আজ বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস
কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢাললেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি ম্যালেরিয়া
সারা বিশ্বের মতো আজ শুক্রবার বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস-২০২৫।’ দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য- ‘আমরাই করবো ম্যালেরিয়া নির্মূল: নব উদ্যমে, নব বিনিয়োগে ও নব চিন্তায়।’
Printed Edition
কাড়ি কাড়ি টাকা ঢেলেও দেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। অন্য দিকে বাংলাদেশে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার পেছনে সীমান্ত অঞ্চলের ভারত ও মিয়ানমারের অংশও কম দায়ী নয়। ভৌগোলিক কারণে ক্রস বর্ডার তথা সীমান্ত অতিক্রম করে অনেকে ভারত ও মিয়ানমারে চলাচল করছে। কখনো কখনো পার্বত্য অঞ্চল অশান্ত হওয়ায় বিধিনিষেধ থাকে, স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করতে পারে না। আবার পাহাড়িদের ভাষা বোঝা ও তাদের ধর্মীয় কুসংস্কারের জন্যও কাজ করা যায় না। পার্বত্য তিন জেলা দুর্গম হওয়ায় বর্ষাকালে ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার নিয়মিত রেকর্ড সংরক্ষণ করা কঠিন হয়। সঠিক সময়ে মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা যায় না। এসব কারণে অ্যানোফিলিস মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়া নির্মূল কঠিন হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ দিকে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া নির্মূলে গ্লোবাল ফান্ড ২ কোটি ডলার (২৫০ কোটি টাকা) বরাদ্দ রেখেছে। এর মধ্যে ব্র্যাক খরচ করবে ১ কোটি ১২ লাখ ডলার এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের সিডিসি খরচ করবে ৮৮ লাখ ডলার। বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ হলেও শেষ পর্যন্ত ফল কী দাঁড়ায় তা দেখার বিষয়।
ম্যালেরিয়াপ্রবণ তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতেই মোট রোগীর ৯৩ শতাংশ বাস করে। এ ছাড়া ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে অবহেলাও কম নয়। এমন বাস্তবতায় সারা বিশ্বের মতো আজ শুক্রবার বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস-২০২৫।’ দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য- ‘আমরাই করবো ম্যালেরিয়া নির্মূল: নব উদ্যমে, নব বিনিয়োগে ও নব চিন্তায়।’
জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো: গোলাম ছারোয়ার বলেন, অ্যানোফিলিস মশা আর্র্দ্রতা মিশ্রিত ছায়াযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে বেঁচে থাকে। অর্থাৎ ঝোপ ঝাড় ও পাহাড়ি এলাকায় এদের প্রাচুর্য লক্ষণীয়। এরা মানুষ ও গবাদিপশুর রক্ত বেশি পছন্দ করে। পূর্ণাঙ্গ মশা দল বেঁধে উড়ে বেড়ায়। এই মশা ম্যালেরিয়ার জন্য দায়ী প্লাজমোডিয়াম নামক প্রোটোকটিস্ট জীবাণুর বাহক হিসেবে কাজ করে।’
জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্তবর্তী দেশগুলোতে চলাচল বা পারাপারকারীর মধ্যে ইমপোর্টেড ম্যালেরিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। এ দিকে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে সিলেট, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণার পরিকল্পনা চলছে। ২০২৭ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকা পার্বত্য অঞ্চলের জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ম্যালেরিয়া রোগী প্রতি এক হাজারজনের মধ্যে ১ এর নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০৩০ সালে বাংলাদেশ বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রমাণ নিয়ে আবেদন করবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিএইচও) কাছে। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০৩৩ সালে ডব্লিউএইচও ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণার অপেক্ষায় বাংলাদেশ।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা: শ্যামল কুমার দাস বলেন, সীমান্তবর্তী দেশসমূহের সঙ্গে সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের প্রাদেশিক পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক চলমান রয়েছে। আন্তঃসীমান্ত চলাচল বা পারাপারকারীদের যথাসম্ভব চিহ্নিত করে তাদের ম্যালেরিয়া বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে। অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর (জুম চাষি, কাঠুরিয়া, কয়লা শ্রমিক, রোহিঙ্গা শরণার্থী ইত্যাদি) তথ্য সংগ্রহ করে কর্মসূচির আওতায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। সীমান্তে দুই পাশে সমন্বিত বাহক নিয়ন্ত্রণ এবং কীটতাত্ত্বিক নিরীক্ষণ কার্যক্রমকে জোরদার করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কর্মকর্তারা বলছেন, ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ম্যালেরিয়া রোগীর সংখ্যা ও ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু হ্রাসের ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। ২০০৮ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে ম্যালেরিয়াজনিত অসুস্থতা ৮৫ ভাগ এবং মৃত্যু ৯৬ ভাগ কমেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ মোট ম্যালেরিয়া রোগী ছিল ১৩ হাজার ৯৯ জন ও মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের। ২০২৩ সালে শনাক্ত হয়েছিল ১৬ হাজার ৫৬৭ জন এবং ওই বছরেও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।