রেমিট্যান্সের জোয়ারেও ডলার বাজারে অস্বস্তি
Printed Edition
দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহে বড় ধরনের গতি ফিরেছে। প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু এর পরও ডলারের বাজারে পুরোপুরি স্বস্তি ফিরছে না। আমদানি বিল পরিশোধ, আগের খোলা ঋণপত্রের (এলসি) দায় মেটানো, সরকারি আমদানি এবং ব্যাংকগুলোর ডলার সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে মাঝেমধ্যে চাপ তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, রেমিট্যান্স বাড়ার পরও কেন ডলারের বাজারে অস্বস্তি কাটছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে প্রবাসীরা ২৮৫ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের জুলাইয়ের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি। গত বছর জুলাইয়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৫৯ কোটি ডলার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের রফতানি আয় যখন মন্থর, তখন রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির পাওয়ায় আমদানি বিলসহ বৈদেশিক পরিশোধের দায় মেটাতে তা গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রফতানি আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় ২ শতাংশ কমে ৪০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্য দিকে জুলাই-মে সময়ে আমদানি ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ বেড়ে ৬৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিপরীতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের বাজারের হিসাব শুধু দেশে কত ডলার ঢুকছে, সেটি দিয়ে বোঝা যায় না। একই সাথে কত ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে, সেটিও দেখতে হয়। আমদানি পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধ, বিদেশী ঋণের কিস্তি, জ্বালানি আমদানি, সরকারি পণ্য আমদানি এবং বিভিন্ন বৈদেশিক দায় পরিশোধে ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত ডলার জোগান দিতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশে আসা ডলারের বড় একটি অংশ দ্রুতই আমদানি ও অন্যান্য বৈদেশিক পরিশোধে চলে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৭০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আমদানির এলসি নিষ্পত্তি প্রায় একই জায়গায় থাকলেও মোট অঙ্কটি অনেক বড়। বিশেষ করে শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য ও সরকারি আমদানির বিল পরিশোধে নিয়মিত বড় অঙ্কের ডলার প্রয়োজন হচ্ছে। অর্থাৎ রফতানি থেকে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসছে, আমদানির পেছনে তার চেয়ে অনেক বেশি ডলার ব্যয় হচ্ছে। রেমিট্যান্সের বড় প্রবাহ না থাকলে এ ব্যবধান আরো বেশি চাপ তৈরি করত।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, ডলারের বাজারে চাপের একটি বড় কারণ হচ্ছে আমদানি পেমেন্টের সময়সূচি। কোনো পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলার সাথে সাথে পুরো অর্থ পরিশোধ করতে হয় না। অনেক এলসির ক্ষেত্রে ৩০, ৬০, ৯০ দিন বা তারও বেশি সময় পর অর্থ পরিশোধ করতে হয়। ফলে কয়েক মাস আগে খোলা এলসির দায় যখন পরিশোধের সময় আসে, তখন একসাথে ডলারের চাহিদা বেড়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, আমদানি এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি স্বাভাবিক হওয়া অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয়। শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি না হলে উৎপাদন ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমদানি বন্ধ বা কড়াকড়ি নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি পেমেন্টের চাপ বাড়লে ব্যাংকগুলোকে বাজার থেকে ডলার সংগ্রহ করতে হয়। একই সময়ে কোনো কোনো ব্যাংক রেমিট্যান্সের ডলার সংগ্রহে বেশি আগ্রহ দেখালে আন্তঃব্যাংক বাজারেও চাপ তৈরি হয়। ফলে দেশে রেমিট্যান্স বাড়লেও তার পুরোটা অতিরিক্ত ডলার হিসেবে বাজারে পড়ে থাকে না।
তারা বলছেন, বর্তমানে ডলারের বাজারে বড় ধরনের সঙ্কট না থাকলেও ‘চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্য’ নিয়ে চাপ রয়েছে। বিশেষ করে সরকারি আমদানি, জ্বালানি ও অন্যান্য বৈদেশিক পেমেন্টের সময় ডলারের চাহিদা সাময়িকভাবে বেড়ে যায়। জুনের শেষদিকে এলসি নিষ্পত্তি ও সরকারি আমদানির পেমেন্টের কারণে ব্যাংকগুলোতে ডলারের চাহিদা বাড়ার ঘটনাও দেখা গেছে। ওই সময় ব্যাংকাররা জানিয়েছিলেন, মাস ও অর্থবছর শেষের পেমেন্টের চাপ ডলারের দর বাড়িয়ে দিয়েছিল।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়া বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে রেমিট্যান্স বাড়লেই ডলারের বাজারে স্থায়ী স্বস্তি আসবে এমনটি ধরে নেয়ার সুযোগ নেই। কারণ দেশের আমদানি-রফতানি ভারসাম্য, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের ওপরও বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে।
তিনি বলেন, রেমিট্যান্সের অর্থ যদি ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে আসে, তাহলে তা রিজার্ভ শক্তিশালী করার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ায়। কিন্তু একই সময়ে আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়লে সেই ডলার আবার বাজার থেকে বেরিয়ে যায়। এতে রিজার্ভে বড় ধরনের উন্নতি হলেও স্পট মার্কেটে সবসময় উদ্বৃত্ত ডলার পাওয়া যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
এ দিকে রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবাহ দেশের রিজার্ভকে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ দিকে মোট রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ছিল এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ হিসাবেও রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। এর আগে ২ জুলাই বিপিএম-৬ হিসাবে দেশের রিজার্ভ ৩৩ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রিজার্ভের এই উন্নতি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রিজার্ভ হলো বৈদেশিক দায় পরিশোধ এবং আমদানি ব্যয় মেটানোর ক্ষেত্রে দেশের একটি নিরাপত্তা বাফার। তবে রিজার্ভের পরিমাণ বাড়লেই বাজারে প্রতিদিন ডলারের সরবরাহ উদ্বৃত্ত থাকবে না। রিজার্ভের একটি অংশ বিভিন্ন বৈদেশিক দায় ও আমদানি পরিশোধে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় বাজারের দৈনন্দিন ডলার সরবরাহ ও রিজার্ভের হিসাবকে আলাদা করে দেখতে হয়।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের চাপের সাথে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় ও ব্যাংক ঋণের সুদের বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। উচ্চ সুদ ও উৎপাদন ব্যয় পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। একই সাথে জ্বালানি সঙ্কটের কারণে কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে চারটি সূচকের মাধ্যমে দেখতে হবে রেমিট্যান্স, রফতানি আয়, আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক দায় পরিশোধ। রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে; কিন্তু রফতানি একই গতিতে বাড়ছে না। অন্য দিকে আমদানি পেমেন্ট এবং বৈদেশিক দায় পরিশোধ অব্যাহত রয়েছে। ফলে রেমিট্যান্সের বাড়তি অর্থের একটি বড় অংশ বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি পূরণে ব্যবহৃত হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি এলসি খোলার পরিমাণ ভবিষ্যৎ ডলারের চাহিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলসি নিষ্পত্তি প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও এলসি খোলার প্রবণতায় কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে। এতে বোঝা যায়, ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে আমদানি কার্যক্রম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি এখনও দুর্বল থাকায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পুরোপুরি গতি ফেরেনি।