নির্বাচনের আগে বড় চ্যালেঞ্জ গুজব প্রতিরোধ
সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নেপথ্যে উসকানিদাতা ভারতের কট্টরপন্থীরা
Printed Edition
এস এম মিন্টু ও আবদুল কাইয়ুম
- সীমান্তে উত্তাপ ছড়াচ্ছে পুশইন
- ভারতের ইন্ধনে নাশকতা হামলা খুনের ঘটনা ঘটতে পারে : ব্রি.জে. রোকন উদ্দিন (অব:)
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ, পুড়িয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। তবে কয়েকটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ও ভারতের কট্টরপন্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভারতের ইউটিউবাররা তুচ্ছ ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সহিংসতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ উঠেছে।
এ দিকে বাংলাদেশের কূটনীতিতে ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে আসামের মন্ত্রী অতুল বোরা বাংলাদেশে হিন্দুদের হত্যার নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত খারাপ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, এই ঘটনা ভারতের অখণ্ডতার জন্য হুমকি। তিনি কেন্দ্রকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, গাজাকে ইসরাইল যেভাবে শিক্ষা দিয়েছে, বাংলাদেশকেও সেভাবেই শিক্ষা দেয়া উচিত। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির দলের এই নেতার মন্তব্যের পর রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। অপর দিকে গত চার মাস ধরে প্রায় প্রতিদিন ভারত থেকে বাংলাদেশে লোকজনকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) অভিযোগ উঠেছে, যা নজিরবিহীন বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার সময় ও জন-আকাক্সক্ষার নিরিখে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থের ভিত্তিতে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বারবার বলে আসছে।
গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের এক বিবৃতিতে বলা হয়, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্ভয়ে, নির্বিঘেœ ভোট দেয়া নিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তীব্রতায় গভীর ক্ষোভ, উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রোকন উদ্দিন (অব:) গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূস ভারতের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ভারত যেন বাংলাদেশকে নিয়ে নাক না গলায়। বাংলাদেশে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করা হলেও আমরাও সেভেন সিস্টারে ফাটল ধরাব।
রোকন উদ্দিন বলেন, ভারতের সিকিমে সাম্প্রদায়য়িক সহিংসতায় অনেকের মৃত্যু হয়। তারা বাংলাদেশকে নিয়ে এমন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনাকে ফেরানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমাদের দেশের সাধারণ জনগণ তা বুঝতে পারায় তা সফল হয়নি। তারপর তারা আধিপত্যবাদ, পুলিশের মধ্যে বিদ্রোহের চেষ্টা, আনাসার ও জুডিশিয়াল এবং পার্বত্যাঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। এমনকি বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দিয়ে অগ্নিসংযোগ, গুলিসহ বিভিন্ন অপকর্ম করার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বিতর্ক করে তার সরকারকে উৎখাতের পর স্বৈরাচারী দোসর শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে সেই ভারতের দালালদের দিয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।
তিনি আরো বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তফসিল ঘোষণার আগে দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ছিল। কিন্তু ভারতের দোসররা তফসিল ঘোষণার পর দলগুলোর মধ্যে আস্তে আস্তে বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা করে। ছাত্র-তরুণরা রাজনৈতিক দলের সাথে ঐক্য তৈরি করে নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা উসকানি ও সহিংসতা সৃষ্টি করবে তাদের চিহ্নিত করে এখনই গ্রেফতার করতে হবে। কারণ ভারত বসেই আছে বাংলাদেশক বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে। ভারতে যারা সংখ্যালঘু বা মুসলমানদের একের পর এক নির্যাতন, হত্যাসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করছে, তারাতো একবারও স্বীকার করেনি তারা সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন করেছে। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর তুচ্ছ ঘটনা ঘটলেও তারা সাম্প্রদায়িকভাবে নিয়ে যায়। আসলে তারা ভারতের কাছ থেকে টাকা খেয়ে এসব মিথ্যা প্রচারণা ছড়িয়ে দেয়। তিনি আরো বলেন, সামনে বড় পরিকল্পনা করতে পারে ভারত। বিভিন্ন স্থাপনা নাশকতা, জনগণকে ভয়ভীতি ছড়ানো, খুন, গুম হামলা চালিয়ে অস্থিতিশিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে স্বৈরাচারের দোসররা। তাদের এখনই চিহ্নিত করা প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।
