উৎফুল্ল জাপায় আওয়ামী ভোটের আশা

Printed Edition

কাওসার আজম

গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সহকারী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচন ভোটারবিহীন, রাতের ভোটে এবং সর্বশেষ আমি-ডামি ভোটে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল দলটি। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এখন তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। এর আগেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয় দলটির। আওয়ামী লীগের মতোই দীর্ঘদিন তাদের ভোটসঙ্গী ও ক্ষমতার সুবিধাভোগী জাতীয় পার্টি (জাপা) এবং ১৪ দলের কার্যক্রমও নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। সেই দাবি এখনো অব্যাহত রেখেছে জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান থেকে জন্ম দেয়া দল জামায়াতে ইসলামীর জোট ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। বিএনপির মধ্যেও একটি অংশ মনে করে জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করা উচিত। এ অবস্থায় ঘোষিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের দিনক্ষণ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এই ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দল নিষিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা যেখানে জাপা নেতাকর্মীকে চাপে রেখেছিল, এখন তারা অনেকটাই উৎফুল্ল। কারণ, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র জাপা অংশ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারির মনোনয়নপত্র বৈধতাও পেয়েছে। আওয়ামীশূন্য বাংলাদেশে মিত্র জাতীয় পার্টি এবার নির্বাচনী লড়াইয়ে। দলটির নেতাকর্মীরা মনে করছেন, নৌকার ভোট লাঙ্গলেই পড়বে।

লাঙ্গলের উপর ভর করে নৌকা তথা আওয়ামী লীগ দেশে স্বৈরাচারী শাসন দীর্ঘায়িত করেছে। এবার উল্টো- নৌকাবিহীন আওয়ামী লীগের উপর ভর করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে চায় হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ প্রতিষ্ঠিত দল জাপা। যদিও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বার বার ভেঙেছে দলটি। সর্বশেষ ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও রুহুল আমিন হাওলাদারের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে আরেকটি জাতীয় পার্টি। নিজেদের আসল জাপা উল্লেখ করে তারা লাঙ্গল পেতে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। আগামী ৮ জানুায়রি আদালতে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে। ফায়সালা হবে লাঙ্গল কার? জি এম কাদের নাকি আনিসুলদের!

আশা জাগাচ্ছে আওয়ামী ভোট : জাতীয় পার্টি সূত্র জানায়, লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করতে ২৪৩ জনকে মনোনয়নপত্র দেন জি এম কাদের। তাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। গতকাল পর্যন্ত যাচাই বাছাইয়ে রংপুর-৩ আসনে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও গাইবান্ধা-১ আসনে মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারির মনোনয়নপত্র বৈধতা পেয়েছে। জাপা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনে যেহেতু আওয়ামী লীগ নেই তাই এবারের ভোটে ভালো অবস্থানে থাকবে জাতীয় পার্টি। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জাপা চাপে থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলটিকে নির্বাচন করার সুযোগ করে দেয়ায় নেতাদের মধ্যেও বেশ আশা জেগেছে। বৃহত্তর রংপুর ছাড়াও আওয়ামী অধ্যুষিত এলাকার আসনগুলোতে স্বপ্ন দেখছেন জাপার প্রার্থীরা।

জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আব্দুস সবুর আসুদ গতকাল বিকেলে নয়া দিগন্তকে অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানান, আমার নমিনেশন তো (ঢাকা-৫ আসন) বৈধ হইয়া গেছে। বিএনপি ও জামায়াতের জনসমর্থন কমছে। এনসিপির কোনো অবস্থান নেই। জাতীয় পার্টি বীরদর্পে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে (বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি) জাতীয় পার্টি এখন ফের ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাতীয় পার্টির জি এম কাদের অংশ উৎফুল্ল হলেও চাপে পড়েছে ব্যারিস্টার আনিস ও রুহুল আমিন হাওলাদার অংশ। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম-৫ আসনে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা হয়েছে। তার দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশিদ নির্বাচন না করার ঘোষণা দিয়েছেন। সূত্র জানিয়েছে, আনিস-হাওলাদার অংশের হয়ে প্রার্থিতা জমা দেয়াদের প্রার্থিতা বাতিলই হওয়ার কথা, কারণ, তাদের লাঙ্গল নেই। স্বতন্ত্র হিসেবে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর দরকার। সেটাতেই সমস্যা। তারা তো স্বতন্ত্র হিসেবেও জমা দেয়নি।

জামায়াতের প্রার্থিতা বাতিলে সুযোগ পাবে জাপা : গাইবান্ধা জামায়াতের দুর্গ হিসেবেই পরিচিত। জেলার ৫টি আসনের মধ্যে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনটিতে সর্বশেষ ২০০১ সালেও জামায়াতের প্রার্থী এমপি নির্বাচিত হন। এবার দলটির প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাজেদুর রহমান। গতকাল তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা। তিনি জানান, শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত থাকায় তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী কর্নেল (অব:) আব্দুল হকেরও। এর আগে কক্সবাজার-২ আসনের ড. হামিদুর রহমান আযাদের প্রার্থিতা। তিনি ওই আসনে দলের দুঃসময় ২০০৮ সালের নির্বাচনেও এমপি হয়েছিলেন। মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখা হয়েছে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীরও। আরো কয়েকজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের খবর আসছে। আজ রোববার প্রার্থিতা যাচাই-বাছাইয়ের শেষ দিন। আরো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া নিয়ে জামায়াত কর্মী-সমর্থকদের হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। যদিও রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে জাতীয় পার্টিকে ফ্যাসিস্টের দোসর আখ্যা দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি রাজনৈতিক দলগুলো আওয়ামী লীগের মতো নিষিদ্ধের দাবি অব্যাহত রেখেছে। গত শুক্রবার রংপুর-৪ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধতা ঘোষণার পর ক্ষোভ ঝাড়েন এনসিপির প্রার্থী ও দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন।

সূত্র জানিয়েছে, জি এম কাদেরসহ জাতীয় পার্টির বেশ কিছু নেতার বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক মামলা রয়েছে। তবে, এখন পর্যন্ত এসব মামলায় চার্জ গঠন হয়নি। আবার দলের নিবন্ধনও বাতিল হয়নি। তাই জাতীয় পার্টির নেতাদের অংশ নিতে কোনো বাধা নেই এই মুহূর্তে। তবে, কারো নামে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কেন্দ্রিক ফরমাল চার্জ গঠন হলে তিনি আর নির্বাচন করতে পারবেন না বলে জানা যায়।