সাক্ষাৎকার : ড. শওকত আলী

বাজেটের লক্ষ্য হতে হবে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন

Printed Edition

(দ্বিতীয় পর্ব)

নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ড ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ফিন্যান্সের অধ্যাপক ড. শওকত আলী মনে করেন, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই ধরনের একটি সম্প্রসারণমুখী বাজেট প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে আমরা এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি, যেখানে জনগণের প্রত্যাশা ও রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে বড় ধরনের বিচ্ছিন্নতা ছিল। এখন আমরা এমন একটি সরকার পেয়েছি, যারা সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ বাজেট উপস্থাপন করেছে এবং একই সাথে একটি কার্যকর বিরোধী দলও রয়েছে। এটি গণতান্ত্রিক অর্থনীতি পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রবাসী এই অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ঋণখেলাপি সংস্কৃতি। যারা জনগণের টাকা আত্মসাৎ করেছে বা বিদেশে পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে ভবিষ্যতে যাতে নতুন ঋণখেলাপি তৈরি না হয়, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিনিয়োগের জন্য একটি স্থিতিশীল আর্থিক পরিবেশ দরকার। এর জন্য সুদের হার, মুদ্রানীতি এবং আর্থিক বাজারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে।’

গত শনিবার দৈনিক নয়া দিগন্তকে দেয়া দুই পর্বের এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব গতকাল রোববার প্রকাশিত হয়েছে। আজ দ্বিতীয় ও শেষ পর্বে বাজেট নিয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরা হলো। নিউ ইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ ড. শওকত আলী সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছেন। তার এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী।

নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-

প্রশ্ন : নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। সামগ্রিকভাবে আপনি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? আর এই বাজেটের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক কোনটি বলে মনে করেন?

ড. শওকত আলী : আমার মতে, এই বাজেটের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো- এটি একটি গণতান্ত্রিক সরকারের পূর্ণাঙ্গ বাজেট। দীর্ঘ সময় ধরে আমরা এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি, যেখানে জনগণের প্রত্যাশা ও রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে বড় ধরনের বিচ্ছিন্নতা ছিল। এখন আমরা এমন একটি সরকার পেয়েছি, যারা সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ বাজেট উপস্থাপন করেছে এবং একই সাথে একটি কার্যকর বিরোধী দলও রয়েছে। গণতান্ত্রিক অর্থনীতি পরিচালনার জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি।

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটকে অনেকে বড় বলছেন; কিন্তু আমাদের জনসংখ্যা, উন্নয়ন চাহিদা, অবকাঠামোগত প্রয়োজন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে আমি এটিকে অস্বাভাবিক বড় মনে করি না; বরং বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই ধরনের একটি সম্প্রসারণধর্মী বা এক্সপেনশনারি বাজেটই প্রয়োজন ছিল।

প্রশ্ন : আপনি বলছেন এটি একটি ‘এক্সপেনশনারি বাজেট’। জনগণের জন্য এর অর্থ কী?

ড. শওকত আলী : অর্থনীতির ভাষায় এক্সপেনশনারি বাজেট হলো এমন একটি বাজেট, যার মাধ্যমে সরকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সম্প্রসারণের চেষ্টা করে। অর্থাৎ সরকার ব্যয় বাড়ায়, বিনিয়োগ উৎসাহিত করে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বৃদ্ধি করে এবং জনগণের হাতে অর্থপ্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়।

বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকার যে সম্প্রসারণমূলক নীতি গ্রহণ করেছে, সেটি অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত।

প্রশ্ন : আপনি আগের সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনার কঠোর সমালোচনা করেছেন। কেন?

ড. শওকত আলী : কারণ বাস্তবতা সেটিই বলে। আগের সরকারের সময় বাজেটের একটি বড় অংশ জনগণের কল্যাণে ব্যয় হয়নি। অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ছিল অনেকাংশে রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার উপায়। দুর্নীতি, অর্থপাচার, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি এবং অকার্যকর বরাদ্দের কারণে সাধারণ মানুষ প্রকৃত সুবিধা পায়নি।

আমরা দেখেছি, প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে; কিন্তু তার যথাযথ ব্যবহার হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে বাজেটের অর্থ হয় অপচয় হয়েছে, নয়তো দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে; কিন্তু তাদের আয় সেই হারে বাড়েনি।

প্রশ্ন : বর্তমান বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে আপনি কতটা বাস্তবসম্মত মনে করেন?

ড. শওকত আলী : আমি মনে করি, এই বাজেটের ম্যাক্রোইকোনমিক টার্গেটগুলো তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত। এখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশ।

আগের সরকারের সময় আমরা প্রায়ই অবাস্তব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা দেখেছি-৭.৫ শতাংশ, ৮ শতাংশ বা তারও বেশি। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতির সাথে সেসব লক্ষ্যমাত্রার বড় ধরনের ফারাক ছিল। বর্তমান বাজেটে অন্তত বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে আমি একটি বিষয়ে সতর্ক করতে চাই। যখন মূল্যস্ফীতির হার কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি থাকে, তখন অর্থনীতিতে কিছুটা ইনফ্লেশনারি প্রেসার (মূল্যস্ফীতির চাপ) তৈরি হয়। এ বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।

প্রশ্ন : এই ইনফ্লেশনারি চাপ মোকাবেলার উপায় কী হতে পারে?

