নয়া দিগন্তের সাথে কানাডার সংস্কৃতিমন্ত্রী মার্ক মিলার
কানাডীয় মন্ত্রীর মুখে বাংলা ‘কেমন আছেন?’
Printed Edition
মিসিসাগা। টরন্টোর মূল নগরী থেকে একটু বাইরে, পরিপাটি ও গোছানো এক শহর। টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একেবারে কাছের এই শহর থেকেই শনিবার সকালে যাত্রা শুরু। ২০ নম্বর বাস ধরে কিপলিং, সেখান থেকে পাতালরেল। গন্তব্য মেট্রো টরন্টো কনভেনশন সেন্টার। দোতলায় পৌঁছাতেই চোখে পড়ল চলচ্চিত্র ও বিনোদন জগতের পরিচিত মুখগুলোর আনাগোনা। টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের নির্বাহী পরিচালক ক্যামেরন বেইলিসহ সেখানে সমবেত হয়েছেন কানাডার চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, সম্প্রচার, প্রযোজনা ও সংস্কৃতি অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা।
তবে উপস্থিত সবার মধ্যে একজনকে ঘিরে আগ্রহটা ছিল আলাদা। তিনি কানাডার পরিচয় ও সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী এবং দাফতরিক ভাষার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মার্ক মিলার। কানাডার সাংস্কৃতিক নীতি, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্প, সরকারি ভাষা এবং দেশটির বহুসাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন তার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যে।
এদিনের আয়োজনটিও ছিল বিশেষ। প্রথমবারের মতো টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ‘দ্য মার্কেট’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করছে। চলচ্চিত্র উৎসবকে শুধু চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জায়গা হিসেবে না রেখে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ও বিনোদন ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত করার যে উদ্যোগ, তারই আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো রিবন কাটার মধ্য দিয়ে।
কিন্তু অনুষ্ঠানটি শুধু ফিতা কাটার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশটির চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্প এখন যে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নই কোনো না কোনোভাবে উঠে এলো আলোচনায়। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পে দ্রুত অর্থ পৌঁছানো, সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা, করছাড়, অনলাইন স্ট্রিমিং, আন্তর্জাতিক বিনোদন প্রতিষ্ঠান, কানাডীয় কনটেন্ট, সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের সাংস্কৃতিক শিল্প, গেমিং এবং সর্বোপরি কানাডার সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব সবকিছু নিয়েই কথা বলেন মিলার।
কানাডার সাংস্কৃতিক খাতে একসাথে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের বরাদ্দ নিয়ে শিল্পমহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে এই শিল্পের সাথে যুক্ত একজন প্রশ্নকর্তা মন্ত্রীকে জানতে চান, এই অর্থকে তিনি স্বল্পমেয়াদি প্রণোদনা হিসেবে দেখছেন, নাকি এটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা।
মিলারের উত্তর ছিল বেশ সতর্ক। তিনি বলেন, বিষয়টি এখনো অনেকটাই পরেরটির দিকে। অর্থাৎ এটি শুধু তাৎক্ষণিক সঙ্কট মোকাবেলার অর্থ নয়; বরং শিল্পের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে সরকারের বৃহত্তর চিন্তার অংশ। তবে এর চূড়ান্ত রূপ এখনো আলোচনার মধ্যে রয়েছে। শিল্পের বিভিন্ন অংশীজনের সাথে আলোচনা শেষ হওয়ার পরই বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে।
মন্ত্রী মনে করেন, শিল্পে যত দ্রুত সম্ভব অর্থ পৌঁছানো দরকার। প্রয়োজনে ধাপে ধাপে অর্থ দেয়া হতে পারে। একই সাথে নীতিগত নির্দেশনাও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিমার্জিত হতে পারে। তার মতে, সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতে যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় কাজ তুলে দেয়া জরুরি, যাতে প্রক্রিয়াটি থেমে না থাকে।
তবে এখানেই মিলারের বক্তব্যে উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন; সরকারি অর্থের পরিমাণ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অর্থটি কোথায় যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত এর বোঝা কে বহন করছে। এই জায়গাতেই তিনি করদাতাদের কথা সামনে আনেন।
মিলারের বক্তব্যে স্পষ্ট, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে করছাড়ের ভূমিকা তিনি অস্বীকার করছেন না। বরং তিনি মনে করেন, এই শিল্পে স্থিতিশীলতার জন্য করছাড়ের ব্যবস্থাতেও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। কিন্তু একই সাথে প্রশ্ন উঠছে, এই সুবিধার প্রকৃত সুফল কে পাচ্ছে?
