বছরে হাজার হাজার গরু আক্রান্ত নতুন সিরোটাইপ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে
ক্ষুরা রোগে বিপর্যস্ত গবাদিপশু খাত : প্রতিকার নয়, প্রতিরোধেই মুক্তি
এই রোগে আক্রান্ত হলে গরু ও অন্যান্য প্রাণীর দুধ উৎপাদন হ্রাস, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া, এমনকি বাছুরের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
Printed Edition
বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী হুমকির নাম ক্ষুরা রোগ বা ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ (ঋগউ)। প্রতি বছর এই ভাইরাসজনিত রোগে বিপুলসংখ্যক গবাদিপশু আক্রান্ত হয়, যার ফলে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে দেশের হাজার হাজার খামারি ও কৃষক।
এই রোগে আক্রান্ত হলে গরু ও অন্যান্য প্রাণীর দুধ উৎপাদন হ্রাস, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া, এমনকি বাছুরের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। দেশের দুগ্ধ খাত, গোশত উৎপাদন এবং পশুর রফতানি সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এই রোগের কারণে।
ক্ষুরা রোগ কী ও কিভাবে ছড়ায় : ক্ষুরা রোগ একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি পিকোর্নাভিরিডি পরিবারের অ্যাপথোভাইরাস গণভুক্ত ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট হয়। ভাইরাসটির সাতটি প্রধান সিরোটাইপ রয়েছে: ও,এ, সি,স্যাট-১,স্যাট-২, স্যাট-৩ ও এশিয়া-১।
বাংলাদেশে প্রধানত ও,এ ও এশিয়া-১ সিরোটাইপের সংক্রমণ দেখা যায়। ভাইরাসটি মূলত সংক্রামিত পশুর লালা, দুধ, মলমূত্র এবং নিঃশ্বাস-এর মাধ্যমে ছড়ায় এবং মানুষ, যানবাহন, পশুখাদ্য বা যন্ত্রপাতির মাধ্যমে অন্য পশুতে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
কোন সময় রোগের প্রকোপ বেশি : ক্ষুরা রোগ সাধারণত বর্ষা মৌসুমের পর ও শীতের শুরুতে বেশি ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় আর্দ্র আবহাওয়া, জলাবদ্ধতা এবং অপর্যাপ্ত জীবাণুনাশ ব্যবস্থা রোগ ছড়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
ক্ষুরা রোগের প্রধান লক্ষণ : বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: গোলজার হোসেন জানান, রোগ শনাক্তে নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো লক্ষ্য করুন -
হঠাৎ জ্বর (৪০ ডিগ্রি বা তার বেশি) : মুখ, জিহ্বা, ঠোঁট ও ক্ষুরে ফোস্কা, অতিরিক্ত লালা ঝরা, খুঁড়িয়ে হাঁটা বা পা দিয়ে মাটি ঠোকানো, খাওয়া বন্ধ করে দেয়া, দুধ উৎপাদন হ্রাস, বাছুরের ক্ষেত্রে ‘টাইগার হার্ট’ নামক মারাত্মক হৃদরোগ, যা হঠাৎ মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
চিকিৎসা নয়, সহায়ক ব্যবস্থাই ভরসা : ক্ষুরা রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তাই সহায়ক চিকিৎসার মাধ্যমেই আক্রান্ত পশুকে সুস্থ করার চেষ্টা করতে হয়।
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে, মুখ ও ক্ষতস্থানে জীবাণুনাশক দিয়ে ধোয়া (১% অ্যাসিড সাইট্রিক বা পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট), ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ, আক্রান্ত পশুকে আলাদা করে রাখা, নরম খাবার ও পর্যাপ্ত পানি দিয়ে বিশ্রাম নিশ্চিত করা।
প্রতিরোধই মূল অস্ত্র : খামারিদের করণীয়: ১. নিয়মিত টিকা- দেশের জন্য উপযুক্ত সিরোটাইপ অনুযায়ী বছরে দুইবার টিকা প্রয়োগ ২. জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত- বাহিরের প্রাণী, যান ও ব্যক্তিকে খামারে প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ ৩. কোয়ারেন্টাইন- নতুন পশুকে ১৪ দিন আলাদা রাখা ৪. খামার ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা বৃদ্ধি, খামারিদের প্রশিক্ষণ দেয়া।
সাধারণ কিছু ভুল যেগুলো ক্ষতি বাড়ায় : অনিয়মিত বা না টিকা দেয়া, আক্রান্ত পশুকে আলাদা না রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব ওখামার কর্মীদের সচেতনতার ঘাটতি।
আন্তর্জাতিক নতুন হুমকি : স্যাট-১ সিরোটাইপ: ২০২৫ সালে ইরাক ও বাহরাইনে স্যাট-১ নামক নতুন এক সিরোটাইপ শনাক্ত হয়, যা পরে কুয়েত ও তুরস্কেও ছড়িয়ে পড়ে। এটি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার জন্য নতুন হুমকি হতে পারে। এ জন্য টিকা গবেষণা, বর্ডার কন্ট্রোল এবং জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ : বাকৃবির অধ্যাপক ড. মো: গোলজার হোসেনের মতে, ‘ক্ষুরা রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধমূলক টিকাদান ও জৈব সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। সচেতনতা ছাড়া এর প্রাদুর্ভাব থামানো সম্ভব নয়।’
বাংলাদেশে ক্ষুরা রোগ প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য একটি অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত সঙ্কট। এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, জনসচেতনতা এবং গবেষণাভিত্তিক টিকাদানই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। সময় মতো ব্যবস্থা নিতে পারলে এ রোগের ভয়াবহতা অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব।