দেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গড়ে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুতের অভাবে দেশজুড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শহরে কিছুটা কম হলেও গ্রামের পরিস্থিতি ভয়াবহ। কিছু এলাকায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও টানা ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। ক্ষুব্ধ মানুষ অনেক জায়গায় বিদ্যুতের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন।

গত সোমবার সুনামগঞ্জের ছাতকসহ কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ করেন এলাকাবাসী। তারা টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধও করেন। জেলার জাউয়া বাজার, চেচান ও কালারুকাসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধের কারণে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কসহ ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। আটকা পড়ে হাজার হাজার যানবাহন।

বিদ্যুতের অভাবে সারা দেশেই কল-কারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকরা গল্প-গুজব করে অলস সময় কাটাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় মন দিতে পারছে না। রোগী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা গরমে হাঁসফাঁস করছেন। তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। এই পরিস্থিতি রীতিমতো উদ্বেগজনক।

মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহে সঙ্কট শুরু হয়। টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট থেকে ২১৪ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হলেও সরবরাহ পুরোদমে শুরু হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশজুড়ে।

গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এসব কেন্দ্র থেকে ক’দিন আগেও প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। এখন তা চার হাজার মেগাওয়াটের নিচে।

অথচ দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। মূলত গ্যাসের ঘাটতি বর্তমান সঙ্কটের মূল কারণ। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চাহিদার এক-তৃতীয়াংশের কম গ্যাস পাচ্ছে। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে কয়লা নেই। আর্থিক টানাপড়েন এ জন্য দায়ী।

পরিস্থিতি দ্রুত উন্নয়নের কোনো লক্ষণ আপাতত নেই। গত মঙ্গলবার রাজধানীতে জ্বালানি-সম্পর্কিত এক সেমিনারে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী সরকারের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগী মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহে বড় ঘাটতির দায় স্বীকারও করেন। প্রতিমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ ইতিবাচক। কিন্তু সমাধানের সূত্র নয়। কিন্তু বিদ্যুৎমন্ত্রী বা অন্য কারো কাছ থেকে আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো বক্তব্য আসেনি। আগামী সাড়ে চার বছরে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতির কথা বলেছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। ভোগান্তির শিকার মানুষ কিন্তু প্রস্তুতির কথা নয়, চলমান সঙ্কট কাটাতে সরকার কী করছে- সেটি জানতে চায়।

উল্লিখিত সেমিনারে তাৎক্ষণিকভাবে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর তাগিদ দেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী নেতারা। মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর নীতি নিয়েছে সরকার। বিনিয়োগকারীদের জন্য পাঁচ বছরের কর অবকাশসহ বিভিন্ন সুবিধার কথাও জানান মন্ত্রী। এতে সমাধান আদৌ সম্ভব কিনা ভাবার অবকাশ আছে। নিকট অতীতে বেসরকারি সিন্ডিকেট জ্বালানি খাতে লুটপাটের রেকর্ড করেছে।

ব্যবসায়ীরা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলেছেন, যা সময়সাপেক্ষ। সব মিলিয়ে সঙ্কটের দ্রুত সমাধান কঠিন। কোনোভাবে অর্থের সংস্থান হলেও ভূরাজনৈতিক কারণে তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস আমদানি করা সম্ভব নয়।