পায়ের পেশিই শরীরের দ্বিতীয় হৃৎপিণ্ড, সুস্থ থাকতে যতœ নিন
Printed Edition
হামিম উল কবির
মানবদেহে হৃৎপিণ্ডের কাজ সারা শরীরে রক্ত পৌঁছে দেয়া। কিন্তু শরীরের নিচের অংশ থেকে রক্তকে আবার হৃৎপিণ্ডের দিকে ফিরিয়ে আনতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা কাজ করে। এই কাজে বড় ভূমিকা রাখে পায়ের পেছনের কাফ মাসল বা পিণ্ডলির পেশি। এ কারণেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোচনায় এই পেশিকে অনেক সময় শরীরের ‘দ্বিতীয় হৃৎপিণ্ড’ বলা হয়।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা: ডি এম এম ফারুক ওসমানী বলেন, কাফ-এর গভীরে থাকা পায়ের পেছনের গুরুত্বপূর্ণ একটি পেশি হাঁটা ও দাঁড়ানোর সময় শরীরকে স্থির রাখতে এবং শিরার রক্ত হৃৎপিণ্ডের দিকে ফিরতে সাহায্য করে এবং এর সাথে থাকা গ্যাস্ট্রোকনেমিউস নামক পেশি হাঁটা বা পায়ের নড়াচড়ার সময় সঙ্কুচিত হয়ে শিরার রক্তকে ওপরের দিকে, অর্থাৎ হৃৎপিণ্ডের দিকে ঠেলে দিতে সাহায্য করে। এরপর শিরায় থাকা একমুখী ভাল্ব রক্তকে নিচের দিকে ফিরে যেতে বাধা দেয়। ফলে পায়ের পেশির এই ‘পাম্প’ মধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে রক্তকে হৃৎপিণ্ডের দিকে ফেরাতে সহায়তা করে। এ কারণে অনেকেই এটাকে দ্বিতীয় হৃৎপিণ্ড বলেন।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ ?
দীর্ঘ সময় বসে থাকা বা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার সময় কাফ মাসল পাম্প কম সক্রিয় থাকে। এতে পায়ের নিচের অংশে রক্ত জমে থাকা, পা ভারী বা ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। বিপরীতে নিয়মিত হাঁটা ও পায়ের পেশি সক্রিয় রাখা রক্ত সঞ্চালনকে সহায়তা করে।
ডা: ওসমানী বলেন, দীর্ঘ সময় যারা বসে থাকেন তাদের মাঝে মধ্যে উঠে হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার করা কিংবা সহজ কাফ রেইজ এক্সরসাইজ বা কাফ উঠানোর ব্যায়াম করতে হবে। সর্বোপরি নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড শুধু কাফ মাসল নয়, পুরো শরীরের পেশি ও কার্ডিওভাস্কোলার ফিটনেস ভালো রাখতে সাহায্য করে।
তাহলে কি কাফ মাসল দেখে আয়ু জানা যায় ?
কিছু গবেষণায় পায়ের পেশির দুর্বলতা বা কম মাসল ডেনসিটির সাথে মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। উদাহরণ হিসেবে, জার্নাল অব দ্য অ্যামেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজিতে প্রকাশিত একটি দীর্ঘ গবেষণায় পেরিফেরাল আরটেরিয়াল ডিজিজে আক্রান্ত ৪৩৪ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, যাদের কাফ মাসল ডেনসিটি কম ছিল, তাদের সার্বিক মৃত্যু (ওভারল মর্টালিটি) ও কার্ডিওভাস্কোলার মৃত্যু বেশি ছিল। একই গবেষণায় কাফ-জি প্ল্যান্টার ফ্লেক্সন স্ট্রেংথ কম থাকা এবং দুর্বল হ্যান্ড গ্রিপ স্ট্রেংথের সাথেও বেশি মৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, পায়ের পেশির আকার বা শক্তি দেখে একজন মানুষের কত বছর আয়ু বাকি তা নির্ভুলভাবে বলে দেয়া সম্ভব। বরং কাফ মাসল স্ট্রেংথ ও ডেনসিটি একজন মানুষের শারীরিক সমতা,মবিলিটি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডিকেটর হতে পারে। গবেষণার ফলাফলও মূলত নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক দেখিয়েছে; এটিকে সবার ক্ষেত্রে সরাসরি আয়ু গণনার সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।
কিভাবে পায়ের ‘দ্বিতীয় হৃৎপিণ্ড’ সচল রাখা যায় ?
এ জন্য জটিল ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই। নিয়মিত হাঁটা, দীর্ঘ সময় বসে না থাকা এবং সুযোগ পেলেই পা নড়াচড়া করা উপকারী। সহজ হিল রেইজ বা কাফ মাসল সক্রিয় করতে পারে। যারা ডেস্কে দীর্ঘ সময় কাজ করেন, তারা কিছুক্ষণ পরপর উঠে কয়েক মিনিট হাঁটতে পারেন। বসে থাকা অবস্থাতেও পায়ের গোড়ালি ওঠানো-নামানোর মতো সহজ নড়াচড়া করা যায়। তবে যাদের পায়ে অস্বাভাবিক ব্যথা, একপাশে হঠাৎ ফোলা, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে শুধু ব্যায়াম না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি।
মূল কথা : পায়ের কাফ মাসল সত্যিই হৃৎপিণ্ডের মতো রক্ত পাম্প করে না। এটি হৃদপিণ্ডের বিকল্পও নয়। ‘দ্বিতীয় হৃৎপিণ্ড’ নামটি মূলত এর ভেনাস ব্লাড রিটার্ন বা শিরার রক্তকে হৃৎপিণ্ডের দিকে ফেরাতে সহায়ক পাম্প হিসেবে কাজ করার কারণে দেয়া একটি উপমা। এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো সুস্থ থাকার জন্য শুধু হৃৎপিণ্ডের যতœ নিলেই হবে না; পায়ের পেশিকেও সক্রিয় রাখতে হবে। নিয়মিত হাঁটা ও নড়াচড়া একইসথে মবিলিটি, মাসল স্ট্রেংথ এবং রক্তসঞ্চালনের জন্য উপকারী।