সম্প্রতি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশের তারকা খেলোয়াড় মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স দল থেকে বাদ দেয়ার নির্দেশ দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের জনগণকে ব্যথিত, মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ করেছে। মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেয়ায় বাংলাদেশে আইপিএলের সব ধরনের সম্প্রচার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের এক শ্রেণীর মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অনেকে ভারতে নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্ন তুলছেন।
ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি চালানো বন্দুকধারীরা ভারতে পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ ধরনের এক অভিযোগের ভিত্তিতে এনসিপির শীর্ষস্থানীয় নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ মন্তব্য করেছিলেন, ভারত যদি বাংলাদেশের শত্রুদের তাদের ভূখণ্ডে আশ্রয় দেয় তাহলে বাংলাদেশও ভারতবিরোধী শক্তিগুলোকে আশ্রয় দিয়ে ‘সেভেন সিস্টার্স’কে (ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল) ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাইবে। হাসনাত আবদুল্লাহর এই মন্তব্যকে ভারত খুবই ‘প্ররোচনামূলক’ বলে মনে করেছে।
সম্প্রতি ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এর প্রতিবাদে দিল্লি ও আগরতলায় ভিসা ও কনসুলার সেবা বন্ধ করে দিয়েছে ঢাকা। অন্য দিকে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসাকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী তিনটি সংগঠন, যার পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়। এ ছাড়া, চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজপরিবারের সদস্য প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য দেব বর্মা প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চল আসলে ত্রিপুরার ঐতিহাসিক ভূখণ্ড। এই অঞ্চল দখল করে ‘গ্রেটার ত্রিপুরা ল্যান্ড’ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের হুমকি দিয়ে ভারত সরকারের কাছে তিনি এই ভূখণ্ড দখলের জন্য ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে থেকেই এই অঞ্চলে ‘জুম্মল্যান্ড’ এবং ‘কুকি-চীনল্যান্ড’ নামে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা ও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। যার ফলে দেশের জনগণ ক্ষোভ প্রকাশ করে।
রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর ফঙ্ঘাত নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তে উদ্বাস্তু প্রবাহ, অস্ত্র পাচার এবং নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যা ভারতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে একটি জাতিগত-ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ভারত আসাম, উত্তর দিনাজপুর ও বিহারে তিনটি নতুন সেনা ঘাঁটি স্থাপন করেছে বলে জানিয়েছে গণমাধ্যম। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের হাসিমারা বিমান ঘাঁটিতে রাফায়েল যুদ্ধবিমান ও এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও মোতায়েন করা হয়েছে।
গত ১ জানুয়ারি রাতে ডামুড্যার কনেশ্বর ইউনিয়নের তিলই এলাকায় খোকন চন্দ্র দাসকে কুপিয়ে আহত করা হয়। পরে দুর্বৃত্তরা তার গায়ে পেট্রলজাতীয় দ্রব্য ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে রাতেই শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এই ঘটনায় বিভিন্ন মহল থেকে উসকানিমূলক কথা বললেও মূল কারণ ছিল নিজেদের ব্যক্তিগত বিরোধ।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের দাবি : পরিষদ দাবি করেছে গত ডিসেম্বর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কমপক্ষে ৫১টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হত্যা ১০টি, চুরি ও ডাকাতি ১০টি, বাড়িঘর-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান-মন্দির ও জমিজমা দখল, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ২৩টি। ধর্মীয় অবমাননা ও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’এর দালালির মিথ্যা অভিযোগে আটক ও নির্যাতন চারটি, ধর্ষণচেষ্টা একটি, দৈহিক নির্যাতন তিনটি।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেও সহিংসতার ধারা অব্যাহত রয়েছে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ মনে করে, আগামী নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীকে ভোটদানে জোরপূর্বক বিরত রাখার জন্য সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্ত মহল এসব ঘৃণ্য কার্যকলাপ অব্যাহতভাবে সারা দেশে চালিয়ে যাচ্ছে। অবিলম্বে তা রোধে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে ঐক্য পরিষদ।
ঐক্য পরিষদ যেসব অভিযোগ এনেছে সব সত্য নয় বলে জানা গেছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং কোনো কোনোটার সাথে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ যুক্ত রয়েছে। এসব ঘটনাকে ধর্মীয় রূপ দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।