‘প্যাক্স সিলিকা’ ও বাংলাদেশের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ

ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

Printed Edition

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর প্ল্যাটফর্ম ‘প্যাক্স সিলিকা’-তে যোগ দিতে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানোর একই দিনে চীন-সমর্থিত ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’-এ পর্যবেক্ষক হিসেবে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বের দুই পরাশক্তির প্রযুক্তিগত লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশের যোগদান যেমন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করতে পারে, তেমনি এটি অপরিপক্ব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

‘প্যাক্স সিলিকা’ ও চীনের বিকল্প উদ্যোগ

‘প্যাক্স সিলিকা’র মূল উদ্দেশ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, বিরল খনিজ এবং নিরাপদ সাপ্লাই চেইন তৈরি করা, যাতে প্রযুক্তি খাতে চীনের ওপর একক নির্ভরতা কমানো যায়। এতে জাপান, ভারত, যুক্তরাজ্যসহ ২৫টি দেশ যুক্ত হয়েছে। অন্য দিকে চীন নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে এবং বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির নমনীয় প্রবাহ নিশ্চিত করতে ‘ডঅওঈঙ’ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ফলে বিশ্বপ্রযুক্তি ব্যবস্থা বর্তমানে দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বী ব্লকে বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা

পোশাকশিল্পের বাইরে প্রযুক্তি খাতে রফতানি বহুমুখীকরণের জন্য ‘প্যাক্স সিলিকা’ বাংলাদেশের জন্য বড় একটি সুযোগ। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭০০ জন চিপ ডিজাইনার এবং প্রতি বছর ২০ হাজার কম্পিউটার ও ইলেকট্রিক্যাল প্রকৌশলী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করছেন। চিপ ডিজাইন, টেস্ট এবং প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রাথমিক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সুযোগ বাস্তবায়নে একাধিক বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অবকাঠামোগত ঘাটতি যেমন, সেমিকন্ডাক্টর ও ডাটা সেন্টারের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পর্যাপ্ত পানির প্রয়োজন, যেখানে বাংলাদেশে এখনো জ্বালানি সঙ্কট বিদ্যমান। সামান্য অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে চিপ খাত থেকে এক বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য থাকলেও বর্তমানে বাংলাদেশের আয় মাত্র আট মিলিয়ন ডলার। প্রস্তুতির অভাব রয়েছে, ফিলিপাইনের ‘নিউ ক্লার্ক সিটি’ মেগা প্রজেক্ট দেখিয়েছে যে, স্থানীয় পরিবেশ, পানি, বিদ্যুৎ ও আইনি কাঠামো প্রস্তুত না করে বড় প্রকল্পের ঘোষণা দিলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

প্যাক্স সিলিকা ও চীনের সাথে ভারসাম্যের ঝুঁকি

কম মূল্যের সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকলে বাংলাদেশ ‘প্যাক্স সিলিকা’-তে প্রযুক্তির মূল পার্টনার হওয়ার বদলে সস্তা শ্রম ও জমির প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে। নকশা ও মেধার মালিকানা থাকবে পশ্চিমা কোম্পানির হাতে, যা তৈরী পোশাক খাতের মতোই নতুন একটি ‘সাব-কন্ট্রাক্টিং’ অর্থনৈতিক ফাঁদ তৈরি করবে।

কৌশলগত স্বায়ত্ত শাসন হারানোর ভয়

চীন থেকে বাংলাদেশ বার্ষিক আমদানির প্রায় ৩০.৬% (২০.৬১ বিলিয়ন ডলার) অর্জন করে এবং দেশের বিদ্যুৎ, পরিবহন ও টেলিযোগাযোগ খাতে চীনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। মার্কিন ব্লকে পূর্ণাঙ্গ যোগ দিলে বা চীনকে একপাশে ঠেলে দিলে এই বাণিজ্যিক সুবিধা ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক ঝুঁকিতে পড়বে। আবার একইভাবে পুরোপুরি চীনা জোটে প্রবেশ করলেও পশ্চিমা পুঁজিবাজার ও উন্নত প্রযুক্তির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