কানাডার করদাতাদের অর্থে দেয়া সুবিধার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, শিল্পের সাথে সরকারের সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত নয় যেখানে কোনো একটি সুবিধা একবার দেয়া হলে পরবর্তীতে সেটিকে স্বাভাবিক ও স্থায়ী অধিকার হিসেবে ধরে নেয়া হবে। বরং প্রতিটি সুবিধার বিনিময়ে কানাডীয় অর্থনীতি, শিল্পী, নির্মাতা এবং দর্শক কী পাচ্ছেন, সেটিও মূল্যায়ন করা দরকার।
আলোচনায় আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রসঙ্গও আসে। কানাডায় বিপুল বিনিয়োগের কথা বলা হলেও এসব প্রতিষ্ঠান কানাডার করছাড় ও অন্যান্য সুবিধা থেকে যে লাভবান হচ্ছে, সেটি অনেক সময় আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না, এমন বক্তব্যও উঠে আসে।
মিলার অবশ্য স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে নারাজ। বরং তার মতে, দর্শক যেহেতু দ্রুত অনলাইন ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে চলে যাচ্ছে, তাই কানাডার ভবিষ্যৎ সাংস্কৃতিক নীতি তৈরিতে এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারত্ব জরুরি।
কারণ বাস্তবতা বদলে গেছে। মানুষ আর আগের মতো শুধু প্রচলিত টেলিভিশন চ্যানেলের ওপর নির্ভর করছে না। দর্শকের বড় অংশ এখন নিজের পছন্দমতো সময়ে, নিজের পছন্দমতো প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট দেখছে। ফলে কানাডীয় গল্প দর্শকের কাছে পৌঁছাতে হলে নতুন বাস্তবতার সাথে তাল মিলিয়েই এগোতে হবে।
এই প্রসঙ্গে মিলার কানাডীয় প্রতিভার উদাহরণ হিসেবে বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা জেমস ক্যামেরনের কথা বলেন। তার বক্তব্যের সারকথা কানাডা এমন প্রতিভা তৈরি করেছে, যারা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাস বদলে দিয়েছেন। কিন্তু কানাডীয়দের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, নিজেদের সাফল্য নিয়ে তারা খুব বেশি গর্ব করে না। কিছুটা বিনয়ী, কখনো কখনো আত্মসঙ্কোচী।
মিলারের মতে, এই মানসিকতা বদলানো দরকার।
কারণ কানাডায় অসাধারণ প্রতিভা তৈরি হলেও সেই কাজ যদি বিশ্বের মানুষ না দেখে, তাহলে তার সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে কানাডীয় চলচ্চিত্র, টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য সৃজনশীল কাজের আরো বড় উপস্থিতি নিশ্চিত করাই এখন বড় সুযোগ।
আলোচনায় কানাডার সম্প্রচারমাধ্যমের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান সিবিসির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। মন্ত্রী জানান, বিষয়টি নিয়ে এখনো কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া বাকি। তার পূর্বসূরিরা যে কাজ শুরু করেছেন, সেগুলোকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তার। কাজটি এগোচ্ছে, তবে যত দ্রুত তিনি চেয়েছিলেন, ততটা দ্রুত এগোয়নি। তবে পরিবর্তিত গণমাধ্যম বাস্তবতার সাথে সিবিসি যেভাবে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে, সেটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন তিনি।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও কানাডার সাংস্কৃতিক শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন মিলার। দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দেশটি পরিকল্পিতভাবে বিনোদন ও সংস্কৃতিকে অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে। গান, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, গেমিং সবকিছুকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দিয়েছে তারা। কানাডা দক্ষিণ কোরিয়ার হুবহু অনুকরণ করতে পারবে না, কিন্তু সেখান থেকে শেখার সুযোগ আছে; এমনটাই তার বক্তব্য।
চীনের কথাও আসে আলোচনায়। মিলার জানান, চীন তাদের বিনোদন ও গণমাধ্যম শিল্পকে ভবিষ্যতের বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে গেমিং খাতকে তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। জাপানও সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল শিল্পকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
