সাবেক কমিশনার হাবিবসহ ৩ পুলিশের মৃত্যুদণ্ড

রামপুরায় গণহত্যা ও কার্নিশে ঝুলে থাকা আমিরকে গুলি

আলমগীর কবির
Printed Edition
first-1
সাবেক কমিশনার হাবিবসহ ৩ পুলিশের মৃত্যুদণ্ড

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে নৃশংসভাবে ছয়টি গুলি করা এবং অন্য দু’জনকে হত্যার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের মামলায় রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

রায়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া অপরাধে সমানভাবে সম্পৃক্ত থাকার দায়ে অন্য দুই পুলিশ কর্মকর্তার একজনকে আমৃত্যু যাবজ্জীবন এবং অপরজনকে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এই মামলায় গ্রেফতারকৃত একমাত্র আসামি রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ট্রাইব্যুনালে হাজির রেখে রায় পড়া হয়; বাকি চারজন শীর্ষ আসামি এখনো পলাতক।

গতকাল রোববার দুপুর ১২টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের বাকি দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এর আগে বেলা ১১টার পর ট্রাইব্যুনালে রায় পড়া শুরু হয়। এ সময় সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামসহ মামলার সাথে সম্পৃক্ত বাদি-বিবাদি সবাইকে ধন্যবাদ জানান ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) রায় সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

আদালতের চূড়ান্ত আদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি হলেন সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মশিউর রহমান। একই থানার সাবেক সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। পলাতক চার আসামির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২০-এর ৩ ধারা অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সাজা পরোয়ানা জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালতের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ ও আইনি ধারা

রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের ভূমিকাকে অত্যন্ত ‘নিষ্ঠুর ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে তীব্র ভর্ৎসনা করেন। আদালত বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে পুরো ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় মারণাস্ত্র ব্যবহারে অতি উৎসাহী ছিলেন হাবিবুর রহমান। ঘটনার আগের দিন ১৮ জুলাই তিনি অধীনস্তদের ‘হাঁটু গেড়ে বসে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে নির্বিচারে গুলি করার’ নির্দেশ দিয়েছিলেন।

ডিএমপি কন্ট্রোল রুমের ওয়্যারলেস বার্তার অডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, কমিশনার হাবিবুর রহমান ওয়্যারলেস মেসেজের মাধ্যমে তার অধীনস্তদের প্রতিনিয়ত উসকানি দিয়েছেন এবং রামপুরার এই হত্যাকাণ্ড ও গণ-নৃশংসতায় প্রত্যক্ষ কমান্ডারের ভূমিকা পালন করেছেন। আদালতের কাছে সবচেয়ে বড় অপরাধমূলক প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়েছে হত্যাকাণ্ডের পর তার ভূমিকা। সাক্ষ্য-প্রমাণে এসেছে, ১৯ জুলাইয়ের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ২১ বা ২২ জুলাই কমিশনার হাবিবুর রহমান স্বয়ং রামপুরা থানায় যান। সেখানে তিনি ক্র্যাকডাউনে অংশ নেয়া খিলগাঁও জোনের এডিসি রাশেদুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন পুলিশ বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকে এক হাজার টাকা এবং ওসি মশিউর রহমানকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দিয়ে পুরস্কৃত করেন। আদালত একে ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রকাশ্য পৃষ্ঠপোষকতা ও অপরাধের স্বীকৃতি’ হিসেবে গণ্য করেছেন।

এ ছাড়া মামলার অন্যতম উপাদান হিসেবে যুক্ত হওয়া এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের বিচারবহির্ভূত হত্যার স্বীকারোক্তি বা ‘এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কনফেশন’ ভিডিওটিকে দীর্ঘ ফরেনসিক পরীক্ষা শেষে সম্পূর্ণ সত্য ও ‘অথেনটিক’ হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। আসামিপক্ষের ‘এআই জেনারেটেড (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি) ভিডিওর’ দাবি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নাকচ করেন আদালত।

তিনটি মূল অভিযোগ ও গণহত্যার বিবরণ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র অনুযায়ী, মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট বর্বর অপরাধের ওপর ভিত্তি করে এই মামলার বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছে- ১. কার্নিশে ঝুলন্ত আমিরকে ছাদ থেকে গুলি : ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে রামপুরার একটি কফিশপ থেকে কাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ আমির হোসেন। বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কে পুলিশ-বিজিবির মারণাস্ত্রের আক্রমণ দেখে ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে তিনি একটি নির্মাণাধীন চারতলা ভবনের ছাদে ওঠেন। পুলিশ তাকে ধাওয়া করলে জীবন রক্ষার্থে তিনি ছাদের কার্নিশের রড ধরে শূন্যে ঝুলে থাকেন। সেখানে এসআই তারিকুল ও এএসআই চঞ্চল গিয়ে তাকে নিচে লাফ দিতে বলেন। আমির অনুনয়-বিনয় করে লাফ দিতে অস্বীকৃতি জানালে, ঝুলন্ত অবস্থাতেই তাকে লক্ষ্য করে পরপর ছয়টি গুলি করা হয়। গুলিবিদ্ধ আমির তিনতলার কার্নিশে ছিটকে পড়েন। পরে তাকে পঙ্গু অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে আমির বলেন, ‘আমি হাতজোড় করে জীবন ভিক্ষা চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা হাসতে হাসতে আমার পায়ে ছয়টি গুলি করে আমাকে চিরদিনের মতো পঙ্গু করে দিলো।’

২. দাদীর কোলে থাকা শিশু মুসাকে হত্যাচেষ্টা ও মায়াদেবীর মৃত্যু : ১৯ জুলাই বিকেলে বনশ্রী জি ব্লকে রামপুরা থানার সামনের একটি বাসার নিচতলার গেটের ভেতরে দাদির কোলে বসেছিল ছয় বছরের শিশু বাসিত খান মুসা। সে সময় পুলিশের ছোঁড়া একটি মারণ বুলেট ঘরের জানালা/গেট ভেদ করে শিশু মুসার মাথার একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে পেছনে থাকা দাদী মায়া ইসলামের পেটে বিদ্ধ হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মায়া ইসলাম মারা যান। শিশু মুসা সিঙ্গাপুরে দীর্ঘ চিকিৎসা পেলেও তার মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হওয়ায় সে চিরতরে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।

৩. নাদিম মিজান হত্যাকাণ্ড : ১৯ জুলাই বেলা আনুমানিক ২টা থেকে আড়াইটার দিকে বনশ্রী এইচ ব্লকে জামে মসজিদের সামনে নামাজ শেষে ফেরার পথে মো: নাদিম (৩৮) নামের এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। পেটে দু’টি গুলি লেগে নাদিম ঘটনাস্থলেই রক্তাক্ত অবস্থায় মারা যান।

প্রসিকিউশন ও রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিক্রিয়া

রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনালের প্রধান ফটকে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপক্ষের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তার সাথে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম, ফারুক আহমেদ, আব্দুস সাত্তার পালোয়ান, শাইখ মাহাদী ও তারেক আব্দুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, এই মামলাটি সম্পূর্ণরূপে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মাননীয় ট্রাইব্যুনাল তিনজন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, একজনকে যাবজ্জীবন এবং চঞ্চল সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। আমরা এই রায়ে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। এই মামলার গ্র্যাভিটি অব অফেন্স বা অপরাধের মাত্রা ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও নিষ্ঠুর। একটি ছয় বছরের নিষ্পাপ শিশু আইসক্রিম খেতে চেয়েছিল, বাবার সাথে যাওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে তার মাথা ঝাঁঝরা হয়ে বুলেট দাদীর পেটে ঢুকল। এর চেয়ে বড় বর্বরতা আর কী হতে পারে? আমির হোসেন কার্নিশে ঝুলে জীবন ভিক্ষা চাইল, তাকে ছাদ থেকে গুলি করা হলো। এই নিষ্ঠুরতা, এই বর্বরতার কারণেই আজকে ট্রাইব্যুনাল তিনজনকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন। আমরা মনে করি অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে এই রায়টি দেয়া হয়েছে এবং এটি আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ যথার্থ।

তদন্তের ত্রুটি ও এসআই গোলাম কিবরিয়ার বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘ঘটনার দিন রামপুরা থানায় দায়িত্বরত এসআই গোলাম কিবরিয়া খানের নামেও সরকারি অস্ত্র ও গুলি বরাদ্দ ছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে আসামি না করে ৫ নম্বর সাক্ষী করেছিলেন। আমরা ট্রাইব্যুনালকে স্পষ্ট জানিয়েছি, কেবল সাক্ষী দেয়ার অজুহাতে তিনি দায় থেকে মুক্তি পেতে পারেন না। গোলাম কিবরিয়ার অপরাধ সংক্রান্ত কোনো সম্পৃক্ততা বা গুলি করার প্রমাণ থাকলে অবশ্যই তাকে পরবর্তী সময়ে আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী বিচারের সম্মুখীন করা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আমরা অনতিবিলম্বে রায়ের কপি পাঠাচ্ছি যাতে ইন্টারপোলের সাহায্যে পলাতক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ বাকিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসি কার্যকর করা যায়।’

অন্য দিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই রায়কে ‘একপেশে ও সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে আসামিপক্ষ। কারাগারে থাকা একমাত্র আসামি এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের নিযুক্ত আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন রায়ের পর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে আমার মক্কেল চরম অবিচারের শিকার হয়েছেন। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাব। ১৯ জুলাই ঘটনার দিন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের নামে কোনো সরকারি অস্ত্র বা গোলাবারুদ ইস্যু করা ছিল না। কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) এবং সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত চঞ্চল রামপুরা টেলিভিশন সেন্টারের ৩ নম্বর গেটে রাষ্ট্রীয় ডিউটিতে নিয়োজিত ছিলেন। ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজ যখন প্রায় শেষ, তখন প্রসিকিউশন হঠাৎ করে একটি তথাকথিত ‘এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কনফেশনের’ ভিডিও এনে হাজির করল। আমরা বারবার নিবেদন রেখেছিলাম যে, থানা হেফাজতে জোরপূর্বক নেয়া এই ভিডিও প্রমাণ হিসেবে বিবেচনার অযোগ্য। বিচারকাজ শেষে হঠাৎ করে একটি সাজানো ভিডিওর ভিত্তিতে যেভাবে রায় পরিবর্তন করে সাজা দেয়া হয়েছে, তাতে আমরা অত্যন্ত সংক্ষুব্ধ।’

আদালত প্রাঙ্গণে চঞ্চল সরকারের ছোট ভাই উৎপল চন্দ্র সরকার প্রসিকিউশনের বিরুদ্ধে একাধিক চাঞ্চল্যকর ও অসঙ্গতিপূর্ণ অভিযোগ তোলেন। উৎপল চন্দ্র সরকার সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রসিকিউশনের দাখিল করা সিডিআর অনুযায়ী আমার ভাই ৩টা ৪৫ পর্যন্ত রামপুরা টিভি ভবনে ডিউটি করেছে। আর মামলার ঘটনা ঘটেছে বেলা ২টা থেকে ৩টার মধ্যে। তাহলে আমার ভাই একই সময়ে দুই জায়গায় কিভাবে উপস্থিত থেকে এই অপরাধ করল? ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা খোদ প্রসিকিউশনকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিন্তু চিফ প্রসিকিউটর সেদিন আদালতে চুপ ছিলেন, কোনো উত্তর দিতে পারেননি। এ ছাড়া গত বছরের (২০২৫) ২৬ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার আমার ভাইকে ক্লোজ করে ডিবি হেফাজতে দেয়। কিন্তু ট্রাইব্যুনালে তার অ্যারেস্ট (গ্রেফতার) দেখানো হয়েছে ২৮ জানুয়ারি। মাঝখানের এই ৪৮ ঘণ্টা আমার ভাইকে কোথায় রেখে টর্চার করা হয়েছিল? আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা নিজে থানা হেফাজতে গিয়ে আমার ভাইকে ক্রসফায়ার ও তার পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে জবানবন্দী দিতে বাধ্য করেছিলেন। মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় আমার ভাই সেই ভিডিওতে কথা বলতে বাধ্য হয়। আজকে মূলত বিষয় সিডিআর বা অস্ত্র না, মূলত হলো আমরা এই দেশে সংখ্যালঘু। এই দেশে সংখ্যালঘু হিসেবে জন্মগ্রহণ করাটাই বোধহয় আমাদের সবচেয়ে বড় পাপ।’

তবে বিচারব্যবস্থার ওপর শেষ ভরসা রেখে উৎপল বলেন, ‘আমরা দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করব এবং বিশ্বাস করি সেখানে আমার ভাই নির্দোষ প্রমাণিত হবে।’

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত এই বর্বরোচিত গণহত্যার পরপরই ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও আইসিটি তদন্ত সংস্থার সহকারী পরিচালক সৈয়দ আব্দুর রউফ দীর্ঘ মাঠপর্যায়ের তদন্ত ও অডিও-ভিডিওর ফরেনসিক পরীক্ষা শেষে ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর, ৭ আগস্ট ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জমা দেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। অভিযোগটি আমলে নিয়ে ১০ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্ত পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। পরে পলাতক চার আসামির পক্ষে স্টেট ডিফেন্স বা রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই ঐতিহাসিক মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

বিচার শুরুর পর ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে মামলার ঐতিহাসিক সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শুরু হয়। ওই দিনই প্রথম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের ওপর চলা নির্মমতার বিবরণ দেন কার্নিশে ঝুলে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া আমির হোসেন। মামলার তদন্তে মোট ৩০ জন প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি নেওয়া হলেও, আইনি নিটোলতা বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দী ও জেরা আদালতে উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে মামলার একমাত্র গ্রেফতারকৃত আসামি এএসআই চঞ্চল সরকারকে ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে ডিএমপির একটি বিশেষ দল গ্রেফতার করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে চলতি বছরের ৪ মার্চ মামলাটি প্রথম দফায় রায় ঘোষণার জন্য কার্য তালিকায় দিন ধার্য করা হয়েছিল। তবে ঠিক সেই মুহূর্তে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম আসামি চঞ্চলের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল ভিডিও প্রমাণ আদালতে যুক্ত করার জন্য চার সপ্তাহের সময় প্রার্থনা করলে রায় ঘোষণা পিছিয়ে যায়। পরে ৯ এপ্রিল প্রসিকিউশন সেই ভিডিওর সত্যতাবিষয়ক ফরেনসিক রিপোর্ট জমা দিলে আদালত চঞ্চলের পুনরায় সাফাই সাক্ষ্যের আবেদন মঞ্জুর করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ জুন চঞ্চল সরকার ট্রাইব্যুনালে দ্বিতীয় দফায় জবানবন্দী দিয়ে প্রসিকিউশনের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক জবানবন্দী আদায়ের পাল্টা অভিযোগ তোলেন। সর্বশেষ গত ১৫ জুন নতুন ডিজিটাল সাক্ষ্য ও আইনি নথির ওপর উভয় পক্ষের পুনরায় যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হয় এবং ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণার জন্য আজকের এই দিনটি (২৮ জুন) ধার্য করেছিলেন।