তদন্ত কর্মকর্তার জেরা শেষ, শেষ ধাপে আশুলিয়া মামলার বিচার
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
আশুলিয়ায় ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে সংঘটিত নৃশংস গণহত্যা ও লাশ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনায় দায়ের করা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার বিচারপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে উপনীত হয়েছে। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলার সর্বশেষ সাক্ষী তথা তদন্ত কর্মকর্তার জেরা সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে এ অগ্রগতি সাধিত হয়। দীর্ঘ জেরা চলাকালে আশুলিয়া থানায় ‘লাশ মামুন’ ও ‘ভায়রা মামুন’ নামে বহুল আলোচিত কোনো কনস্টেবলের অস্তিত্ব ছিল কি না, তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও সওয়াল-জবাব অনুষ্ঠিত হয়।
গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় ট্রাইব্যুনাল-২-এর সদস্য অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই কার্যক্রম শুরু হয়। প্যানেলের অপর সদস্য ছিলেন জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এ দিন তদন্ত কর্মকর্তা জানে আলম খানকে দীর্ঘক্ষণ জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আবুল হাসান। তিনি মামলার দুই আসামি-তদন্তকালীন আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবদুল মালেক ও কনস্টেবল মুকুল চোকদারের পক্ষে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন। এ ছাড়া সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ পলাতক তিনজনের পক্ষে আইনজীবী সুজাদ মিয়া এবং আসামি শাহিদুল ইসলামের পক্ষে আইনজীবী আসাদুজ্জামান বাবু জেরা করেন।
জেরার একপর্যায়ে আইনজীবী আবুল হাসান অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এবং পরবর্তী সময়ের সংবাদপত্রগুলো তদন্ত কর্মকর্তা দাখিল করেননি, যার মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তদন্ত কর্মকর্তা জানে আলম খান এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। এ ছাড়া ২০ জুলাই সরকার কর্তৃক কারফিউ জারির কোনো দাফতরিক নথিপত্র তদন্তে জব্দ বা দাখিল করা হয়নি বলে আদালতে জানান তদন্ত কর্মকর্তা। জেরা চলাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি মাকসুদ কামালের একটি অডিও কথোপকথনের প্রসঙ্গ উঠে আসে। আইনজীবী দাবি করেন, ওই অডিওর সাথে এসআই আবদুল মালেক ও কনস্টেবল মুকুল চোকদারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই, যা তদন্ত কর্মকর্তা স্বীকার করে নেন।
আদালতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আশুলিয়া থানায় কর্মরত কিছু পুলিশ সদস্যের পরিচয়। আইনজীবী প্রশ্ন তোলেন, তদন্তকালে ‘লাশ মামুন’, ‘ভায়রা মামুন’, কনস্টেবল আবদুল হক, এএসআই জাকারিয়া ও কনস্টেবল জুয়েল নামে কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে কি না। জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, তদন্তে এই নামের ব্যক্তিদের কোনো অস্তিত্ব তিনি পাননি। তখন আইনজীবী প্রশ্ন করেন, পুলিশ সদস্যদের ডিউটি চার্ট জব্দ করা হয়েছে কি না; তদন্ত কর্মকর্তা জানান যে ডিউটি চার্ট জব্দ করা হয়নি।
জেরার একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের দাখিল করা ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। ভিডিওর ৬ সেকেন্ডে দেখা যায়, পুলিশের ভেস্ট পরিহিত এক ব্যক্তি অপর একজনের সহায়তায় একটি লাশ চ্যাং-দোলা করে ভ্যানে তুলছেন। ওই ব্যক্তির পরনে ছিল হাফহাতা আকাশি শার্ট, ছাই রঙের প্যান্ট এবং পায়ে কালো জুতা। আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, ভিডিওতে দৃশ্যমান ওই ব্যক্তি পুলিশ সদস্য নন। তবে তদন্ত কর্মকর্তা এই দাবি নাকচ করে দেন। অবশ্য তদন্ত কর্মকর্তা জবানবন্দীতে স্বীকার করেন যে, ভিডিও ফুটেজে এসআই আবদুল মালেককে দেখা যায়নি। আইনজীবী দাবি করেন, সঠিক তদন্ত হলে তার মক্কেলদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল হতো না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন বিকেলে আশুলিয়ায় গুলিতে ছয় তরুণের মৃত্যু হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের লাশ একটি ভ্যানে স্তূপ করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এই বর্বরোচিত ঘটনায় ১১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার মোট ১৬ আসামির মধ্যে বর্তমানে আটজন গ্রেফতার রয়েছেন। তারা হলেন- সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: আব্দুল্লাহিল কাফী, মো: শাহিদুল ইসলাম, পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই আবদুল মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, এসআই শেখ আবজালুল হক ও কনস্টেবল মুকুল চোকদার। সোমবার সকালে কড়া নিরাপত্তায় তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তার জেরা শেষ হওয়ায় মামলাটি এখন রায়ের পূর্ববর্তী আইনি যুক্তিতর্কের পর্যায়ে প্রবেশ করল।