নতুন সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক সমীকরণ কোন পথে

Printed Edition

মনিরুল ইসলাম রোহান

সব হিসাব-নিকাশ পাল্টিয়ে দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নজিরবিহীন পতনের পর রাজনীতিতে একটি নতুন মেরুকরণ দেখা দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত পৃথক ধারা তৈরি হয়। সাথে যুক্ত হয় গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম স্টেকহোল্ডার ছাত্রদের নিয়ে গড়া দল এনসিপি। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নতুন সরকার গঠনের পর দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক বলয় ভেঙে রাজনীতিতে একটি নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়। যার মূল ভিত্তি হলো- রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার, আদর্শিক মেরুকরণ এবং তরুণ প্রজন্মের আকাক্সক্ষা পূরণ। এর ওপর ভিত্তি করেই মূলত রাজনীতিতে একটি নতুন গতিপথ তৈরি করছে। অবশ্য তারুণ্যের শক্তির বিকাশ ঘটার সাথে সাথে পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর একটি বড় চ্যালেঞ্জও দেখা দিয়েছে।

রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছে, দীর্ঘ দেড় দশকের অচলাবস্থা কাটিয়ে নতুন সরকার ও বিরোধী দলের হাত ধরে দেশে গণতান্ত্রিক রূপরেখা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ মূলত একটি নতুন গণতান্ত্রিক মেরুকরণ, বিরোধী দলের ভূমিকা এবং বিগত সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে- এই তিনটি প্রধান অনুষঙ্গের ওপর ভিত্তি করে রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এ-ও মনে করেন, রাজনৈতিক গতিপথ কোন দিকে ধাবিত হবে তা মূলত নির্ভর করছে নতুন সরকার কতটা স্বচ্ছতার সাথে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে পারে তার ওপর নির্ভর করছে। নতুন সরকার কতটা দক্ষতার সাথে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারে, তার ওপরও নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। যদিও সাম্প্রতিকালে ঘটে যাওয়া কিছু কিছু ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনকে বেশ উত্তপ্ত করে তুলছে। তারপরও রাজনৈতিক সমীকরণের কিছু দিক তুলে ধরলে রাজনৈতিক গতিপথ কোন দিকে যাবে তার একটা ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

জনপ্রত্যাশা ও সংস্কারের পথে : সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের পর নতুন রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের ভোটাধিকার ও সুশাসন নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের গঠনতন্ত্র ও কার্যক্রমে সংস্কারের বিষয়টি প্রাধান্য দিচ্ছে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

তরুণ ও নতুন শক্তির উত্থান : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর ছাত্রসমাজ এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের পাশাপাশি এখন তারা ক্ষমতার অন্যতম অংশীজন হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ ও দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি ও নির্বাচনী সমীকরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে বলে মনে করা হয়।

নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ : আদর্শিক ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক জোট বা মোর্চা গঠনের প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে ডান ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন বোঝাপড়া তৈরি হচ্ছে। নির্বাচনের আগে যেসব দল যুগপৎ আন্দোলনে সক্রিয় ছিল, তারা এখন নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পোক্ত করতে নতুন জোট গঠনের পথে হাঁটছে। ঐতিহ্যবাহী বড় দলগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জোট এবং ছাত্র সংগঠন নতুন সমীকরণে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করছে। ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নতুন সমঝোতার পথ উন্মুক্ত হচ্ছে এমনটি মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও পুনর্বাসন কোন দিকে : বিগত সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতিতে টিকে থাকা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সমীকরণটি সবচেয়ে জটিল হিসেবে দেখা দিয়েছে। টানা দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর দলটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এখন গভীর রাজনৈতিক সঙ্কটে রয়েছে। তাদের সামনে নতুন করে দলে নেতৃত্ব আনা এবং জনমত জয় করার বড় ধরনের একটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যদিও বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী ভূমিকায় বা সম্পূর্ণ নতুন সমীকরণে ফেরার চেষ্টা করছে দলটি, যা তাদের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নজিরবিহীনভাবে পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ ও তৃণমূল পর্যায়ের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতৃবৃন্দকে রেখে অন্যান্য নেতৃবৃন্দের আত্মগোপনে চলে যাওয়ার বিষয়টি একদিকে যেমন তৃণমূল ভালোভাবে নিচ্ছে না অন্যদিকে সাধারণ মানুষও ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টাকে ইতিবাচক ভাবে গ্রহণ করতে চাইছে না বলে পর্যবেক্ষকমহল মনে করছেন।

অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুশাসন : নতুন রাজনৈতিক ধারায় শুধু আদর্শিক রাজনীতির চর্চা না করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতামূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠার দিকে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই মনোযোগ দিচ্ছে- এমনটি মনে করা হচ্ছে। নতুন সরকারের মূল ফোকাস হলো অর্থনৈতিক সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা।

সংস্কার ও জাতীয় ঐক্য : নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে প্রশাসন ও শাসনতন্ত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে একটি শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর দিকে জোর দেয়া হচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার চেষ্টাও সরকার এবং বিরোধী দলের জন্য সমন্বয় করে এগিয়ে যাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাছাড়া দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রাখার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

কার্যকর বিরোধী দল : সরকারে থাকা দল এবং সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা দলগুলোর মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করার তাগিদ রয়েছে, যা অতীতের একদলীয় বা বিতর্কিত নির্বাচনের চর্চা থেকে দেশকে বের করে আনতে সাহায্য করছে। মাঠের রাজনীতি ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের ভূমিকা নির্বাচনে বিজয়ী মূল দলের বাইরে যারা বিরোধী আসনে বসছে, তাদের সামনেও এখন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

জনগণের আস্থা ও আইনি প্রক্রিয়া : বিগত সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা ও দুর্নীতির আইনি পর্যালোচনার পাশাপাশি নতুন সরকারের অধীনে তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্য একটি বড় বাধা পেরোতে হবে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মন্তব্য

রাজনৈতিক নতুন মেরুকরণ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠন হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ভূমিকা পালনকারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়া নতুন দল এনসিপি রাজনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সরকারের এই স্বল্প সময়ে যদিও রাজনীতির নতুন মেরুকরণ নিয়ে পর্যবেক্ষণ দেয়া কঠিন। আরো সময় লাগবে। তিনি বলেন, আগে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করেছিল। এখন জাতীয় সংসদে বিএনপি সরকারী দল আর জামায়াত বিরোধী দলে রয়েছে। প্রত্যেকের রাজনীতি আলাদা, আদর্শিক ভিন্নতাও রয়েছে। সেখানে জামায়াতের সাথে যুক্ত হয়েছে এনসিপি। এনসিপি নতুন দল হিসেবে ভাল করছে। যদিও জামায়াতকে এখনো কিছু গোষ্ঠী দক্ষিণপন্থা দল বা চরমপন্থা জঙ্গি দল হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। তারপরও জামায়াত জনগণের মন জয় করে বিপুল ভোট পেয়েছে, জামায়াতের ইতিহাসে রেকর্ড গড়ে বিরোধী দলের জায়গা করে নিয়েছে। এটা রাজনৈতিক বাস্তবতা। এক প্রশ্নের জবাবে ড. মাসুম বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যদিও বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির অবস্থান অভিন্ন। প্রত্যেকে প্রত্যেকের রাজনীতি করছে। কিন্তু ফ্যাসিস্ট যাতে ফিরতে না পারে সেজন্য তারা ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। সেক্ষত্রে বলা যায়, রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ বা সমীকরণ যেটাই বলি না কেন এর জন্য আরো অন্তত দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে। সময়ের ব্যবধানে রাজনৈতিক সমীকরণ হয়, রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে মেরুকরণ দেখা যায়।

বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ইকতেদার আহমেদ মনে করেন, নতুন সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক মেরুকরণ কি হচ্ছে, গতিপথ কোন দিকে যাচ্ছে এত সহসাই বলা যাবে না, এটা এখনো পর্যবেক্ষণে রয়েছে। সরকারের মাত্র চার মাস পেরিয়েছে। আরো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। তারপরও বলব- বিএনপি জামায়াত আগে একজোট ছিল। রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা এখন সরকারি দল ও বিরোধী দলে অবস্থান করছে। যে যার কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। আপাতত এভাবে চলতে থাকবে বলে মনে হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, নতুন রাজনৈতিক শক্তি এনসিপির কয়েকজন এমপি নির্বাচিত হয়েছে। তারা গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি হিসেবে তাদের একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে ইকতেদার আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগ দেশে একটি বড় দল ছিল। রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি এখন দৃশ্যপটে নেই। ভবিষ্যতে ফিরে আসবে কিনা সেটা সময়ই বলে দেবে, এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। কারণ রাজনীতিতে শেষ বলতে কিছু নাই। ভবিষ্যতে তারা পুনর্বাসন হতে পারলে রাজনৈতিক সমীকরণ হবে একরকম আর আওয়ামী লীগ ফিরতে না পারলে রাজনৈতিক সমীকরণ হবে আরেক রকম। এটিই রাজনৈতিক বাস্তবতা।