কারখানা ও ডেটা সেন্টারের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি, মেধাস্বত্ব (ওচ) আইন সংস্কার এবং গবেষণা ও উন্নয়ন (জ্উ) বাড়াতে হবে। এ ছাড়া শর্তসাপেক্ষ কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় প্রকৌশলীদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও অভ্যন্তরীণ আইপি সুরক্ষার স্পষ্ট শর্ত ছাড়া কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সাথে কৌশলগত স্বায়ত্ত শাসন বজায় রেখে কোনো একক ব্লকের সামরিক বা প্রযুক্তিগত শর্তে সরাসরি না গিয়ে দুই পক্ষের সাথেই নমনীয় ও উন্নয়নমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশকে কোনো এক পক্ষের সস্তা শ্রমের কেন্দ্র না হয়ে নিজের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভৌগোলিক অবস্থান ও তরুণ মানবসম্পদের সুবিধা কাজে লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো শক্তিশালী করার মাধ্যমেই বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতির সুফল অর্জন করতে পারবে।

প্যাক্স সিলিকা শুধু চিপস নিয়েই নয়; এর উচ্চাকাক্সক্ষা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পূর্ণ স্ট্যাককে অন্তর্ভুক্ত করে : খনিজ, পরিশোধন, বিদ্যুৎ, ডেটা পরিকাঠামো, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও উৎপাদন, লজিস্টিকস, উন্নত উৎপাদন, মডেল এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। স্টেট ডিপার্টমেন্ট এর লক্ষ্যকে জবরদস্তিমূলক নির্ভরশীলতা হ্রাস করা এবং বিশ্বস্ত সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করা হিসেবে বর্ণনা করে। এর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থও সমানভাবে স্পষ্ট। এটি চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে কৌশলগত প্রযুক্তি নেটওয়ার্কগুলোকে পুনর্গঠন করতে চায়। এই উদ্যোগটি ইতোমধ্যে কূটনৈতিক ভাষার গণ্ডি পেরিয়ে গেছে। ওয়াশিংটন খনিজ প্রক্রিয়াকরণ, পরিকাঠামো এবং উৎপাদনের জন্য ২৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি প্যাক্স সিলিকা তহবিল গঠন করেছে। উন্নত ইলেকট্রনিক্স ও ডেটা অবকাঠামোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি, বিশেষায়িত রাসায়নিক উপাদান, কঠোর মেধাস্বত্ব আইন, সাইবার নিরাপত্তা, দ্রুত কাস্টমস ছাড়পত্র এবং নির্ভরযোগ্য পরিবেশগত বিধিমালার প্রয়োজন।

দ্বিতীয় আরেকটি ঝুঁঁকিও রয়েছে। বাংলাদেশ হয়তো ‘প্যাক্স সিলিকা’য় প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে নয়; বরং সস্তা শ্রম ও জমি সরবরাহের ক্ষেত্র হিসেবে যুক্ত হতে পারে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো হয়তো পণ্য সংযোজন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা সহায়তা সেবার মতো কাজগুলো এ দেশে স্থানান্তর করবে; কিন্তু নকশা প্রণয়নের কর্তৃত্ব, পেটেন্ট, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং মুনাফা নিজেদের দেশের হাতেই রেখে দেবে। বৈশ্বিক মূল্য-শৃঙ্খলবিষয়ক বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুফল বা ‘স্পিলওভার’ মূলত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক, দক্ষতা এবং সুপরিকল্পিত নীতির ওপর নির্ভর করে। কেবল বিদেশী বিনিয়োগই শিল্পের মানোন্নয়ন বা আধুনিকায়নের নিশ্চয়তা দেয় না।

