গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ন্যাটোর নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ : ডেনমার্ক

Printed Edition
Int-1
লার্স লোক্কে রাসমুসেন

আনাদোলু এজেন্সি

গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা শুধু একটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং উত্তর আটলান্টিক জোট ন্যাটোর ঐক্য, পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামো ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির সীমারেখা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।

বুধবার এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন সতর্ক করে বলেন, ডেনমার্কের সম্মতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করে, তবে তা ন্যাটোর অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এ মন্তব্য গ্রিনল্যান্ড ইস্যুকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো জটিল করে তুলেছে। ন্যাটো গঠিত হয়েছে একটি মৌলিক নীতির ওপর। তা হলো এক সদস্যের ওপর আক্রমণ মানেই সব সদস্যের ওপর আক্রমণ। সেই জোটের ভেতরেই যদি একটি শক্তিধর রাষ্ট্র তার মিত্র দেশের ভূখণ্ড দখলের চিন্তা করে, তাহলে ন্যাটোর নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থেই গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন এবং রাশিয়া ও চীন যেন সেখানে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সে জন্য দ্বীপটির মালিকানা ওয়াশিংটনের হাতে থাকা জরুরি।

আর্কটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রসঙ্গে রাসমুসেন স্পষ্টভাবে চীনের প্রভাব থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘প্রায় এক দশক ধরে আমরা সেখানে কোনো চীনা যুদ্ধজাহাজ দেখিনি। গ্রিনল্যান্ডে চীনের কোনো বিনিয়োগই নেই।’ গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণ স্বাধীনতা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে যাওয়ার পক্ষে নয়। এর অন্যতম কারণ হলো তারা ডেনিশ রাষ্ট্রের মাধ্যমে বিস্তৃত সামাজিক সুবিধা পেয়ে থাকে। রাসমুসেন বলেন, ‘সত্যি বলতে আমি মনে করি না যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কল্যাণ ব্যবস্থার খরচ বহন করবে।’

তবে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে দৃঢ় অবস্থান নেয়া সত্ত্বেও তিনি জানিয়েছেন, ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র একটি উচ্চপর্যায়ের ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করেছে। এই গ্রুপের কাজ হবে, কিভাবে ডেনমার্ক রাজ্যের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা যায় এবং একই সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত উচ্চাকাক্সক্ষাকে মোকাবেলা করা যায়। আর্কটিক অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ডেনমার্ক এরই মধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছে। অঞ্চলটি যেনো কোনো উত্তেজনাপূর্ণ এলাকায় পরিণত না হয় সেজন্য আর্কটিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গত বছর প্রায় আট বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডে যৌথ মহড়ায় ইউরোপীয় সেনারা

সিএনএন জানায়, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত পদক্ষেপের পর উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটে (ন্যাটো) উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপের কয়েকটি দেশ সেখানে সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।

ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে জোর করে দখলের হুমকি দেয়ার পর ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি প্রকাশ করতেই জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন ও নরওয়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডেনমার্কের সামরিক বাহিনীর সাথে যৌথ মহড়ায় অংশ নেবে ইউরোপীয় দেশগুলোর ছোট ছোট সেনাদল। কূটনৈতিক মহলের মতে, এ উদ্যোগ ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে।

বুধবার ডেনমার্কের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ন্যাটোর মিত্র দেশগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে তারা গ্রিনল্যান্ডে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি আরো বৃদ্ধি করছে। জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ১৩ সদস্যের একটি প্রাথমিক অনুসন্ধানী দল পাঠাচ্ছে এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ নিশ্চিত করেছেন, তাদের প্রথম সামরিক ইউনিট এরই মধ্যেই গ্রিনল্যান্ডের পথে রয়েছে।

কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত ট্রাম্পের

রয়টার্স জানায়, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে না থাকাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজে এ বিষয়ে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি আবারো কড়া বার্তা দেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে ‘গোল্ডেন ডোম’ তৈরি করছে, তার জন্য গ্রিনল্যান্ড অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে ন্যাটোর উচিত যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করা। কূটনৈতিক মহলের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে আরো স্পষ্ট করেছে। তিনি আরো যোগ করেন, ‘গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকলে ন্যাটো অনেক বেশি দুর্দান্ত ও কার্যকর হবে। এর চেয়ে কম কোনো কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়।’ ট্রাম্পের কয়েক সপ্তাহের হুমকির পর বুধবার দিনের শেষভাগে হোয়াইট হাউজে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাথে আলোচনায় বসবেন ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।