলো জিয়াউর রহমান হত্যা মামলা।
এর আগে সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ার কথা বলে ২০১১ সালে চট্টগ্রামের একটি আদালত মামলাটির সমাপ্তি ঘোষণা করেছিল। তবে হত্যাকাণ্ডের ৪৫ বছর পর গত জুলাইয়ে মামলার আসামি মেজর (অব:) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের পেছনের কুশীলবদের খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
জানা যায়, মেজর মোজাফফর হোসেন দীর্ঘসময় ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন। ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন। অবশেষে ৪৫ বছর আত্মগোপনে থাকার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তার গ্রেফতারের মধ্যদিয়ে দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের একটি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অধ্যায়ে নতুন অগ্রগতি এসেছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। ঘটনার আগের দিন, অর্থাৎ ১৯৮১ সালের ২৯ মে দুই দিনের সফরে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল নিজের প্রতিষ্ঠা করা রাজনৈতিক দল-বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মধ্যকার বিরোধ নিরসন করা। চট্টগ্রামে পৌঁছে সফরের প্রথম দিনে নেতাকর্মীদের সাথে একের পর এক বৈঠক শেষে মধ্যরাতে ঘুমাতে যান জিয়াউর রহমান। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেনাবাহিনীর একটি দল তার ওপর গুলি চালায় এবং ঘটনাস্থলেই সাবেক এই রাষ্ট্রপতি নিহত হন। পরে ৩০ মে সকালে রেডিওতে প্রথমবারের মতো জিয়াউর রহমানকে হত্যার খবর প্রচারিত হয়।
এই হত্যাযজ্ঞে সরাসরি অংশ নেয়া সেনাকর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর মোজাফফর হোসেন ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিনের নাম উঠে আসে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ও মামলাসংক্রান্ত বিবরণ অনুযায়ী, মেজর মোজাফফর হোসেনই প্রথম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করেন এবং তাকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালান। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর তিনিই চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে টেলিফোন করে জানান, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হেজ বিন কিলড’। হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরে মঞ্জুর নিহত হন। এ ছাড়া ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন গ্রেফতার হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। তবে তখন মেজর মোজাফফর হোসেন ও মেজর এস এম খালেদ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।