ফুটবল কি জনপ্রিয় হবে কানাডায়

Printed Edition

বিশ্বকাপ ফুটবল হচ্ছে কানাডায়। অবশ্য তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকোর সাথে মিলে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো কানাডাও এমন বিশ্বকাপের আয়োজন দেশ যাদের দেশে ফুটবলটা সবচেয়ে জনপ্রিয় নয়। এই নিয়ে তিনবার বিশ্বকাপ খেলছে উত্তর আমেরিকান দেশটি। অথচ তাদের দেশে ফুটবলটা জনপ্রিয়তার কাতারে চার নম্বরে। প্রচণ্ড শীত এলাকার দেশ কানাডা। তাই আইস হকিই এখানে সবচেয়ে জনপ্রিয়। ২০১৭ সালে দেশটির ক্রীড়া ডিসিপ্লিনের দর্শক প্রিয়তার যে জরিপ চালানো হয়েছিল তখন দেখা গেছে মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ ফুটবলকে পছন্দ করে। সেখানে আইচ হকি দখলে নিয়েছিল ৪০ শতাংশ জনপ্রিয়তা। রাগবি আদলের কানাডিয়ান ফুটবল যা হেলমেট মাথায় পরে খেলতে হয় সেই খেলারও জনপ্রিয়তা ১০ শতাংশ। বাস্কেটবল পছন্দ করে ৮ শতাংশ মানুষ। তবে এখন চিত্র পাল্টাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরে অবস্থান করা দেশটিতে। ২০২২ সালে দেশটি যখন ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করলো তখন থেকে ফুটবলের পালে হওয়া লাগতে শুরু করে। আর এবার বিশ্বকাপে দেশটির সাফল্য, প্রথমবারের মতো নক আউটে যাওয়া এরপর সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১-০তে হারিয়ে সেরা ১৬তে উঠা, এতে খেলাটির জনপ্রিয়তা আরো বাড়াবে এমনটাই আশা ফুটবল বোদ্ধাদের।

১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত কানাডা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। সে বছরই তারা ফিফার সদস্য হয়। কনকাকাফের সদস্য পদ পাওয়া ১৯৬১ সালে। তাদের পাশের দেশ যুক্তরাষ্ট্র ১৯৩০ সাল থেকেই খেলে আসছে বিশ্বকাপ। অথচ কানাডা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করে ১৯৮৬ সালে। এরপর লম্বা বিরতি দিয়ে ফের ২০২২ সালে কোয়ালিফাই করা। তাদের এই কাতার বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করাটা ২০২০ সালে তাদের ফুটবলের সোনালী প্রজন্মের সন্ধান মেলায়। আলফাসনো ডেভিস তখন জার্মান লিগের ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের ফুটবলার। পেয়েছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগে শিরোপা জেতার স্বাদ। অপর ফুটবলার জোনাথন ডেভিড ফরাসি ক্লাব লিলের খেলোয়াড়। এদের উপস্থিতির সাথে অভিবাসী আরো কিছু খেলোয়াড়ের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। যা তাদের নিয়ে গেছে কাতারের মাঠে। সেখানে বেলজিয়ামের বিপক্ষে আলফানসো ডেভিস পেনাল্টি মিস না করলে হারের বদলে উল্টো হতে পারত রেজাল্ট।

২০২০ সালেই কানাডায় চালু হয় কানাডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ। যা দেশের পূর্ণ পেশাদার ফুটবল লিগ। সে বছরই কনকাকাফ অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে তাদের অভাবনীয় সাফল্য। প্রথম রাউন্ডের চার ম্যাচের প্রত্যেকটিতেই জয়। এরপর দ্বিতীয় রাউন্ডে হাইতির বিপক্ষে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়েতে জিতে ১৯৯৭ সালের পর বাছাইপর্বের তৃতীয় রাউন্ডে পৌঁছা। এরপর ৮ দলের তৃতীয় রাউন্ডে প্রথম ১১ ম্যাচে তারা অপরাজিত। যাদের তাদের শীর্ষস্থান পাইয়ে দেয়। এরপর ২০২২ এর ২৭ মার্চ জ্যামাইকাকে ৪-০তে হারিয়ে চূড়ান্ত ছাড়পত্র। ওই শ্রেষ্ঠত্বই দলটিকে নিয়ে গেছে কাতার বিশ্বকাপে। এই মিশনে তাদের ২০ বছর পর প্রথম জয় ছিল মেক্সিকোর বিপক্ষে। উল্লেখ্য কনকাকাফ (কনফেডারেশন অব নর্থ সেন্ট্রল আমেরিকান অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল) জোনে সবচেয়ে শক্তিশালী এই মেক্সিকো।

কানাডার ফুটবল জনপ্রিয়তা এখন তর তর করে বাড়ছে। তাই গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে যখন সেরা ৩২ এর ম্যাচ নিজ দেশে খেলা থেকে বঞ্চিত হয়, তখন হাজার হাজার দর্শক ছুটে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে। তাদের এই ধারা অব্যাহত রাখতে আরো সাফল্য পেতে হবে দলটিকে।

অভিবাসী ফুটবলাররাই এখন দেশটির ফুটবলের প্রাণ। আলফানসো ডেভিসের বাবা-মা লাইবেরিয়ান। তার জন্ম হয়েছিল ঘানার উদ্বাস্তু শিবিরে। সেখান থেকে পরিবারের সাথে ৫ বছর বয়সে কানাডা চলে আসেন। জোনাথন ডেভিডের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে। তার পিতা-মাতা হাইতিয়ান। এরপর তিনি কাডানার অটোয়ায় এসে সিদ্ধান্ত নেন কানাডার হয়েই খেলার। অপর ফুটবলার আলী আহমেদ ইথিওপিয়ান বংশোদ্ভূত। কাতারের সাথে ম্যাচে পা ভেঙে যাওয়া ইসমাইল কোনের জন্ম আইভোরি কোস্টে। আসিম মাদিবো সুদানে জন্ম নেয়া ফুটবলার।

এই ফুটবলারাই আজ কানাডার ফুটবলকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। দলটির এবারের বিশ্বকাপের খেলা দেখতে গ্যালারি ভরে যাচ্ছে। এ ছাড়া ফ্যান জোনগুলোতেও উপচে পড়া ভিড়। দলটির এই সাফল্য দর্শকদের মধ্যে এবং পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলবে। যা দেশটির ফুটবলকে আরো এগিয়ে নিতে বিশেষভাবে সহায়তা করবে। কানাডার দুই সমর্থক হ্যারি ও শেন জানান, আমাদের দেশে টরেন্টোতো ফুটবলের জনপ্রিয়তা বেশি। এখন আশা করব বিশ্বকাপের পর অন্য শহরগুলোতেও ফুটবলের প্রতি মানুষের আগ্রহটা বাড়বে- ছড়িয়ে পড়বে দর্শক প্রিয়তা।

বিশ্বকাপে খেলা ছাড়াও কানাডা দুইবারের কনকাকাফ গোল্ডকাপ বা কনকাকাফ চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা জয়ী। তা ১৯৮৫ ও ২০০০ সালে। এ ছাড়া কনকাকাফ নেশন্স লিগে ২০২৩ সালের রানার্সআপ।

পুরুষ ফুটবলের চেয়ে কানাডার নারী ফুটবল আরো বেশি এগিয়ে। কানাডার নারী ফুটবল দল টোকিও অলিম্পিক গেমসে স্বর্ণ জয়ী। দুইবার অলিম্পিক গেমসে ব্রোঞ্জ জয়ী দলটি কনকাকাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে দুইবারের চ্যাম্পিয়ন।