দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একসময় নিয়োগ মানে ছিল বাণিজ্য। মেধা-যোগ্যতা যাই থাকুক না কেন- শিক্ষক নিয়োগে অর্থ, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা অন্যতম নিয়ামকের ভূমিকা পালন করত। এসব সম্পন্ন হতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে। ফলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য প্রার্থীরা মেধার স্বাক্ষর রাখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতেন। এর অবসানকল্পে গঠন করা হয় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ-এনটিআরসিএ। প্রতিষ্ঠানটি গঠিত হওয়ার দীর্ঘদিন পর ২০১৫ সালে এনটিআরসিএকে শুধু সনদ নয়; শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতাও দেয়া হয়।

কিন্তু কী এমন হলো যে, শিক্ষক নিয়োগের দুর্নীতিগ্রস্ত পুরনো পদ্ধতিটি ফিরিয়ে আনতে হবে? গণমাধ্যমের খবর, গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি সভায় এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা খর্ব করে ফের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অবশ্য, এর আগে গত বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতাও জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন কমিটির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির হাতে দেয়া হয়।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগে ২০০৫ সালে সরকার বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ-এনটিআরসিএ গঠন করেছিল। তখন প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার মাধ্যমে শুধু সনদ দিত। সেই সনদ নিয়ে চাকরির জন্য প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির দ্বারস্থ হতে হতো। কিন্তু ২০১৫ সালে এনটিআরসিএকে শুধু সনদ দেয়া নয়, নিয়োগের ক্ষমতাও অর্পণ করা হয়। এতে চাকরিপ্রার্থীদের মেধার ভিত্তিতে বিনা অর্থে চাকরি পাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। তাই সরকারের নতুন এই সিদ্ধান্তে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে ক্ষোভের জন্ম নিয়েছে; তা নিঃসন্দেহে যৌক্তিক ও স্বাভাবিক।

দেশে বেকারত্ব তীব্রভাবে বিরাজমান থাকায় কর্মসংস্থানের জন্য তরুণরা দিগি¦দিক ছোটাছুটি করছেন। এমতাবস্থায় শিক্ষাজীবন শেষে খানিকটা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আদলে এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার যে সুযোগ আছে; তাও থাকবে না। এতে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আসার পথ বন্ধের শঙ্কা তৈরি হবে। এর অনিবার্য পরিণতি হলো- শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা।

চাকরিতে নিয়োগে ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যবস্থাপনায় একটি দুরারোগ্য ব্যাধি। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ভিন্নমতের প্রার্থীদের বঞ্চিত করায় এটি ভিন্নমাত্রা পায়। এমন বাস্তবতায় বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএর ক্ষমতা খর্ব করলে বঞ্চনা বাড়বে বৈ কমবে না। যেসব যুক্তির ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পুরনো পদ্ধতিতে ফিরতে চায়; তাতে একক প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থাপত্র কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

আমরা মনে করি, সরকার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের যে উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে; তা অবিলম্বে বাতিল করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সেই সাথে এনটিআরসিএকে আরো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত পরীক্ষা নিয়ে মেধাবীদের যোগ্যতা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ব্যবস্থা করাই হবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার উত্তম পথ। এর অন্যথা হলে শিক্ষার এখনো যেটুকু মান রয়েছে, তা ধরে রাখা দুষ্কর হবে।