এ ছাড়া জোট-সংক্রান্ত তত্ত্ব সতর্ক করে যে, ‘প্যাক্স সিলিকা’য় যুক্ত হয়ে সীমিত কিছু সুবিধার বিনিময়ে বাংলাদেশ তার স্বায়ত্ত শাসন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ‘অসম জোট মডেল’ অনুযায়ী, অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে প্রায়ই নীতিগত স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হয়; বাংলাদেশ বর্তমানে ভৌগোলিক অবস্থান ও শ্রমশক্তি সরবরাহ করতে পারলেও দুর্লভ প্রযুক্তির ভাণ্ডার সীমিত, যা দরকষাকষির ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। দীর্ঘস্থায়ী ও পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারত্বের বিষয়ে আলোচনার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো প্রকৃত প্রস্তুতি থাকা অপরিহার্য।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত স্বায়ত্ত শাসন বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে। ‘প্যাক্স সিলিকা’ কোনো সামরিক চুক্তি নয়, তবে এর ‘বিশ্বস্ত প্রযুক্তি’র ধারণাটি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান, রফতানি নিয়ন্ত্রণ, ডেটা ব্যবস্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদ, টেলিযোগাযোগ এবং চীনা কোম্পানিগুলোর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত বা দাবি চাপিয়ে দিতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক প্রতিযোগিতায় অংশীদার দেশগুলো কোনো একটি পক্ষ বেছে নিক- এমন প্রত্যাশা ওয়াশিংটন ক্রমেই বাড়িয়ে তুলছে।

বাংলাদেশের জন্য ‘চীন-বিষয়ক প্রশ্নটি’ এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ২০.৬১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে, যা দেশের মোট পণ্য আমদানির প্রায় ৩০.৬ শতাংশ। বিদ্যুৎ, পরিবহন, টেলিযোগাযোগ এবং শিল্প খাতের সরবরাহ ব্যবস্থায় চীনা কোম্পানি ও অর্থায়নের গভীর উপস্থিতি রয়েছে। পারস্পরিক প্রতিশ্রুতিগুলো যখন শিথিল থাকে, তখন উভয় ব্যবস্থার সাথেই পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত থাকা হয়তো সম্ভব; কিন্তু মানদণ্ড ও নিরাপত্তা বিধিমালা যখন কঠোর হতে শুরু করবে, তখন সেই সুযোগ বা পরিসর সঙ্কুচিত হয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশ যদি চীনা শিবিরে যোগ দেয়, তাহলেও একই বিপদগুলো প্রযোজ্য হবে। ডঅওঈঙ ঢাকাকে চীনা সরবরাহকারী, মান এবং ডেটা-সংক্রান্ত নিয়মকানুন গ্রহণে চাপ দিতে পারে, যার ফলে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা প্রায় থাকবেই না। যেহেতু চীনা সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে দেশটির বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং টেলিযোগাযোগ খাতে আধিপত্য বিস্তার করে আছে, তাই আরো গভীর সম্পৃক্ততা বৃহত্তর নির্ভরশীলতার ঝুঁকি বাড়াবে। এটি পুঁজি ও বাজারে পশ্চিমাদের প্রবেশাধিকারও কমিয়ে দিতে পারে। আসল সমস্যা হলো বাংলাদেশের দুর্বল প্রযুক্তিগত ভিত্তি, যা দেশটি যে পক্ষই বেছে নিক না কেন, তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। বাংলাদেশের উচিত আলোচনায় অংশ নেয়া; কিন্তু তাড়াহুড়ো করে সম্মতি দেয়া নয়। ঢাকার উত্তর ‘না’ বা ‘হঁ্যাঁ’ কোনোটিই হওয়া উচিত নয়। উত্তর হওয়া উচিত ‘এখনো নয় এবং কোনো দরকষাকষি ছাড়া নয়’। প্যাক্স সিলিকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অর্থনীতিতে প্রবেশের একটি পথ হতে পারে; কিন্তু কেবল তখনই যদি বাংলাদেশ এমন সক্ষমতা নিয়ে প্রবেশ করে যা অন্যদের প্রয়োজন এবং এমন শর্ত আরোপ করে যা তার নাগরিকরা রক্ষা করতে পারে। অন্যথায়, দেশটি হয়তো কৌশলগত নমনীয়তার বিনিময়ে সেই উপ-চুক্তিভিত্তিক অর্থনীতিরই একটি উন্নত সংস্করণ গ্রহণ করবে, যা থেকে সে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।