বাব আল-মানদেব প্রণালী দখল বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ
ইরানের সাথে কূটনৈতিক সমঝোতার তাগিদ
Printed Edition
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
ইরান সমর্থিত হাউছিরা ঝটিকা অভিযান চালিয়ে সৌদি আরব সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে লোহিত সাগরকে (রেড সি) এডেন উপসাগরের মাধ্যমে আরব সাগরের সাথে যুক্তকারী বাব আল-মানদেব প্রণালী দখলে নেয়ায় বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তৈরী পোশাকসহ বাংলাদেশের রফতানি পণ্যবাহী জাহাজগুলো এ প্রণালী ব্যবহার করে সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় পৌঁছায়। ইতঃপূর্বে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরান কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও ইউরিয়া সার সরবরাহে বিঘœ সৃষ্টি হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব এখনো চলছে। বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়ামূল্যে এ সব পণ্য কিনতে হচ্ছে, যার সরবরাহও সঠিক সময়ে পাওয়া যাচ্ছে না।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হতো। বিশ্বের মোট তেল-গ্যাস সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এ পথ দিয়ে যেত। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ব্যবহার করে অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নেয়া শুরু করে। সেখান থেকে জাহাজে করে তেল রফতানি করা হতো। একপর্যায়ে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রফতানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল বাব আল-মানদেব দিয়ে যেত। কিন্তু হাউছিদের হামলার হুমকির কারণে আগস্টে বাব আল-মানদেব দিয়ে সৌদি তেল পরিবহন প্রতিদিন চার লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ওপর ইরাক থেকে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী ড্রোন হামলা চালালে তাতে আগুন ধরে যায় এবং জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বাব আল-মানদেব এড়িয়ে এশিয়ায় তেল নিতে সৌদি জাহাজগুলোকে এখন অনেকটা ঘুরপথে যেতে হচ্ছে। সুয়েজ খাল পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরে যেতে হচ্ছে তাদের। এরপর আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এশিয়ায় পেঁৗঁছাতে হচ্ছে, যা প্রকৃত অর্থেই দীর্ঘ দুরূহ পথ। এ পথে যাত্রার সময় এক মাস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। একই সাথে বাড়ছে জাহাজভাড়া। সৌদি আরব বিশ্বের ১০ ভাগ তেল সরবরাহ করে।
বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের সমন্বয়ে সৌদি আরব গত জুলাইয়ে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করে, যার আনুষ্ঠানিক নাম ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ (এমএমডিএ)। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ ও জ্বালানি সরবরাহ লাইন সুরক্ষিত রাখা এবং লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব প্রণালী ও এডেন উপসাগর দিয়ে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ কৌশলগত জোটটি গঠন করা হয়। ইয়েমেনের হাউছি গোষ্ঠীর দ্বারা নৌ-অবরোধ এবং সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর সুনির্দিষ্ট হামলার মতো ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক হুমকির বিষয়টি মাথায় রেখে জোটটি গঠন করা হয়েছিল। বর্তমানে বাব আল-মানদেব প্রণালী দখলে নেয়ার পর হাউছিরা ঘোষণা দিয়েছে, সৌদি আরব ছাড়া অন্যান্য দেশের জাহাজগুলো এ পথে চলাচল করতে পারবে। এ পর্যায়ে বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটের ভূমিকা কী হয়, তা দেখার বিষয়।
সৌদি আরব এ জোটের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান রাষ্ট্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। রিয়াদে জোটের স্থায়ী সদর দফতর, যৌথ কমান্ড, কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টার এবং কম্বাইন্ড মেরিটাইম অপারেশনস সেন্টার অবস্থিত। সৌদি ভাইস অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ বিন সালেম আল- শেহরিকে জোটের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
সৌদি আবর ইতঃপূর্বে পাকিস্তান ও তুরস্ককে সাথে নিয়ে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিও স্বাক্ষর করেছিল। এর আওতায় চুক্তিভুক্ত কোনো দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলোর ওপর আক্রমণ হয়েছে বলে ধরে নেয়া হবে। সৌদি আরবের ওপর ইয়েমেন থেকে সাম্প্রতিক আক্রমণের পর পাকিস্তানের ফিন্ড মার্শাল আসিম মনির ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে দেখা করে হাউছিদের সমর্থন দেয়া থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান। কিন্তু সৌদি আরবের সাথে যুদ্ধে ইরান জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের হাজার হাজার সেনা হাউছিদের সাথে যোগ দিয়ে লড়াই করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ মুহূর্তে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়িত হতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কেননা দেশটির সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন রয়েছে।
নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, ইসরাইলকে সাথে নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র এখন বেকায়দায় রয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিঘœ সৃষ্টি হওয়ায় ব্যাপকভাবে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। হরমুজ প্রণালী খুলতে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো সদস্যভুক্ত দেশগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানালেও তাতে সাড়া পায়নি। ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্ররা বলছে, এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র শুরু করেছে এবং তাকেই শেষ করতে হবে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ঝটিকা সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আটক করে তুলে নিয়ে আসার পর যুক্তরাষ্ট্র দেশটির তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছে। ইরানের সাথে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারবার ঘোষণা দিয়ে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ইরান নাকচ করে দেয়ায় তেলের বাজারে স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানি তেল, বিশেষ করে ডিজেলের দাম অনেকে বেড়ে গেছে, যার একটি নেতিবাচক প্রভাব দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী কার্যকরভাবে উন্মুক্ত করতে ব্যর্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি আরবের তেল বিশ্ববাজারে সরবরাহের ওপর জোর দিয়েছে। কিন্তু ইরান সমর্থিত হাউছিরা সম্প্রতি সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে বাব আল-মানদেব প্রণালী দখলে নিয়েছে, যার ফলে গোষ্ঠীটি লোহিত সাগর থেকে আবর সাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। তাই এ দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা হোঁচট খেল। যুক্তরাষ্ট্র এখন সত্যিকার অর্থেই বিপদে রয়েছে, যা দেশটিকে ইরানের সাথে একটা বোঝাপড়ায় আসতে বাধ্য করবে। তা না হলে জ্বালানি তেলের দাম আরো বাড়বে, য্ক্তুরাষ্ট্রের ওপর ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোসহ বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর চাপ বাড়বে এবং বাংলাদেশও ভুক্তভোগী হবে।
ইরানের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসে সামরিক অ্যাটাসে হিসাবে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক এ সামরিক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যবাহী জাহাজগুলো যাতে হরমুজ প্রণালী অথবা বাব আল-মানদেব প্রণালীতে চলাচলের ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য ইরানের কার্যকর সহায়তা চাওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ ইরানের পক্ষে জোরালোভাবে না দাঁড়ালেও বিপক্ষে কখনোই ছিল না। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যেও ইরানের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট সম্পর্কে মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন বলেন, বাব আল-মানদেব প্রণালী হাউছিদের দখলে গেলে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলাকে সামনে রেখে সৌদি আরব এ জোট গঠন করেছিল। কিন্তু জোটটি কিভাবে এবং কতটা কার্যকরভাবে কাজ করবে, তা এখনো দেখার অবকাশ রয়েছে। জোটটি কোন পরিস্থিতিতে কী পদক্ষেপ নেবে, তার নীতিমালা এখনো প্রণয়ন করা হয়নি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব হয় তো জোটভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে হাউছিদের সাথে সামরিক সঙ্ঘাতে জড়ানোর চেয়ে কূটনৈতিকভাবে চাপ দেয়ার চেষ্টা করবে। হাউছিরা এ প্রণালী সৌদি আরব ছাড়াও অন্যান্য দেশের জন্য বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশের রফতানি বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হবে।