এই প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় কানাডাকে আরো দ্রুত ও সুনির্দিষ্টভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মনে করেন মিলার। যৌথ প্রযোজনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বিদেশী বাজারে কানাডীয় কনটেন্টের বিস্তার সব ক্ষেত্রেই নতুন সুযোগ তৈরি করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের টানাপড়েনের প্রসঙ্গও ওঠে। মিলার বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার পক্ষে নন। তার মতে, মধ্যমেয়াদে কিছুটা অস্থিরতা আসতে পারে। ফলে সংস্কারের প্রয়োজন থাকলেও এমনভাবে সংস্কার করতে হবে যাতে কানাডার সাংস্কৃতিক শিল্প ও করদাতা উভয়ই সুরক্ষিত থাকে।
এই দীর্ঘ ও নীতিনির্ভর আলোচনার মধ্যে হঠাৎ করেই বদলে গেল দৃশ্যপট। মিলার তার বক্তব্য শেষ করে আমি যে পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেখানেই এসে বসলেন। নিজের পরিচয় দিলাম। জানালাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। ঢাকা থেকে এসে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কাভার করছি। কথা বলার জন্য কিছুটা সময় চাইলাম। বাংলাদেশ থেকে এসেছি জানার পর তিনি হঠাৎ বাংলায় বললেন, ‘কেমন আছেন?’ একজন কানাডীয় মন্ত্রীর মুখে বাংলা শুনে স্বাভাবিকভাবেই বিস্মিত হলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি বাংলা বোঝেন?’ মিলার তখন ডান হাতের তিনটি আঙুল তুলে বললেন, ‘শুধু তিনটি বাক্য।’ এরপর নিজেই বললেন, ‘শুভ সন্ধ্যা’, ‘কেমন আছেন’ এবং ‘ধন্যবাদ’।
কানাডার একজন ফেডারেল মন্ত্রীর মুখে বাংলা ভাষার এই তিনটি বাক্য নিঃসন্দেহে আমার জন্য সেদিনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। আমি তাকে পরের প্রশ্নটি করলাম, আপনি কি কখনো বাংলাদেশে গিয়েছেন? উত্তর, ‘না।’ বাংলাদেশে এখনো আসা হয়নি তার। তবে অন্টারিওতে অনেক বাঙালির সাথে তার পরিচয় রয়েছে। বাঙালিদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার মন্তব্য, ‘তারা ভালো মানুষ।’
কথাটি হয়তো কোনো সরকারি নীতির ঘোষণা নয়। কিন্তু টরন্টোর মতো একটি বহুসাংস্কৃতিক নগরে বসে একজন কানাডীয় মন্ত্রীর মুখে এই স্বতঃস্ফূর্ত মন্তব্যের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। কারণ কানাডার সাংস্কৃতিক পরিচয় এখন আর কেবল ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, শিল্প ও জীবনযাপন দেশটির সামগ্রিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। টরন্টো ও বৃহত্তর টরন্টো অঞ্চলের বাঙালি সম্প্রদায়ও সেই বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আর এ কারণেই মিলারের মুখে তিনটি বাংলা বাক্য ‘শুভ সন্ধ্যা’, ‘কেমন আছেন’, ‘ধন্যবাদ’ শুধু সৌজন্য বিনিময়ের ঘটনা হয়ে থাকে না। এর মধ্যে কানাডার বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতার একটি মানবিক প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।
তবে মিলারের নীতিগত অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে তার বক্তব্যে।
১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ, বয়স যাচাই এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় এখন কানাডার নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায়। এ ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান বেশ কঠোর। শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নকে কোনো বাণিজ্যিক বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক দরকষাকষির বিষয় হিসেবে দেখতে চান না তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য চাপের প্রসঙ্গেও মিলারের অবস্থান স্পষ্ট শিশুদের নিরাপত্তার চেয়ে বাণিজ্যিক চাপকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার প্রশ্নই আসে না।
তবে একই সাথে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ব্যক্তিগত বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের আওতার বাইরে রাখার বিষয়টি এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে নাগরিকের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও এনক্রিপশনের অধিকার যেন ক্ষুণœ না হয়, সেটিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