ড. শওকত আলী : প্রথমত, উৎপাদনশীল খাতগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাতে উৎপাদন বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় মুদ্রাসৃষ্টি বা ঢালাও টাকা ছাপানো বন্ধ রাখতে হবে। তৃতীয়ত, কর আদায় বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে অতিরিক্ত ঘাটতি অর্থায়নের প্রয়োজন না হয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, যদি উৎপাদন না বাড়ে কিন্তু বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়ে, তবে মূল্যস্ফীতি আরো বৃদ্ধি পাবে। তাই উৎপাদন ও অর্থ সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রশ্ন : বাজেটে কৃষক, নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

ড. শওকত আলী : আমি এটিকে এই বাজেটের অন্যতম শক্তিশালী দিক হিসেবে দেখছি। কৃষকদের জন্য ঋণ, নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, দরিদ্র পরিবারের জন্য সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ- এসব উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ অর্থনীতির একটি মৌলিক বিষয় হলো ‘অ্যাফোর্ডেবিলিটি’ বা ক্রয়ক্ষমতা। বাজারে পণ্য থাকাটাই যথেষ্ট নয়; মানুষের সেই পণ্য কেনার সক্ষমতাও থাকতে হবে। সরকার যদি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতে অর্থ পৌঁছে দিতে পারে, তবে তাদের ভোগ বৃদ্ধি পাবে, বাজারে চাহিদা তৈরি হবে এবং সামগ্রিক উৎপাদনও বাড়বে।

প্রশ্ন : আপনি ‘অ্যাফোর্ডেবিলিটি’কে এত গুরুত্ব দিচ্ছেন কেন?

ড. শওকত আলী : কারণ আধুনিক অর্থনীতিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা। একজন দরিদ্র মানুষের হাতে যখন অতিরিক্ত অর্থ যায়, তখন সে সেই অর্থ সঞ্চয় করে না; বরং খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কেনায় খরচ করে। ফলে বাজারে তাৎক্ষণিক চাহিদা সৃষ্টি হয়।

চাহিদা বাড়লে উৎপাদন বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, সরবরাহ ব্যবস্থা সক্রিয় হয় এবং অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক চক্র তৈরি হয়। অর্থনীতির ভাষায় আমরা একে ‘সার্কুলার ফ্লো অব ইনকাম’ বলি।

প্রশ্ন : বাজেটে কর বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?

ড. শওকত আলী : আমি মনে করি, একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের জন্য কর আদায় অপরিহার্য। এবার করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে, আবার একই সাথে কিছু ক্ষেত্রে করও বাড়ানো হয়েছে। এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ উদ্যোগ।

যদি সরকার সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় বাড়াতে চায়, তবে রাজস্ব আয়ও বাড়াতে হবে। অন্যথায় সরকারকে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হবে অথবা টাকা ছাপাতে হবে, যা অর্থনীতির জন্য আরো ক্ষতিকর।

প্রশ্ন : বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

ড. শওকত আলী : আমার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ঋণখেলাপি সংস্কৃতি। যারা জনগণের টাকা আত্মসাৎ করেছে বা বিদেশে পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে ভবিষ্যতে যাতে নতুন কোনো ঋণখেলাপি তৈরি না হতে পারে, সেই কাঠামোগত ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগের জন্য একটি স্থিতিশীল আর্থিক পরিবেশ প্রয়োজন। সুদের হার, মুদ্রানীতি এবং আর্থিক বাজারের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় থাকা আবশ্যক।

প্রশ্ন : বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

ড. শওকত আলী : সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ বাস্তবায়ন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। অতীতে আমরা দেখেছি, বাজেটের ৩৭ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়নি। এটি একটি ভয়াবহ বাস্তবতা।

যদি বাজেটের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার না হয়, তবে বড় বাজেটের কোনো কার্যকারিতা থাকে না। তাই আমি চাই, প্রতিটি প্রকল্প এবং প্রতিটি বরাদ্দের ক্ষেত্রে একটি কঠোর ও স্বাধীন মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হোক।

প্রশ্ন : জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য আপনার কী প্রস্তাব রয়েছে?

ড. শওকত আলী : আমি মনে করি, জনগণের অর্থ কোথায় কিভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা জনগণকে স্পষ্ট জানাতে হবে। প্রতিটি সংসদ সদস্যের এলাকায় কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে এবং তা কী কাজে ব্যয় হয়েছে, তা প্রকাশ্য স্থানে প্রদর্শন করা উচিত। আমরা অতীতে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে (যেমন ইউনিয়ন পরিষদে) এ ধরনের ব্যবস্থা দেখেছি। বর্তমান ডিজিটাল যুগে এটি আরো সহজ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবসাইট এবং স্থানীয় তথ্যফলকের মাধ্যমে জনগণকে সব তথ্য জানানো যেতে পারে। এতে দুর্নীতি কমবে এবং সরকারের ওপর জনগণের আস্থা বাড়বে।

প্রশ্ন : সবশেষে এই বাজেট সম্পর্কে আপনার সার্বিক মূল্যায়ন কী?

ড. শওকত আলী : আমার সার্বিক মূল্যায়ন হলো- এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, কল্যাণমুখী এবং সম্প্রসারণধর্মী বাজেট। অবশ্যই এর কিছু সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি রয়েছে; কিন্তু সঠিক বাস্তবায়ন, কঠোর জবাবদিহিতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই বাজেট দেশের অর্থনীতিকে একটি নতুন ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারবে।

আমার প্রত্যাশা, এই বাজেটের মূল দর্শন যেন হয়- ‘জনগণের অর্থ জনগণের কল্যাণে এবং উন্নয়নের সুফল সবার জন্য।’