ফের ৬ শ’ কোটি টাকা ছাড়াল ডিএসইর লেনদেন

ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগের পরামর্শ বিশ্লেষকদের

Printed Edition
artho-1
ফের ৬ শ’ কোটি টাকা ছাড়াল ডিএসইর লেনদেন

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সূচকের ধারাবাহিক উন্নতি পুঁজিবাজারের লেনদেনেও কমবেশি প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন আবার ৬০০ কোটি টাকা ছাড়ায়। গতকাল নিয়ে টানা তিন দিনই দেশের দুই পুঁজিবাজারই সূচকের উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। দীর্ঘদিন ধারাবাহিক মন্দার পর চলতি সপ্তাহের তিন দিনের বাজার আচরণ বিনিয়োগকারীদের আবার স্বস্তিতে ফেরাবে, এমনটিই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল নিয়ে টানা তিন দিন সূচকের উন্নতি ঘটেছে পুঁজিবাজারে। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৭ দশমিক ২৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। মঙ্গলবার সকালে ৫ হাজার ৯১ দশমিক ৬৭ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ১০৮ দশমিক ৯৪ পয়েন্টে। এ নিয়ে গত তিনটি কর্মদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচকটির উন্নতি ঘটে ১৪৯ দশমিক ৯৪ পয়েন্ট। আর এভাবে আড়াই মােেসর মাথায় সূচকটি আবার ৫ হাজার ১০০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করল। সর্বশেষ গত বছরের ১ নভেম্বর এ অবস্থানে ছিল ডিএসই সূচক। গতকাল বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৫ দশমিক ৫৪ ও ৭ দশমিক ৪১ পয়েন্ট।

অন্য দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই এ দিন ৪৯ দশমিক ৫২ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। গত তিন দিনে সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৩৪৪ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৩১ দশমিক ৭৩ ও ৩১ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট।

সূচকের ধারাবাহিক উন্নতি গতকাল ডিএসইর লেনদেনেও প্রভাব ফেলে। পুঁজিবাজারটি গতকাল ৬৬৯ কোটি টাকা টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়, যা আগের দিন অপেক্ষা ৭৬ কোটি টাকা বেশি। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৭৯৩ কোটি টাকা। গত বছরের ৭ অক্টোবরের পর বাজারটির লেনদেন আর কখনো এ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেনের শুরুতে সূচকের বেশ খানিকটা উন্নতি ঘটলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই বিক্রয়চাপে পড়ে বাজারটি। আগের দুই দিন বড় কোনো বিক্রয়চাপে না পড়লেও গতকাল লেনদেনের শুরুতেই দু’বার বিক্রয়চাপ তৈরি হয়। তবে প্রথম দিকের এ চাপ দ্রুতই সামলে নেয় বাাজরটি। বেলা সোয়া ১১টার দিকে বাজার ফের ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে। বেলা ১টার পর ডিএসই সূচক পৌঁছে যায় ৫ হাজার ১২৯ পয়েন্টে। এ সময় সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৩৮ পয়েন্টে। তবে দিনের সময়শেষে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের পুরোটা ধরে রাখতে পারেনি বাজারটি।

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘদিনের মন্দার ফলে বাজারের মূল্যস্তরের যে অবনতি ঘটেছে, তার সুযোগ নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ। এ সময় খুবই সুচিন্তিতভাবে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেহেতু টানা তিন দিন সূচকের উন্নতি ঘটেছে, যেকোনো সময় বাজারে সংশোধন ঘটতে পারে। তাই সবার উচিত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সঠিক ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেয়া। কারণ এখনো বাজার স্টেবল হয়নি। এ পর্যায়ে বেশি মুনাফার চাইতেও যেসব কোম্পানির শেয়ারে ঝুঁকি কম সে দিকেই যাওয়া উচিত বিনিয়োগকারীদের। সে ক্ষেত্রে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিকেই বেছে নেয়া দরকার যেগুলো ভালো পারফর্ম করে এবং ভালো লভ্যাংশ ঘোষণার ইতিহাস রয়েছে। তারা মনে করেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাজার ভালো হতে পারে। আবার নির্বাচনের আগে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে তার নেতিবাচক প্রভারও পড়তে পারে বাজারে। তাই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এসব বিষয় বিনিয়োগকারীদের মাথায় রাখতে হবে।

গতকালের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গতকাল নিয়ে টানা দ্বিতীয় দিন ব্যাংকিং খাতে খুব একটা অংশগ্রহণ ছিল না। সে দিক থেকে বীমা, সিরামিকস, সিমেন্ট, তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিকমিউনিকেশন ও মিউচুয়াল ফান্ড খাতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ছিল বেশি। তাই এসব খাতে প্রায় শতভাগ কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। পক্ষান্তরে, প্রকৌশল, টেক্সটাইল, খাদ্য ও জ্বালানি খাতে মিশ্র আচরণ দেখা যায় গতকাল। পুঁজিবাজারে সূচকের ধারাবাহিক উন্নতি ধরে রাখতে বিভিন্ন খাাতের মধ্যে ভারসাম্য জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ এর ফলে কোনো একটি খাত বা নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানি ঝুঁকি এড়াতে পারে। গত কয়েক দিনের বাজার আচরণে বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে খুব শিগগিরই বড় ধরনের সংশোধন নাও ঘটতে পারে।

ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি ওরিয়ন ইনফিউশন। ২৬ কোটি ১৫ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ছয় লাখ ৮৯ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২০ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় ৯ লাখ ৬৬ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল একই খাতের স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, সিটি ব্যাংক, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, বেক্সিমকো ফার্মা, লাভেলো আইসক্রিম, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স ও প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স।

ডিএসইতে গতকাল মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ডেফোডিল কম্পিউটারস। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল শাইনপুকুর সিরামিকস। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এনসিসিবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, সিকদার ইন্স্যুরেন্স, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, জনতা ইন্স্যুরেন্স, পিএফআই ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি এএমসিএল সেকেন্ড মিউচুয়াল ফান্ড, বিডি অটোকারস ও এশিয়া ইন্স্যুরেন্স।

মঙ্গলবার ডিএসইর দরপতনের শীর্ষে ছিল চামড়া শিল্প খাতের এপেক্স ট্যানারি। এ দিন ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল রিজেন্ট টেক্সটাইলস। দরপতনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বিডি ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোড, নুরারি ডাইং, সিএন্ডএ টেক্সটাইলস, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, মাইডাস ফিন্যান্স, এইচ আর টেক্সটাইলস ও অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস।