বিপুর সহযোগীদের হাতেই পেট্রোবাংলা
এ নিয়ে একাধিক সংস্থা কাজ শুরু করেছে।
Printed Edition
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর নিয়োগকৃত এবং সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত বহাল তবিয়তেই রয়েছে। এ নিয়ে একাধিক সংস্থা কাজ শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া পেট্রোবাংলার পরিচালক (প্রশাসন), যুগ্মসচিব মো: আলতাফ হোসেন প্রায় চার বছর ধরে পেট্রোবাংলার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বরত রয়েছেন। ব্যাচ-২০ এর এই কর্মকর্তা মূলত আওয়ামী ঘরানার এবং একই ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী। তার ভাই কুড়িগ্রাম আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং নৌকা প্রতীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। আলতাফ আওয়ামী আমলে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগর প্রভাবশালী অতিরিক্ত সচিব ইলিয়াস আলীর (ঢাবি ছাত্রলীগের প্রাক্তন নেতা এবং ৫ আগস্টের পর ওএসডি) ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তিনি নিজ পদে থেকে প্রভাব খাঁটিয়ে পেট্রোবাংলা ও এর ১৩টি কোম্পানিতে আউটসোর্সসহ বিভিন্ন নিয়োগে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়োগবাণিজ্য চালিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, আলতাফ হোসেন সব কোম্পানিতে কৌশলে বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয় করে পদোন্নতি দেয়া বা কাউকে পদোন্নতি বঞ্চিত করার কাজটি করে থাকেন। এ ছাড়াও তিনি অনুগতদের বিদেশী বিভিন্ন প্রশিক্ষণ/সরকারি সফরের ব্যবস্থা করে থাকেন। তিনি ছিলেন পেট্রোবাংলার তৎকালীন চেয়ারম্যান (বর্তমানে বাধ্যতামূলক অবসরে) জননেন্দ্রনাথ সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তা।
জননেন্দ্রনাথ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বিপুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। যিনি বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে বিভিন্ন দুর্নীতির কারণে পদোন্নতি বঞ্চিত থাকলেও সরকার পতনের পর ইন্টেরিমের কাছে নিজেকে পদোন্নতি বঞ্চিতের অন্তর্ভুক্ত করে গ্রেড-১ পদোন্নতি অর্জন করেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা এখনো চলমান আছে।
তিনি ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের আগের দিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট পেট্রোবাংলায় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সভা সেমিনারে বিগত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে জড়িত ছাত্র-জনতা এবং আন্দোলনের স্টেকহোল্ডারদের বিদ্রুপ করে বক্তব্য প্রদান করেছিলেন।
বর্তমান পরিচালক (প্রশাসন) আলতাফ হোসেন সেসব সভা সেমিনারে সশরীরে উপস্থিত থেকে তাকে সমর্থন করেছিলেন এবং যেসব কর্মকর্তা ৪ আগস্টের সভায় উপস্থিত ছিলেন না তাদের তালিকা করে শাস্তি প্রদানের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। এই আলতাফ রঙ বদলে এখনো টিকে আছেন এবং শোনা যাচ্ছে অচিরেই তিনি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি পাবেন এবং এজন্যই জোর তদবির চালাচ্ছেন।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান, যুগ্মসচিব এবং ব্যাচ-২২ এর কর্মকর্তা। এই কর্মকর্তা আওয়ামী পরিবারের সন্তান এবং ছাত্রাবস্থায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলে জানা গেছে। ৫ আগস্টের পর পেট্রোবাংলার তৎকালীন চেয়ারম্যান জননেন্দ্র সরকারের (বর্তমানে বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত) এর সময় তিতাসের এমডি নিয়োগের অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন হয়েছিল। তিনি আন্দোলনকারীরা ‘পেট্রোবংলা’-কে বিএনপির পার্টি অফিস বানাতে চেয়েছিল বলে মন্তব্য করেছিলেন।
পরিচালক (পরিকল্পনা) আব্দুল মান্নান পাটওয়ারী ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন এবং বর্তমানেও বহাল তবিয়তেই আছেন। তিনি ২০১৮ সালে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ১.৫০ লাখ মেট্রিক টন কয়লা হারানোর ঘটনার সাথে জড়িত। তিনি একজন নন-প্রফেশনাল কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও পেট্রোবাংলার পরিচালক পদের মতো একটি কারিগরি পদে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত আছেন।
তিনি তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন), যুগ্মসচিব মোস্তফা কামালকে (বর্তমানে সচিব ও ৫ আগস্টের পর ওএসডি হয়েছেন) ব্যবহার করে প্রথমে পিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সমর্থক সিনিয়র সচিব ও ডামি নির্বাচনের কারিগর আনিসুর রহমানকে ধরে পেট্রোবাংলার পরিচালকের (পরিকল্পনা) পদটি বাগিয়ে নিয়েছেন।
তিনি বিপুর একজন আস্থাভাজন কর্মকর্তা ছিলেন। বড়পুকুরিয়ায় তৎকালীন চেক জালিয়াতির মাধ্যমে কয়লা চুরির বিরাট দুর্নীতির ঘটনা ধরা পড়লে তাকে প্রাথমিকভাবে শোকজ করা হয়। পরবর্তীতে তিনি তৎকালীন দুদকের এক কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে চার্জশিট থেকে নিজের নাম প্রত্যাহারে সমর্থ হন বলে জানা যায়। বর্তমানে মামলাটি চলমান আছে।
এ ছাড়া পেট্রোবাংলার তৎকালীন চেয়ারম্যান (বর্তমানে বাধ্যতামূলক অবসরে আছেন) জননেন্দ্রনাথ সরকারের আস্থাভাজন ও ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নিয়োগ-পদোন্নতিপ্রাপ্ত ও সুবিধাভোগী আওয়ামী লীগার অনেক কর্মকর্তা বিভিন্ন পদে এখনো অলঙ্কৃত করে আছেন।
ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (অনুসন্ধান ও সমীক্ষা) প্রকৌশলী নাজমা ইসহাক, বুয়েট ছাত্রলীগের কর্মী, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা এবং আইবিতে লুটপাটে সবুরের সহযোগী হিসেবে পরিচিত। যিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তিনটি কোম্পানির এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা কৌশল) বিশ্বজিৎ সাহা, আওয়ামী ঘরানার লোক, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ এবং রাশিয়ান স্টুডেন্ট আওয়ামী ফোরামের নেতা।