পুঁজিবাজারে সূচকের অবনতি দিয়েই নতুন সপ্তাহ শুরু

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতেই বাজারের নিয়ন্ত্রণ

Printed Edition
artho-1
পুঁজিবাজারে সূচকের অবনতি দিয়েই নতুন সপ্তাহ শুরু

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

বিনিয়োগকারীদের হতাশ করল পুঁজিবাজার। বছরের শেষ সপ্তাহটিতে যেখানে বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোটাই প্রায় নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল গতকাল তাতেও ব্যত্যয় ঘটেছে। খুবই ভালোভাবে দিন শুরু করা বাজারগুলো এক পর্যায়ে বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। এদিন দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সব ক’টি সূচকেরই কমবেশি অবনতি ঘটে। চট্টগ্রামের পুঁজিবাজারটির সূচকের আচরণ ছিল মিশ্র। সচরাচর বছরের শেষ দিনগুলোতে বাজারে খুব একটা বিক্রয়চাপ কার্যকর থাকে না। কারণ ওই সময় নতুন বছরকে সামনে রেখে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারে নিজেদের অবস্থান নিয়ে থাকেন। তবে এ সময় বাজারগুলোতে লেনদেনের কিছুটা উন্নতি ঘটেছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৪ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট হ্রাস পায়। চার হাজার ৮৮৩ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে নেমে আসে চার হাজার ৮৬৯ পয়েন্টে। তবে দিনের শুরুটা ছিল খুবই আশাব্যঞ্জক। লেনদেন শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই সূচকটি পৌঁছে যায় চার হাজার ৯৩০ পয়েন্টে। এ সময় সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় প্রায় ৪৮ পয়েন্ট। কিন্তু বেলা সোয়া ১১টার পরই বাজারে বিক্রয়চাপ তৈরি হয়। এতে নি¤œমুখী হয়ে যায় সূচকটি। দিনের বাকি সময় আর এ চাপ সামলে উঠতে পারেনি বাজারটি। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৪১ ও ৫ দশমিক ৭৭ পয়েন্ট।

তবে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই ৬ দশমিক ১৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে সিএসই-৩০ ৪৮ দশমিক ৬৫ পয়েন্ট অবনতির শিকার হলেও সিএসসিএক্স সূচকটি ৪ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়।

সূচকের নেতিবাচক অবস্থা সত্ত্বেও গতকাল দুই পুঁজিবাজারে লেনদেনের কিছুটা উন্নতি ঘটে। ডিএসই গতকাল ৩৮৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৪৭ কোটি টাকা বেশি। গত বুধবার সর্বশেষ কর্মদিবসে ডিএসইর লেনদেন ছিল ৩৩৮ কোটি টাকা। অন্য দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার ১৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে গতকাল। গত বুধবার সিএসইর লেনদেন ছিল পাঁচ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

বিনিয়োগকারীরা গতকালের বাজার আচরণ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। দিন শুরুর বাজার আচরণের উল্লেখ করে তারা বলেন, শুরুতে বাজার সূচকের যে উন্নতি ঘটে তাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু বাজার আচরণ দেখে মনে হয়েছে কোনো একটি পক্ষ বাজারে বিক্রয়চাপ তৈরি করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তারা বলেন, বাজারে তাদের সক্ষমতা যেমন বেশি তেমনি স্টেকও বেশি। তারা চাইলে বাজারকে যেকোনো দিকে নিয়ে যেতে পারে। তারা যখনই চাইবে তখন বাজার ভালো আচরণ করে। আবার যখন প্রয়োজন মনে করে তখন পরিকল্পিতভাবেই বিক্রয়চাপ সৃষ্টি করে থাকে। আর এটাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে তারা এটাও মেনে নিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়া পুঁজিবাজার কল্পনাই করা যায় না। এরাই বাজারকে টেকসই রাখতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু তাদের আচরণও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মতোই। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনার পরিবর্তে তারাও এখন ট্রেডিংনির্ভর হয়ে পড়েছে।

গতকালের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায় সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে ট্রেন্ড কাজ করছিল তাতে কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে গতকাল দীর্ঘদিন পর ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি কোম্পানি লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিতে দেখা যায়। পাশাপাশি এ তালিকায় বেশ কয়েকটি মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি জায়গা করে নেয়। বাজার বিশ্লেষকরা এটাকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন। তারা মনে করেন, এটা বজায় থাকলে ধীরে ধীরে মৌলভিত্তিতে দুর্বল কোম্পানিগুলোর দৌরাত্ম্য হ্রাস পাবে। বিনিয়োগকারীরা ভালো কোম্পানির দিকে ঝুঁকবেন।

প্রসঙ্গত সাম্প্রতিক সময়ে দেশের দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধিতে স্বল্প মূলধনের অপেক্ষাকৃত দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। কোন কারণ ছাড়াই এসব কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে। এমন অনেক কোম্পানি প্রায় প্রতিদিনই লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে যেগুলোর উৎপাদিত কোনো পণ্য বাজারে নেই। এমনকি কোনো কোনো কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে রন্ধ রয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র স্বল্প মূলধনের কোম্পানি হওয়ায় শেয়ারের স্বল্পতার কারণে খুব সহজেই এগুলোর মূল্যবৃদ্ধি ঘটানো সহজ। বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ টাকা বানানোর হাতিয়ার হিসেবে এসব কোম্পানিকে বেছে নিচ্ছেন যা দিনের পর দিন বাজারের স্বাভাবিক আচরণকে বাধাগ্রস্ত করে রাখছে।

গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ব্যাংকিং কোম্পানি সিটি ব্যাংক। ১৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার শেয়ার বেচাকেনা হয় গতকাল। ১২ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় ১১ লাখ পাঁচ হাজার শেয়ার লেনদেন করে সেবা খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথক্রমে রহিমা ফুড করপোরেশন, সায়হাম টেক্সটাইলস, উত্তরা ব্যাংক, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ওরিয়ন ইনফিউশন ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস।

দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ কোম্পানি ছিল জীবন বীমা কোম্পানি ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ৫ দশমিক ৪৭ শতংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে মিউচুয়াল ফান্ড সিএপিএম আইবিবিএল ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আরামিট লিমিটেড, সায়হাম টেক্সটাইলস, আইসিবি এএমসিএল সেকেন্ড মিউচুয়াল ফান্ড, সাউথইস্ট ব্যাংক, আইসিবি অগ্রণী মিউচুয়াল ফান্ড, তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলস, এআইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও আইসিবি এমপ্লয়িজ মিউচুয়াল ফান্ড।

দিনের দরপতনের শীর্ষে ছিল রাষ্টায়ত্ত তেল বাজারজাতকারী কোম্পানি যমুনা অয়েল। গতকাল ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটির। বিগত অর্থবছরে কোম্পানিটি ১৮০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। গতকাল ছিল কোম্পানিটির রেকর্ড-পরবর্তী মূল্য সমন্বয়ের দিন। এ কারণে এত দর হারায় কোম্পানিটি। ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে ছিল পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। দরপতনে শীর্ষ ১০ সিকিউরিটিজের অন্যগুলো ছিল ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ঝিলবাংলা সুগার মিলস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স, অ্যাপোলো ইস্পাত, তাক্বাফুল ইন্স্যুরেন্স, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্ট, পিএইচপি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও মেঘনা সিমেন্ট।