ইরান সঙ্কট, টুইন চোকপয়েন্ট ও নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা
বিশ্লেষণ প্রতিবেদন
Printed Edition
মাসুমুর রহমান খলিলী
ইরানের গালফ, ওমান সাগর ও লোহিত সাগরে বাণিজ্য “বন্ধ করে দেয়ার” ঘোষণা শুধু একটি কৌশলগত হুমকি নয়; এটি বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতির এক গভীর রূপান্তরের ইঙ্গিত। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে- ২১ শ’ শতকের ক্ষমতার লড়াই আর শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয় বরং জ্বালানি প্রবাহ, বাণিজ্য রুট ও সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণ এখন আধিপত্যের মূল হাতিয়ার।
এই সঙ্কটের সূচনা বুঝতে হলে প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কৌশলের দিকে তাকাতে হয়। ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর কার্যত সমুদ্রপথে চাপ সৃষ্টি করে তেল রফতানি সীমিত করার চেষ্টা করছে। এর ফলে ইরানের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি- জ্বালানি রফতানি- সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তেহরান এই অবরোধকে কেবল অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে নয় বরং একটি কৌশলগত আগ্রাসন হিসেবে দেখছে। তাই তাদের প্রতিক্রিয়াও সরাসরি সামরিক না হয়ে, আরো সূক্ষ্ম- কিন্তু কার্যকর- জিওইকোনমিক চাপ প্রয়োগের দিকে যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালী নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার ‘প্রেশার ভালভ’- বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল প্রতিদিন এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বৈশ্বিক বাজারে তাৎক্ষণিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। অন্য দিকে বাব আল মানদেব প্রণালী এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার, যা সুয়েজ ক্যানেলভিত্তিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে সচল রাখে।
এই দুই চোকপয়েন্ট আলাদা নয় বরং তারা একটি “ডুয়াল চোকপয়েন্ট সিস্টেম” তৈরি করে। একটি পথ এড়িয়ে বিকল্প ব্যবস্থায় গেলেও, অন্যটির ওপর নির্ভরতা থেকে যায়। ফলে এখানে নিয়ন্ত্রণের চেয়ে “হুমকি দেয়ার সক্ষমতা” অনেক বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। যখন এই দুই পথেই একসাথে চাপ সৃষ্টি হয়, তখন তা “টুইন বটলনেক ইফেক্ট” তৈরি করে- যার প্রভাব বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দেয়। ইরানের বর্তমান অবস্থানকে এই কাঠামোর মধ্যেই বুঝতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে যাওয়ার পরিবর্তে, তেহরান অসম যুদ্ধ কৌশল গ্রহণ করেছে- যেখানে সমুদ্রপথ, আঞ্চলিক মিত্র (যেমন, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী) এবং কৌশলগত অবস্থানকে ব্যবহার করে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিঘœ ঘটানোর ক্ষমতা তৈরি করা হচ্ছে। এটি একটি নতুন ধরনের যুদ্ধ- যেখানে বন্দুকের গুলির চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম বৃদ্ধি, শিপিং রুট পরিবর্তন এবং জ্বালানি দামের ওঠানামা।
এই আঞ্চলিক উত্তেজনা দ্রুতই বৈশ্বিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিচ্ছে। মার্কিন ট্রেজারি মন্ত্রী স্কট বেসেন্টের বক্তব্য- চীন আর ইরান থেকে তেল পাবে না- যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ কৌশলকে আরো স্পষ্ট করে। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়ায় রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী সেগেই ল্যাভরভ জানিয়ে দিয়েছেন, রাশিয়া চীনের জন্য বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ করতে প্রস্তুত। এটি কেবল বাজারের প্রতিযোগিতা নয় বরং একটি কৌশলগত জোটের ইঙ্গিত, যেখানে মস্কো ও বেইজিং পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরো সংবেদনশীল একটি মাত্রা- প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সহযোগিতা। ইরান চীনা স্যাটেলাইট ব্যবহার করে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করেছে- এমন অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরা জটিল করে তুলেছে। যদি এটি সত্য হয়, তবে এটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সামরিক-প্রযুক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে যায়। একই সময়ে রাশিয়ার কূটনৈতিক অবস্থানও দ্বিমুখী। এক দিকে তারা চীনের সাথে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়াচ্ছে, অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানাচ্ছে। এই “ডুয়াল স্ট্র্যাটেজি” মস্কোর বৈশ্বিক প্রভাব পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ। এই পরিবর্তনগুলো মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যগত শক্তির ভারসাম্যকেও বদলে দিচ্ছে। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সল বিন ফারহান আল সৌদের মন্তব্য- “যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার যুগ শেষ”- এই রূপান্তরের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল সৌদি আরব এখন বহুমুখী কূটনীতি গ্রহণ করছে- চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, রাশিয়ার সাথে জ্বালানি সহযোগিতা এবং ইরানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা- সব মিলিয়ে একটি “ব্যালান্সিং স্ট্র্যাটেজি”।
তবে এই পরিবর্তন তাৎক্ষণিক বিচ্ছিন্নতা নয় বরং একটি ধীরগতির রূপান্তর। যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরক্ষা কাঠামোতে তার প্রভাব গভীর। তাই সৌদি আরবের এই অবস্থানকে একটি কৌশলগত চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
সবশেষে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি বড় বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে- বিশ্ব এখন “জিওইকোনমিক যুদ্ধ”-এর যুগে প্রবেশ করেছে। এখানে যুদ্ধের ময়দান হলো সমুদ্রপথ, অস্ত্র হলো বাণিজ্যপ্রবাহ এবং কৌশল হলো সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের মতো চোকপয়েন্টগুলো এখন শুধু ভৌগোলিক স্থান নয় বরং বৈশ্বিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু।
এই সঙ্কট যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়- পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক গভীর অস্থিরতার সূচনা করতে পারে। আর যদি কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়, তবে এই সঙ্কটই ভবিষ্যতের নতুন বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।