মিলারের বক্তব্য অনুযায়ী, লক্ষ্য পুরো ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বরং যেসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ব্যবহারকারী-নির্ভর প্ল্যাটফর্মে ক্ষতিকর কনটেন্ট শিশুদের কাছে সহজে পৌঁছাতে পারে, সেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর দায়িত্ব আরোপ করা এবং নিয়ম ভাঙলে কার্যকর জরিমানার ব্যবস্থা করা।
এখানে তার বক্তব্যের একটি মৌলিক দিক হলো, আইন নিখুঁত না হলেও শিশুদের সুরক্ষার জন্য আইন করার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। বরং আইনকে কার্যকর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা থাকতে হবে।
চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি থেকে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা দু’টি বিষয় আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু মিলারের বক্তব্যে দু’টির মধ্যে একটি অভিন্ন নীতিগত জায়গা রয়েছে। সেটি হলো, দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতার মধ্যে কানাডার নিজস্ব স্বার্থ, সংস্কৃতি এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষা করা।
একদিকে আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের সাথে অংশীদারত্ব করতে হবে, অন্যদিকে কানাডীয় গল্পের নিজস্ব জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে যেতে হবে, কিন্তু নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয় হারানো যাবে না। শিল্পকে সরকারি সহায়তা দিতে হবে, আবার করদাতার অর্থের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু শিশুদের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নেও আপস করা যাবে না। এই ভারসাম্যই এখন কানাডার সাংস্কৃতিক নীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের নতুন বাজার সেই পরীক্ষারই একটি দৃশ্যমান অংশ। কারণ চলচ্চিত্র এখন শুধু বিনোদন নয়; এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জাতীয় পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতিরও অংশ।
সেদিনের অনুষ্ঠানে তাই ৬০০ মিলিয়ন ডলারের সাংস্কৃতিক বিনিয়োগ থেকে শুরু করে করছাড়, সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, সিবিসির ভবিষ্যৎ, দক্ষিণ কোরিয়ার সাংস্কৃতিক সাফল্য, চীনের গেমিং উচ্চাকাক্সক্ষা এবং শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা- সবগুলো বিষয় একই বৃহত্তর প্রশ্নের সাথে যুক্ত হয়ে গেল।
কানাডা আগামী দিনের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কোথায় দাঁড়াবে?
মার্ক মিলারের উত্তর এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত নয়। কারণ নীতি প্রণয়ন চলছে, শিল্পের সাথে আলোচনা চলছে, নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত বাকি আছে। কিন্তু তার কথায় একটি বিষয় পরিষ্কার, কানাডা নিজের সাংস্কৃতিক শক্তিকে আর কেবল সরকারি অনুদাননির্ভর একটি খাত হিসেবে দেখতে চায় না। বরং আন্তর্জাতিক বাজারে কানাডীয় প্রতিভাকে আরো শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে চায়।
আর সেই বড় নীতিগত আলোচনার মধ্যেই একজন বাংলাদেশী সাংবাদিকের দিকে ফিরে কানাডার মন্ত্রী যখন বলেন, ‘কেমন আছেন?’ তখন সেটি নিছক তিনটি বাংলা শব্দের উচ্চারণ থাকে না।
হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশের মানুষের ভাষা কানাডার মাটিতে জায়গা করে নিয়েছে এই ছোট্ট মুহূর্তটি তারই প্রমাণ। মার্ক মিলার বাংলাদেশে কখনো যাননি। বাংলা তার মাতৃভাষা নয়। তার বাংলা জ্ঞানও মাত্র তিনটি বাক্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু কখনো কখনো তিনটি বাক্যই একটি দেশের বহুসাংস্কৃতিক চরিত্র বোঝানোর জন্য যথেষ্ট। ‘শুভ সন্ধ্যা।’ ‘কেমন আছেন।’ ‘ধন্যবাদ।’
টরন্টোর চলচ্চিত্র উৎসবের ব্যস্ততার মধ্যে কানাডার সাংস্কৃতিক নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন বড় বড় আলোচনা চলছে, তখন একজন বাংলাদেশী সাংবাদিকের সাথে কয়েক মুহূর্তের এই বাংলা কথোপকথনই হয়ে রইল অন্যরকম এক এক্সক্লুসিভ স্মৃতি।