ইরানের পাল্টা অবরোধ!
পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরে বাণিজ্য বন্ধের আশঙ্কা হরমুজ প্রণালী অবরোধের মধ্যেই ‘যুদ্ধ শেষের পথে’: ট্রাম্প
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘাত এক জটিল ও অনিশ্চিত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌ অবরোধ দ্বিতীয় দিনে গড়ানোর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধ “শেষের খুব কাছাকাছি”। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা- সামরিক উত্তেজনা, পাল্টা হুঁশিয়ারি ও কূটনৈতিক তৎপরতা- সব মিলিয়ে সঙ্কট আরো জটিল হয়ে উঠছে।
ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তাদের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকলে শুধু হরমুজ প্রণালী নয় বরং পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর ও লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেও বাণিজ্য চলাচল বন্ধ করে দেয়া হবে। ইরানের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড এক বিবৃতিতে জানায়, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা “কঠোর ও চূড়ান্ত” পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। বিশ্লেষকদের মতে, এই হুঁশিয়ারি বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যব্যবস্থায় ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইতোমধ্যে ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোতে কঠোর অবরোধ আরোপ করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই অবরোধের ফলে ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্য কার্যত সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবহন হয়; ফলে এখানে উত্তেজনা মানেই বৈশ্বিক বাজারে তাৎক্ষণিক অস্থিরতা।
এই পরিস্থিতিতে আইএমএফ সতর্ক করেছে, সঙ্ঘাত আরো তীব্র হলে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন করে মন্দার মুখে পড়তে পারে। ইতোমধ্যেই বিনিয়োগকারীরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুঁজি সরিয়ে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল অঞ্চলে স্থানান্তর শুরু করেছেন। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘœ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে।
কূটনৈতিক অঙ্গনেও চলছে জোর তৎপরতা। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরানে পৌঁছে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। জানা গেছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা পৌঁছে দেয়া এবং সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা আলোচনার পথ সুগম করার লক্ষ্যে কাজ করছেন। ইসলামাবাদে শিগগিরই নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে বলে ইরানি সূত্র জানিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
তবে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণে সম্মত হয়নি যুক্তরাষ্ট্র। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উভয় পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। ফলে সামরিক উত্তেজনা কমার বদলে আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
পশ্চিমা জোটের মধ্যেও এ যুদ্ধ নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তার দেশ এই যুদ্ধে যুক্ত হবে না। ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ সত্ত্বেও তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বলেন, “এটি আমাদের যুদ্ধ নয়, এতে জড়ানো আমাদের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয়।” এতে পশ্চিমা ঐক্যে ফাটল ধরার ইঙ্গিত মিলছে।
এ দিকে ইরান অভিযোগ করেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সহযোগিতা করেছে। এ প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্দানের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে তেহরান। জাতিসঙ্ঘে পাঠানো এক চিঠিতে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি অভিযোগ করেন, এসব দেশ আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির দায় তাদের ওপরও বর্তায়।
সঙ্ঘাতের মানবিক দিকও ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। লেবাননে চলমান ইসরাইলি হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি ঘটছে। জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী মিশন ইউনিফিল জানিয়েছে, তাদের সরবরাহ বহরও বাধার মুখে পড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, এই সঙ্ঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে পুরো অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে।
এ দিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোগান সতর্ক করে বলেছেন, কোনো পক্ষ যেন যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়া নস্যাৎ না করে। একইসাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মধ্যে বিরল উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগও শুরু হয়েছে, যা উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিত দেয়।
অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরো অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফলে একদিকে যখন কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে, অন্য দিকে সামরিক প্রস্তুতিও সমানতালে বাড়ছে, যা সঙ্কটকে আরো অনিশ্চিত করে তুলছে।
সব মিলিয়ে, এক দিকে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের অবসানের ইঙ্গিত দিচ্ছে আবার হরমুজ প্রণালী অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে, অন্য দিকে ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি এবং আঞ্চলিক সঙ্ঘাতের বিস্তার পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর ও লোহিত সাগরের মতো কৌশলগত নৌপথে সম্ভাব্য অবরোধ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে সম্ভাব্য আলোচনার দিকে- যেখানে একটি টেকসই সমঝোতা শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নয় বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্যও নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় শান্তির পথ এখনো কণ্টকাকীর্ণ।